বিজ্ঞান গবেষণামূলক সাময়িকী ‘নেচার’-এ ১৯৫৩ সালের ২৫ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিডের (ডিএনএ) ‘ডাবল হেলিক্স’ কাঠামোর প্রথম উন্মোচন হয়।
সেদিন থেকে জীববিদ্যার ইতিহাসে এক স্বর্ণালি অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন ও মরিস উইলকিন্সের তথ্যের ভিত্তিতে জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএর এ কাঠামো গড়েন। যুগান্তকারী এ কাঠামোর জন্য ১৯৬২ সালে তারা নোবেন পান। প্রাণের এ ‘গোপন সংকেত’ ডিকোড করার মাধ্যমেই উন্মোচন হয়েছে জীবনের নিগূঢ় রহস্য এবং বিকশিত হয়েছে আধুনিক বায়োটেকনোলজির অপার সম্ভাবনাময় জগৎ। এরপর থেকে ডিএনএ নিয়ে গবেষণা আরো অনেক দূর এগিয়েছে। এখনো প্রাণের অপার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে। মূলত এ আবিষ্কারের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রতি বছর ২৫ এপ্রিল ‘বিশ্ব ডিএনএ দিবস’ উদযাপিত হয়। এ বছরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিপাদ্য নিয়ে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘জেনেটিক আবিষ্কার: অতীতকে সম্মান, আগামীর অনুপ্রেরণা।’ সেই ১৯৫৩ সালের প্রাথমিক বিন্দু থেকে ভবিষ্যতের জিনোমিক বিপ্লবকে উৎসাহ দেয়াই এবারের প্রধান আকর্ষণ।
আধুনিক সময় এক্ষেত্রে সবচেয়ে বৈপ্লবিক উদ্ভাবন হলো ক্রিসপার-ক্যাস জিনোম এডিটিং প্রযুক্তি। এর জন্য ২০২০ সালে ইমানুয়েল শার্পেন্টিয়ে ও জেনিফার ডাউডনা রসায়নে নোবেল পান। বর্তমানে সিকল সেল অ্যানিমিয়া নিরাময় থেকে শুরু করে স্মার্ট কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থায় জিনোম এডিটিং প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের রÅালেতে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে এ প্রযুক্তির পরিচিত নামগুলো জিনোম এডিটিংয়ের মাধ্যমে ‘ডিজাইনার’ উদ্ভিদ ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে বিশাল বিনিয়োগের পরিকল্পনা জানিয়েছেন। অর্থাৎ কৃষি, স্বাস্থ্য ও বায়োইকোনমিতে এক নতুন যুগের সূচনা হতে চলেছে। গোটা বিশ্ব যখন এদিকে এগোচ্ছে তখন বাংলাদেশেরও রয়েছে কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে ক্রিসপার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘সবুজ বিপ্লব’ ঘটানোর সুযোগ। এ প্রযুক্তির বিকাশ দেশের বায়োটেকনোলজি খাতকে অনন্য উচ্চতায় নিতে পারে। সেগুলো ভেবে দেখা জরুরি।
বীজ শিল্পের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও করপোরেট কৌশল: বিশ্বের শীর্ষ চার বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান (কোর্টেভা, বেয়ার, সিনজেন্টা এবং বিএএসএফ) তাদের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক কৌশলে জিন এডিটিং প্রযুক্তিকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে নির্ধারণ করেছে। বিশেষত কোর্টেভা এখন ‘মাল্টিপ্লেক্স এডিটিং’ পদ্ধতির উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে কোষের ভেতরে একই সঙ্গে একাধিক জিন বা ডিএনএ সিকোয়েন্স পরিবর্তন করা সম্ভব। ফলে একই সঙ্গে খরা সহনশীল, রোগ প্রতিরোধী এবং উচ্চফলনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন এখন অনেক সহজ। অন্যদিকে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষকে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দিতে বেয়ার আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আইনি জটিলতা নিরসনে কাজ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে জিন-এডিটেড ফসলের জন্য নমনীয় আইন পাসের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিলে বিশ্ববাজারে উন্নত বীজের সরবরাহ নিশ্চিত হবে।
