রোবটিক্স শুনলেই অনেক শিক্ষার্থীর মাথায় প্রথমেই আসে একটি প্রশ্ন—রোবট বানাতে গেলে কি অবশ্যই রোবট কিনতে হবে? আর রোবট যদি কিনতেই হয়, তাহলে তো সেটি অনেক ব্যয়বহুল। ড. আলিমুর রেজা এই বাস্তব সমস্যাটিকে খুব সরাসরি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মেশিন লার্নিং বা ডিপ লার্নিং শেখা তুলনামূলকভাবে সহজ, কারণ একটি কম্পিউটার থাকলেই অনেক কাজ করা যায়। কিন্তু রোবটিক্সে এসে বাধা তৈরি হয় অন্য জায়গায়—এখানে শুধু কোড লিখলে হবে না, বাস্তবে চালানোর মতো একটি রোবট দরকার। যেহেতু রোবট ব্যয়বহুল, অনেকেই শুরুতেই মনে করেন, এই ক্ষেত্রটি তাদের জন্য নয়। কিন্তু ড. আলিমুর রেজা ঠিক এই ভুল ধারণাটিই ভাঙতে চান।
তিনি দেখান, রোবটিক্স শেখার প্রথম ধাপ হিসেবে সবার হাতে রোবট থাকা জরুরি নয়। কারণ আজকের প্রযুক্তিতে রোবটের অনেক কাজই আগে কম্পিউটারের ভেতরে অনুশীলন করা যায়। যেমন, আপনি যদি একটি রোবটকে ঘরের ভেতর চলতে শেখাতে চান, তাহলে আগে তাকে একটি ভার্চুয়াল ঘর দেখিয়ে শেখানো সম্ভব। এখানে সিমুলেটর বলতে বোঝায় এমন সফটওয়্যার, যেখানে কম্পিউটারেই একটি কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি থাকে—ঘর, দেয়াল, চেয়ার, দরজা, আলোর প্রভাব, রোবটের গতি—সবকিছু ডিজিটালভাবে সেট করা যায়। আপনি সেখানে কোড চালিয়ে দেখতে পারেন রোবট কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, কোথায় ভুল করে, কীভাবে রুট পরিকল্পনা করে, আর কোথায় বাধার মুখে পড়ে থেমে যায়। বাস্তব রোবটের মতোই এটি একটি শেখার ক্ষেত্র, শুধু হার্ডওয়্যার খরচ ছাড়াই।
ড. আলিমুর রেজা বিশেষভাবে গাজিবো নামের একটি সিমুলেটরের কথা বলেন। গাজিবোতে আপনি রোবটের গতিবিধি, সেন্সর ডেটা, এবং পরিবেশের সাথে ইন্টারঅ্যাকশন পরীক্ষা করতে পারেন। অর্থাৎ বাস্তব রোবটের যে সমস্যাগুলো—দেয়ালে ধাক্কা, কোণায় আটকে যাওয়া, হঠাৎ বাধা আসা—সেগুলো আপনি নিরাপদভাবে ভার্চুয়াল পরিবেশে বারবার অনুশীলন করতে পারেন। এই অনুশীলনটি সাইকেল চালানো শেখার মতো। প্রথমে ভুল হবে, পড়ে যাবে, তারপর আবার উঠে দাঁড়াবে। রোবটিক্সও তেমন—সঠিক সমাধান আসে অসংখ্য ছোট ভুল, পরীক্ষা, এবং সংশোধনের ভেতর দিয়ে।
তিনি আরেকটি প্ল্যাটফর্মের কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে রোবটকে বলা হয় এমবডেড এজেন্ট। সহজভাবে বললে, এমবডেড এজেন্ট হলো এমন একটি সফটওয়্যার-চালিত রোবট চরিত্র, যাকে একটি ভার্চুয়াল পরিবেশে বাস্তব রোবটের মতো আচরণ করতে শেখানো হয়। এতে শিক্ষার্থী বুঝতে পারে, একটি রোবট কেবল মোটর আর চাকা নয়; রোবটের ভেতরে থাকে সেন্সিং, পরিকল্পনা, এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো ব্যবস্থা। রোবটকে কোথায় যাবে, কীভাবে ঘুরবে, কখন থামবে—এসব সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে অ্যালগরিদম, এবং সেই অ্যালগরিদম দাঁড়ায় প্রোগ্রামিং ও গণিতের ভিত্তিতে।
তবে ড. আলিমুর রেজা এটাও বলেন, সুযোগ থাকলে শিক্ষামুখী কিছু রোবট দিয়েও হাতে-কলমে কাজ করা যায়। যেমন টার্টলবটের মতো একাডেমিক রোবট তুলনামূলক কম খরচে পাওয়া সম্ভব, যা শিক্ষার্থী ও গবেষণার জন্য জনপ্রিয়। আবার তার নিজের ল্যাবে লোকোবটের মতো কিছু উন্নত রোবট আছে, যা শেখানো ও ডেপ্লয় করার কাজে ব্যবহার করা হয়। এখানে মূল কথা হলো, সিমুলেটরে শেখা দিয়ে শুরু করলে পরে বাস্তব রোবটে যাওয়ার পথ তৈরি হয়। আপনি যখন সিমুলেটরে বারবার পরীক্ষা করে একটি সমাধান স্থির করতে পারেন, তখন বাস্তব রোবটে সেটি প্রয়োগ করা সহজ হয়, সময়ও বাঁচে, খরচও কমে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই কথাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের অনেক শিক্ষার্থী বড় ল্যাব বা ব্যয়বহুল হার্ডওয়্যারের সুযোগ ছাড়াই শেখার চেষ্টা করে। সিমুলেটর-ভিত্তিক শেখা তাদের জন্য দরজা খুলে দেয়। আপনি চাইলে বাসার সাধারণ ল্যাপটপ দিয়েই রোবটিক্সের মৌলিক ধারণা অনুশীলন করতে পারেন—রোবট কীভাবে পরিবেশ বোঝে, কীভাবে রাস্তা পরিকল্পনা করে, এবং কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ধাপে ধাপে আপনার দক্ষতা বাড়লে আপনি গবেষণা দল, বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাব, বা প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তব রোবটেও কাজ করার সুযোগ খুঁজে নিতে পারেন।
ড. আলিমুর রেজার এই বক্তব্য শিক্ষার্থীদের একটি আশ্বাস দেয়: সীমাবদ্ধতা থাকা মানেই থেমে যাওয়া নয়। সঠিক পথে শুরু করলে, ছোট ছোট অনুশীলনের মধ্য দিয়েই বড় প্রযুক্তির দরজা খুলে যায়। রোবটিক্স শেখার যাত্রা তাই প্রথমে গ্যারেজে রোবট কিনে নয়; শুরু হতে পারে একটি সিমুলেটরে প্রথম সফল কোড চালানোর আনন্দ দিয়ে।
পূর্ণ সাক্ষাৎকারে ড. আলিমুর রেজা তার শিক্ষা–যাত্রা, গবেষণার খুঁটিনাটি, রোবটের ভবিষ্যৎ, এবং এআই ব্যবহারের বাস্তব প্রশ্নগুলো আরও বিস্তারিতভাবে বলেছেন। নিম্নে ড. আলিমুর রেজার পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন এবং ইউটিউবে দেখুন।

Leave a comment