গল্পে গল্পে বিজ্ঞানসাধারণ বিজ্ঞানস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

আমাদের মস্তিষ্ক যেভাবে গল্প বানায়

Share
Share

তখনো আমি এমসি কলেজ এর হোস্টেলে একদম নতুন। ইন্টারমিডিয়েটের প্রথম বর্ষ। নিজের শহর, নিজের ঘর, পরিচিত দেয়াল সব ছেড়ে প্রথমবারের মতো এমন এক জীবনে পা রাখা, যেখানে রাত নামলে নিজের চিন্তাগুলোও অপরিচিত লাগে। মানুষের জীবনে কিছু বয়স থাকে, যখন বাস্তবতার চেয়ে “শোনা কথা” বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আমার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছিল।

আমাদের সমাজে ঘরের বাইরে থাকা ছেলেদের নিয়ে এক অদ্ভুত collective narrative বহুদিন ধরে ঘুরে বেড়ায়। “হোস্টেলে উঠলেই ছেলে নষ্ট হয়ে যায়”, “মেস মানেই বিড়ি-সিগারেট”, “একজন খেলে সবাই খাবে” এমন কথাগুলো এতবার শুনতে শুনতে এগুলো অনেকের মস্তিষ্কে প্রায় social truth হয়ে বসে যায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় social conditioning অর্থাৎ বারবার কোনো ধারণা শুনতে শুনতে সেটাকে বাস্তব ধরে নেওয়া।

তো প্রথমদিন হোস্টেলে উঠে আমি আমার রুমমেটকে দেখলাম। মানুষটা শান্ত, পরিপাটি, একটু অন্যরকম ব্যক্তিত্বের। কিন্তু তখনো আমি তাঁকে চিনতাম না। হঠাৎ তাঁর টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখি, একটা ওয়াইনের বোতল।

ব্যস।

মস্তিষ্ক তখন আর তথ্য যাচাই করেনি। বরং ছোটবেলা থেকে জমে থাকা সামাজিক ধারণাগুলো মুহূর্তেই সক্রিয় হয়ে উঠল। Cognitive psychology-তে এটাকে বলা হয় confirmation bias। অর্থাৎ, মানুষ যখন আগে থেকেই কোনো বিশ্বাস মনে ধারণ করে রাখে, তখন সে নতুন ঘটনাকে সেই বিশ্বাসের সাথে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে। আমার মাথায় তখন আশেপাশের মানুষদের বলা শত কথার টুকরো টুকরো পাজল জোড়া লাগতে লাগল।

“দেখছো? সবাই ঠিকই বলেছিল।”

“হোস্টেলে এগুলো থাকেই।”

“আজ বোতল, কাল হয়তো…”

বাস্তবে একটা বোতল ছাড়া আমি আর কিছুই দেখিনি। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক খুব কম তথ্য থেকেও বড় গল্প বানাতে ওস্তাদ। Neuroscience এ একে বলা হয় predictive processing। ব্রেইন সবসময় incomplete information পূরণ করার চেষ্টা করে। আর সেই ফাঁকা জায়গা পূরণ হয় পূর্বধারণা, ভয়, সামাজিক অভিজ্ঞতা আর collective rumor দিয়ে।

সেদিন রাতে জার্নির ক্লান্তিতে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু পরের দিন আর পারিনি। মস্তিষ্ক তখন threat perception mode এ চলে গেছে। Psychology তে এটাকে বলা হয় availability heuristic যে তথ্যগুলো সমাজে বেশি শোনা যায়, মস্তিষ্ক সেগুলোকে বেশি সত্যি মনে করে। ফলে বাস্তব evidence কম থাকলেও ভয়টা বাস্তব মনে হয়।

নিউরোসায়েন্সের ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতে মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ Amygdala খুব দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে। Amygdala মূলত মানুষের fear processing ও threat detection-এর সাথে জড়িত। নতুন পরিবেশ, অচেনা মানুষ, আর আগে থেকে শোনা নেতিবাচক সামাজিক ধারণা এই তিনটি বিষয় একত্রিত হলে মস্তিষ্ক অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে “সম্ভাব্য বিপদ”কে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে।

ফলে একটি সাধারণ বস্তু যেমন একটি বোতল যুক্তিবাদী বিশ্লেষণের আগেই emotional interpretation-এর শিকার হয়। তখন মস্তিষ্ক পুরো পরিস্থিতিকে calm observation দিয়ে না দেখে survival instinct দিয়ে দেখতে শুরু করে। এ কারণেই হয়তো সেই রাতে বাস্তবে কোনো প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও আমার ভেতরে অস্বস্তি, সতর্কতা, এমনকি অকারণে ভয়ও তৈরি হয়েছিল।