প্রধান দানাদার ফসলের বৈপ্লবিক রূপান্তর: ধান, গম ও সয়াবিনের মতো দানাজাতীয় শস্য মানুষের শর্করা ও ক্যালরির প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত। বায়োটেকের সাম্প্রতিক উদ্ভাবন কৃষিতে এমন গুণগত পরিবর্তন এনেছে, যা কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে। ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক কৃষিপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সাইবাস পানি সাশ্রয় করে শুকনো জমিতেও ধান চাষের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। প্রথাগত ধান চাষে প্রচুর পানি লাগে এবং তাতে বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায়। সাইবাসের উদ্ভাবনটি বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো খরাপ্রবণ এলাকার জন্য ভালো সমাধান হতে হবে। ইউরোপভিত্তিক স্টার্টআপ নিওক্রপ জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জিনের গঠন পরিবর্তনের মাধ্যমে উন্নত জাতের ফসল উদ্ভাবন করেছে। ওখানে এক ধরনের সাদা গম উদ্ভাবন করা হয়েছে, যাতে সাধারণ গমের তুলনায় পাঁচ থেকে ১০ গুণ বেশি ডায়েটারি ফাইবার বা আঁশ রয়েছে। স্থূলতা ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এ উদ্ভাবন নতুন করে সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। পশুখাদ্যের বাজারেও নিওক্রপ কনফ্লুয়েন্স জেনেটিকসের মাধ্যমে পরিবর্তন এনেছে। তাদের উদ্ভাবিত নতুন সয়াবিনে ১৪ শতাংশ বেশি প্রোটিন আছে। আবার এতে অপ্রয়োজনীয় শর্করা বা কার্বোহাইড্রেটও তুলনামূলক কম। ফলে পোলট্রি শিল্পে পশুর হজমজনিত সমস্যা যেমন এড়ানো যাবে, তেমনি উৎপাদন খরচ অনেকটা কমবে।
বিশেষায়িত ফসল: ভোক্তার রুচি ও পুষ্টির নতুন দিগন্ত: বর্তমানে কৃষি গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং ভোক্তার স্বাদ, স্বাস্থ্য ও ব্যবহারের সহজলভ্যতাও এখানে জরুরি। এজন্যই জিন টেকনোলজির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। অতীতে কৃষক বা উৎপাদকের সুবিধাই বিবেচনা করা হতো। কিন্তু এখন ভোক্তার পুষ্টি ও রুচিও সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাচ্ছে। আমেরিকার এগ্রো টেকনোলজি প্রতিষ্ঠান পেয়ারওয়াইজের একটা উদাহরণ দেয়া যাক। তারা অত্যাধুনিক ‘ফুলক্রাম’ প্লাটফর্ম ব্যবহার করে বেরি জাতীয় ফলের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। প্রথাগত ব্ল্যাকবেরির বীজ শক্ত আর গাছে কাঁটা থাকে। তাই কৃষকের জন্য ফল আহরণ আর ভোক্তার জন্য খাওয়া ছিল কঠিন। কিন্তু পরিবর্তনের পর এটি একদিকে ভোক্তার খাওয়ার অভিজ্ঞতাকে উন্নত করেছে, অন্যদিকে কৃষকের ফল সংগ্রহের শ্রম ও সময় সাশ্রয় করছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি আঁটি ছাড়া চেরি ফল উদ্ভাবন করার চেষ্টা করছে। এমনটি হলে বাচ্চাদের জন্য চেরি খাওয়া নিরাপদ ও সহজ হবে। পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় জাপানের সানাটেক লাইফ সায়েন্স জিন এডিটিংয়ের মাধ্যমে ‘সিসিলিয়ান রুজ হাই গাবা’ নামক টমেটো বাজারজাত করেছে। এটিতে সাধারণ জাতের তুলনায় চার গুণ বেশি গামা-অ্যামিনো বিউটিরিক অ্যাসিড (গাবা) বিদ্যমান। এ অ্যামিনো অ্যাসিড রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে সহায়ক। জিন এডিটিংয়ের মাধ্যমে এভাবেই ফাংশনাল ফুড বা ঔষধি গুণসম্পন্ন সুস্বাদু ফল উৎপাদন করা যায়।
খাদ্য অপচয় রোধে যুক্তরাজ্যের ট্রপিক বায়োসায়েন্স কলা, কফি ও ধানের মতো ক্রান্তীয় ফসলের জেনেটিক মানোন্নয়নে কাজ করছে। কলা দ্রুত পচে যাওয়া বা কাটার পর বাদামি বর্ণ ধারণ রোধে তারা জিন সাইলেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। তাদের উদ্ভাবিত কলা কাটার পর ১১-১২ দিন পর্যন্ত সতেজ থাকে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে আম, লিচু বা কলার মতো পচনশীল ফল সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে নষ্ট হয়। ট্রপিক বায়োসায়েন্সের এ পচনরোধী প্রযুক্তি দেশীয় ফলে প্রয়োগ করা গেলে তা ফল রফতানি এবং অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।
