গবেষণায় হাতে খড়ি

বিজ্ঞানী’র বই: গ্যালিলিও’র ডায়ালগ কনসার্নিং টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস।

Share
Share

আজ আমরা জানি—পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, আর সূর্য আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্র। কিন্তু এই ধারণা একসময় ছিল বিপজ্জনক “বিদ্রোহী মতবাদ”। ১৭শ শতকের ইউরোপে মহাবিশ্ব সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ধারণা ছিল ভূকেন্দ্রিক তত্ত্ব—অর্থাৎ পৃথিবী স্থির, আর সূর্য-চাঁদ-গ্রহ-নক্ষত্র সবকিছুই তার চারদিকে ঘোরে। এই প্রচলিত বিশ্বাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে বইটি বৈজ্ঞানিক ইতিহাসে এক বড় মোড় এনে দেয়, তার নাম গ্যালিলিও গ্যালিলেই-এর লেখা “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্য টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” (১৬৩২)।

এই বইটির মূল লক্ষ্য ছিল মহাবিশ্বের দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী মডেলকে মুখোমুখি দাঁড় করানো—একদিকে টলেমির ভূকেন্দ্রিক ব্যবস্থা, অন্যদিকে কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক ব্যবস্থা। গ্যালিলিও সরাসরি কোনো তত্ত্বকে “সঠিক” বলে ঘোষণা না করে একটি অভিনব পদ্ধতি বেছে নেন। তিনি বইটি লিখেছেন সংলাপ (dialogue) আকারে—তিনজন চরিত্রের কথোপকথনের মাধ্যমে। এই তিন চরিত্রের একজন ভূকেন্দ্রিক মতবাদের পক্ষে কথা বলেন, একজন সূর্যকেন্দ্রিক ধারণার পক্ষে যুক্তি দেন, আর তৃতীয়জন তুলনামূলক নিরপেক্ষ থেকে প্রশ্ন করেন। ফলে পাঠক নিজেরাই যুক্তির শক্তি বিচার করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন। এই সাহিত্যিক কৌশল গ্যালিলিওকে বৈজ্ঞানিক বিতর্ককে সাধারণ পাঠকের কাছে সহজবোধ্য করে তুলতে সাহায্য করে।

বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল গ্যালিলিওর পর্যবেক্ষণভিত্তিক যুক্তি। টেলিস্কোপ দিয়ে তিনি যে সব নতুন তথ্য আবিষ্কার করেছিলেন—যেমন বৃহস্পতির উপগ্রহ, শুক্র গ্রহের কলা পরিবর্তন, চাঁদের পৃষ্ঠের অসমতল গঠন—এসব পর্যবেক্ষণ ভূকেন্দ্রিক ধারণার সঙ্গে সহজে মেলানো যাচ্ছিল না। বিশেষ করে শুক্রের কলা পরিবর্তনের ব্যাখ্যা সূর্যকেন্দ্রিক মডেলকে শক্তিশালী সমর্থন দেয়। এর মাধ্যমে গ্যালিলিও দেখাতে চেয়েছিলেন, প্রকৃতিকে বোঝার জন্য কেবল প্রাচীন কর্তৃত্ব বা গ্রন্থের ওপর নির্ভর না করে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার ওপর জোর দেওয়া জরুরি।

তবে এই বইটির প্রকাশ গ্যালিলিওর জীবনে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। ক্যাথলিক চার্চ তখনও ভূকেন্দ্রিক তত্ত্বকে ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য মতবাদ হিসেবে সমর্থন করত। ‘ডায়ালগ’ প্রকাশের পর চার্চ গ্যালিলিওর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে তিনি নিষিদ্ধ সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদ প্রচার করছেন। ফলাফল হিসেবে তাঁকে ধর্মীয় আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিজের মতামত প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি গৃহবন্দী অবস্থায় কাটান। তবু ইতিহাস প্রমাণ করেছে—ক্ষমতার চাপে সত্য সাময়িকভাবে দমে যেতে পারে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক সত্যকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা যায় না।

আজকের দৃষ্টিতে ‘ডায়ালগ কনসার্নিং দ্য টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস’ শুধু একটি জ্যোতির্বিদ্যার বই নয়; এটি বৈজ্ঞানিক চিন্তার এক সাহসী ঘোষণাপত্র। এই গ্রন্থ দেখিয়েছে যে প্রকৃতিকে বোঝার ক্ষেত্রে যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও প্রমাণই শেষ কথা। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির যে ভিত্তি—পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও সমালোচনামূলক চিন্তা—তার এক শক্তিশালী প্রকাশ আমরা গ্যালিলিওর এই রচনায় দেখতে পাই। মহাবিশ্বকে নতুন চোখে দেখার যে সাহস, সেই সাহসের ইতিহাসে এই বইটি চিরকাল এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