গবেষণায় দেখা যায়, unfamiliar social environment-এ মানুষের amygdala তুলনামূলক বেশি reactive হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে যখন ব্যক্তির মাথায় আগে থেকেই কোনো নেতিবাচক expectation বসানো থাকে। অর্থাৎ, আমরা অনেক সময় বাস্তবতাকে যেমন দেখি, তার চেয়ে বেশি দেখি আমাদের ভয়, পূর্বধারণা এবং সামাজিকভাবে শেখানো আশঙ্কাগুলোকে।

 ছবিঃ হাজারো পদচারণায় পরিচিত হয়ে ওঠা সেই প্রবেশদ্বার। 

পরে বাসায় গিয়ে মা-বাবার কাছে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা কথা বললাম। সরাসরি কিছু বলতে পারছিলাম না, কিন্তু রুম পরিবর্তনের একটা বাহানা খুঁজছিলাম। এখন ভাবলে হাসি পায়, একটা ফুলদানি হওয়ার সম্ভাবনা মাথায়ই আসেনি।

কয়েকদিন পর হলে ফিরে এসে হঠাৎ দেখি, সেই “ভয়ংকর ওয়াইনের বোতল” এ সুন্দর করে ফুল রাখা। তখন জানতে পারলাম, আমার রুমমেট আসলে বোতলটা এনেছিলেন ফুলদানি বানানোর জন্য। মানুষটা ছিলেন শিল্পমনস্ক। যেটাকে আমি “অপরাধের প্রমাণ” ভেবেছিলাম, সেটাই ছিল aesthetic creativity এর অংশ।

সেদিন বুঝেছিলাম, মানুষ অনেক সময় বাস্তবতাকে দেখে না বরং বাস্তবতার ওপর নিজের ভয়, সামাজিক ধারণা আর stereotype এর রঙ মেখে দেখে।

Social psychology তে একটা গুরুত্বপূর্ণ ধারণা আছে, stereotype formation। যখন আমরা কোনো গোষ্ঠী সম্পর্কে বারবার একই ধরনের নেতিবাচক গল্প শুনি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক shortcut তৈরি করে। এরপর কোনো ছোট্ট clue পেলেই পুরো মানুষটাকে সেই stereotype এর ভেতর ফেলে বিচার করতে শুরু করি।

মজার বিষয় হলো, এই bias শুধু হোস্টেল নিয়ে নয়। বাংলাদেশের সমাজে প্রায় সব জায়গাতেই এটা কাজ করে। কেউ চুপচাপ থাকলে “অহংকারী”, বেশি হাসলে “লাইট”, রাতে জেগে থাকলে “খারাপ অভ্যাস”,একটু আলাদা চিন্তা করলে “বখে যাওয়া”। আমরা আচরণ বোঝার আগে label লাগাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

কিন্তু behavioural science বারবার বলছে, মানুষের আচরণ বোঝার জন্য context সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষকে শুধু “দেখে” বোঝা যায় না; তাকে বুঝতে হয় তার environment, personality, stress, culture আর intention এর ভেতর দিয়ে।

আমার সেই রুমমেট হয়তো জানতেনই না, তাঁর ফুলদানি আমার মাথায় এক রাতের psychological thriller চালিয়ে দিয়েছিল।

আজ এতদিন পর মনে হয়, আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় behavioural challenge হলো আমরা observation এর চেয়ে assumption বেশি করি। অথচ ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন শুরু হতে পারে খুব ছোট একটা জায়গা থেকে: “শোনা কথা”কে চূড়ান্ত সত্য না ভাবা।

যে সমাজে মানুষ আগে বিচার না করে আগে বুঝতে চেষ্টা করে, সেই সমাজে empathy বাড়ে, anxiety কমে, social trust তৈরি হয়। আর neuroscience বলছে, ইতিবাচক social interaction মানুষের brain এর emotional regulation ও উন্নত করে। অর্থাৎ, ভালো সামাজিক আচরণ শুধু নৈতিক বিষয় না এটা neurological well-being এর সাথেও জড়িত।

একটা ওয়াইনের বোতল আমাকে সেই বয়সে শিখিয়েছিল, সব বোতল নেশার জন্য নয়, কিছু বোতলে ফুলও থাকে।

মো. ইফতেখার হোসেন 

এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ |
আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org