চিকিৎসা বিদ্যাজেনেটিকসবায়োটেকনলজি

“আগের কাজ ছিল জ্ঞানের জন্য, এখন কাজ সরাসরি মানুষের জীবন রক্ষার জন্য” — ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদ

Share
Share

বিজ্ঞানের জগতে গবেষণাকে সাধারণত দুই ভাগে দেখা হয়—মৌলিক গবেষণা (basic research) এবং প্রয়োগমূলক গবেষণা (applied research)। মৌলিক গবেষণার লক্ষ্য হলো প্রকৃতির নিয়ম ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করা; এর ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজে না লাগলেও ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করে। অন্যদিকে প্রয়োগমূলক গবেষণা সরাসরি কোনো সমস্যা সমাধান বা ব্যবহারযোগ্য সমাধান তৈরির দিকে এগোয়। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের গবেষণাজীবনে এই দুই ধারারই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি নিজেই বলেছেন, “আগের কাজ ছিল জ্ঞানের জন্য, এখন কাজ সরাসরি মানুষের জীবন রক্ষার জন্য।” এই বাক্যের ভেতর দিয়ে একজন গবেষকের বিবর্তনের গল্প স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাঁর গবেষণার শুরুর দিকের বড় অংশ কেটেছে এনজাইমের গঠন ও কার্যপ্রণালী বোঝার কাজে। এনজাইম কীভাবে কাজ করে, একটি অণু কীভাবে আরেকটি অণুর কাছে পৌঁছে যায়, প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন কেমন—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ছিল মূল লক্ষ্য। এই ধরনের গবেষণা সরাসরি কোনো ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করে না। কিন্তু আধুনিক জীববিজ্ঞানের ভাষায়, এ ধরনের মৌলিক জ্ঞান ছাড়া ভবিষ্যতের কোনো প্রয়োগমূলক উদ্ভাবন সম্ভব নয়। যেমন, এনজাইমের গঠন জানা না থাকলে ওষুধের অণু কীভাবে সেই এনজাইমকে বাধা দেবে বা পরিবর্তন করবে—তা বোঝা যায় না।

পরবর্তী সময়ে ড. আশরাফউদ্দিন সংক্রামক রোগ ও মারাত্মক টক্সিন নিয়ে কাজ শুরু করেন। বিশেষ করে বোটুলিনাম নিউরোটক্সিনের মতো ভয়ংকর বিষের কার্যকারিতা কীভাবে নষ্ট করা যায়—এই গবেষণা সরাসরি মানুষের জীবন রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে তাঁর আগের মৌলিক গবেষণার জ্ঞানই কাজে লেগেছে। এনজাইমের ত্রিমাত্রিক গঠন বোঝার অভিজ্ঞতা তাঁকে টক্সিনের ‘অ্যাক্টিভ সাইট’ চিহ্নিত করতে সাহায্য করেছে। সেই অনুযায়ী তিনি এমন যৌগ নকশা করেছেন, যা টক্সিনের ক্ষতিকর কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে।

এই রূপান্তর দেখায়—মৌলিক গবেষণা ও প্রয়োগমূলক গবেষণা আসলে আলাদা কোনো জগৎ নয়; বরং একটি অন্যটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। মৌলিক গবেষণা হলো মানচিত্র আঁকার কাজ, আর প্রয়োগমূলক গবেষণা হলো সেই মানচিত্র ধরে বাস্তব পথে হাঁটা। ড. আশরাফউদ্দিনের অভিজ্ঞতায়, দীর্ঘদিন ধরে অর্জিত মৌলিক জ্ঞানই তাঁকে প্রয়োগমূলক সমস্যায় কার্যকর সমাধান খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় মৌলিক গবেষণাকে ‘অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা’ হিসেবে দেখা হয়, আবার প্রয়োগমূলক গবেষণাকে ‘তাৎক্ষণিক ফল’ না পাওয়ার কারণে অবহেলা করা হয়। ড. আশরাফউদ্দিনের পথচলা দেখায়—এই দুই ধারাকে আলাদা করে না দেখে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে। দেশের জন্য কার্যকর সমাধান তৈরি করতে চাইলে আগে সমস্যার মৌলিক বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বুঝতে হবে।

সবশেষে, এই বক্তব্য তরুণদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা। আজ যে মৌলিক বিষয়গুলো শিখছেন—সেগুলো হয়তো এখনই কোনো “লাইফ-সেভিং” সমাধান তৈরি করছে না। কিন্তু আগামী দিনে যখন আপনি কোনো বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হবেন, তখন এই মৌলিক জ্ঞানই আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের গবেষণাজীবন সেই ধারাবাহিকতার একটি জীবন্ত উদাহরণ।

ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org