বিষমুক্ত রোগ ও কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণে জিন এডিটিং: মার্কিন কৃষিপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আগ্রাজিন উদ্ভাবিত ‘বন্ধ্যা পুরুষ পোকা’ (স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনোলজি) পদ্ধতি চলতি বছরের কৃষি সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এ প্রযুক্তিতে জিন এডিটিংয়ের মাধ্যমে ক্ষতিকর ‘স্পটেড উইং ড্রসোফিলা’র মতো পুরুষ পোকাদের প্রজননে অক্ষম করে দেয়া হয়। বন্ধ্যা পোকাগুলোকে ফসলের মাঠে অবমুক্ত করলে তারা বন্য স্ত্রী পোকাদের সঙ্গে মিলিত হলেও কোনো নতুন বংশধর জন্ম দিতে পারে না। ফলে প্রাকৃতিকভাবেই ওই এলাকায় পোকার সংখ্যা হ্রাস পায়। ২০২৫ সালে পরিচালিত মাঠ পরীক্ষায় দেখা গেছে, এ পদ্ধতিতে ক্ষতিকর পোকা ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত নির্মূল করা সম্ভব। এ প্রযুক্তি কেবল কীটনাশকের ব্যবহার এবং চাষীর উৎপাদন খরচই কমায় না, বরং মৌমাছির মতো উপকারী পতঙ্গ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। উদ্ভিদের কিছু নির্দিষ্ট জিন থাকে, যা জীবাণুকে আক্রমণ করতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানীরা সেই জিনগুলো ‘এডিট’ করে নিষ্ক্রিয় করে দেন। ফলে জীবাণু আর গাছকে আক্রমণ করতে পারে না। বাংলাদেশে সবজি ও ধান চাষে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। তাই এখানে ‘জেনেটিক কন্ট্রোল’ পদ্ধতি বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনের এক মোক্ষম হাতিয়ার হতে পারে। নির্দিষ্ট জাতের পোকা লক্ষ করে কাজ করায় এটি মাটির উর্বরতা রক্ষা এবং কৃষি শ্রমিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিরসনে একটি অনিবার্য ও স্মার্ট সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ডার্ক ডিএনএ ও ভবিষ্যতের প্রযুক্তি: উদ্ভিদ বিজ্ঞানের এক রহস্যময় ও অপ্রকাশিত অধ্যায় হলো ‘ডার্ক ডিএনএ’ বা জিনোমের অপ্রবেশযোগ্য অঞ্চল। উদ্ভিদের ডিএনএর প্রায় ২৫ শতাংশ প্রথাগত প্রজনন প্রক্রিয়ায় জিনগত বিনিময়ে অংশ নেয় না বলে একে ‘কোল্ড স্পট’ বলা হয়। ফ্রান্স ও বেলজিয়ামভিত্তিক বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠান মেওজেনিকস মিয়োসিস প্রক্রিয়ার ওপর গবেষণার মাধ্যমে এ দুর্ভেদ্য অঞ্চলে প্রবেশের পথ তৈরি করেছে। তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মাধ্যমে ডার্ক ডিএনএতে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত বৈশিষ্ট্যগুলোকে সক্রিয় করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে উদ্ভিদকে চরম খরা, অতিবৃষ্টি বা উচ্চ তাপমাত্রায় টিকে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এ প্রযুক্তির মাধ্যমে ধান ও টমেটোর হাজার বছরের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া কিছু বিলুপ্ত বৈশিষ্ট্য পুনরুত্থান করা হয়েছে। ভবিষ্যতের কৃষিতে ডার্ক ডিএনএর পাঠোদ্ধার অভাবনীয় বিপ্লব নিয়ে আসবে। এর মাধ্যমে উদ্ভিদের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো এবং ক্ষতিকারক পোকাদের বিরুদ্ধে জিনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এভাবে কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার গতি বাড়িয়ে শস্যের ফলন আরো ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব, যা বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তায় নতুন মাইলফলক স্থাপন করবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেশীয় ধানের জাতগুলোতে সুপ্ত থাকা লবণাক্ততা বা খরা সহনশীলতার নতুন কৌশল এ ডার্ক ডিএনএ থেকেই উন্মোচন করা সম্ভব।
ভোক্তাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও নৈতিকতা প্রসঙ্গে ভ্রান্তি বনাম বাস্তবতা: জিন এডিটিং প্রযুক্তির প্রসার ও এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্তি নিরসনে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা অনুধাবন করা জরুরি। সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে যে জিন এডিটিং এবং জিএমও একই কিনা। মূলত জিএমও প্রযুক্তিতে একটি উদ্ভিদে ভিন্ন প্রজাতির ডিএনএ প্রবেশ করানো হয়। একে বলা হয় ‘ট্রান্সজেনিক’ পদ্ধতি। বিপরীতে জিন এডিটিং বা ক্রিসপার প্রযুক্তি হলো উদ্ভিদের নিজস্ব ডিএনএর সুনির্দিষ্ট অংশে সূক্ষ্ম পরিবর্তন বা ‘স্নাইপিং’। এটা অনেকটা টাইপিংয়ের ভুল সংশোধনের মতো। এখানে বাইরে থেকে কোনো ভিন্ন ডিএনএ যুক্ত করা হয় না বলে একে প্রথাগত প্রজনন পদ্ধতির একটি উন্নত ও দ্রুত সংস্করণ হিসেবে গণ্য করা হয়। ভোক্তাদের মানসিকতা ও নৈতিকতার প্রশ্নে এ পার্থক্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোক্তা নিরাপদ ও পুষ্টিসম্পন্ন হলে জিন এডিটেড খাবার খেতে আগ্রহী। কীটনাশকের ব্যবহার হ্রাস এবং ভিটামিন বৃদ্ধির মতো সুবিধাগুলো ভোক্তাদের ইতিবাচক করে তুলছে। এর প্রমাণ জাপানের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকারী টমেটোর জনপ্রিয়তা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও দেশীয় ধানের জাত উন্নয়নে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও আদি বৈশিষ্ট্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া জরুরি। সঠিক তথ্য প্রচার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করলে এ বিষয়ে মানুষের ভ্রান্তি অনেকাংশে দূর হবে।
বাংলাদেশে স্মার্ট কৃষি-রূপান্তরে জিনোম এডিটিং: বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশের জন্য ক্রিসপার-ক্যাস জিনোম এডিটিং এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার অপরিহার্য হাতিয়ার হয়ে উঠছে। বর্তমানে বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের (বিএএস) অর্থায়নে এবং একজন বিশিষ্ট বিএএস ফেলোর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘কমিশন্ড প্রজেক্ট’ দেশের কৃষি গবেষণার ইতিহাসে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। আটজন প্রধান গবেষকের এ সমন্বিত উদ্যোগটি মূলত জলবায়ু-সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে। বিশেষ করে রাইস ব্লাস্ট এবং ব্যাকটেরিয়াল ব্লাইট প্রতিরোধী ধান উদ্ভাবনের মাধ্যমে যেমন রাসায়নিকের ব্যবহার কমবে, তেমনি উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা ও উত্তরাঞ্চলের খরা সহনশীল জাত উদ্ভাবন দেশের বিশাল পতিত জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনবে। এমনকি সুগন্ধি ধানকে জিন এডিটিংয়ের মাধ্যমে খাটো জাতে রূপান্তর করার প্রক্রিয়াটি গুণগত মান বজায় রেখে ফলন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এ বৈপ্লবিক প্রযুক্তির পূর্ণ সুফল পেতে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন। ল্যাবরেটরিতে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিকে কৃষকের মাঠ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বা ‘পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ শক্তিশালী করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব আইন এবং উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিমালার আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।
তোফাজ্জল ইসলাম:
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ডিন, গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি

Leave a comment