গবেষণার প্রথম পদক্ষেপগল্পে গল্পে বিজ্ঞান

শৈশবের প্রতিধ্বনি থেকে একাডেমিক অনুসন্ধান: এক অমোঘ নিয়তির উপাখ্যান

Share
Share

“Morning Shows the Day” প্রবাদটি অনেকের কাছে হয়তো নিছক কথার ফুলঝুরি, কিন্তু আমার কাছে এটি জীবনের এক গভীর সত্যের প্রতিধ্বনি। আজ আমি আর প্রতিদিন ল্যাবরেটরির বেঞ্চে দাঁড়িয়ে পরীক্ষা চালাই না; বরং গবেষণাপত্রের পাতায়, তত্ত্বের গভীরে এবং আন্তর্জাতিক জার্নালের কঠোর বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে আমি বিজ্ঞানের উত্তর খুঁজে ফিরি। এই অবস্থান থেকে ফিরে তাকালে বারবার মনে হয়-এই পথচলার শুরু আজ নয়, বহু আগে, সেই শৈশবের নির্জন দুপুরে।

ছোটবেলায় আমি জানতাম না ‘বায়োকেমিস্ট্রি’ বা ‘প্রাণরসায়ন’ কী, কিংবা কোনো বৈজ্ঞানিক পরিভাষার অর্থ কী। তবুও অদ্ভুত এক কৌতূহল আমাকে টানত প্রকৃতির ছোট ছোট পরিবর্তনের দিকে। গাছের পাতা, ফুলের রং, কিংবা অজানা রসের বা কষের মিশ্রণ, এসবই ছিল আমার কাছে এক রহস্যময় জগত। বাড়ির উঠোনের এক কোণে কিংবা গাছতলায় বসে আমি নিজের মতো করে বানিয়ে ফেলতাম এক ছোট্ট পরীক্ষাগার। ভাঙা পাত্রে ঢালতাম গুলঞ্চ ফুলের ঢালের সাদা কষ, অন্য পাত্রে দুধসর গাছের সাদা রস আবার কখনও তেলাকুচা পাতার সবুজ রস আর অপলক দৃষ্টিতে অপেক্ষা করতাম-কখন ঘটবে সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন।

বাস্তবে কিছুই ঘটত না। না উঠত কোনো ধোঁয়া বা না বদলাতো কোনো রঙ। তবুও সেই অপেক্ষার মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত আনন্দ, এক গভীর মনোযোগ। আজ বুঝি, সেই শিশুটি কোনো ব্যর্থ পরীক্ষা চালাচ্ছিল না; সে শিখেছিল ধৈর্য, শিখেছিল পর্যবেক্ষণ, শিখেছিল অদেখাকে বিশ্বাস করতে। প্রকৃতির সেই নিস্তব্ধ দুপুরগুলোই আসলে আমার ভেতরে বুনে দিয়েছিল এক গবেষকের বীজ, যে গবেষক পরে ল্যাবরেটরিতে যেমন দাঁড়িয়েছে, তেমনি আজ লেখার টেবিলে বসেও বিজ্ঞানের গভীরে প্রবেশ করে।

আমার শৈশবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি জড়িয়ে আছে একটি কার্পাস তুলা গাছের সাথে। আমার ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই গাছটি ছিল এক নীরব সঙ্গী। বাতাসে তার ডালগুলো দুলত, যেন আমাকে ডাকত। আমি, আমার ছোট বোন এবং বন্ধুরা মিলে সেই গাছ থেকে তুলা পেড়ে আনতাম, আর সেই তুলা দিয়ে বানাতাম পুতুলের জন্য ছোট ছোট বালিশ আর লেপ। সেই তুলার নরম স্পর্শ ছিল আমাদের কল্পনার জগতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কে জানত, সেই তুলাই একদিন হয়ে উঠবে আমার জীবনের অন্যতম বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু? বহু বছর পর, যখন আমি আমার একাডেমিক পথচলায় গভীরভাবে যুক্ত, তখন আবার ফিরে এল সেই একই উদ্ভিদ-তুলা। এখন আর এটি শুধু শৈশবের খেলনার উপাদান নয়; এটি এক জটিল বৈজ্ঞানিক সত্তা, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে সহনশীলতা, অভিযোজন এবং বেঁচে থাকার এক গভীর গল্প। গবেষণাপত্রের পাতায় যখন তুলা নিয়ে লেখা পড়ি বা বিশ্লেষণ করি, তখন মনে হয়-আমি যেন সেই পুরনো গাছটির সাথেই আবার কথা বলছি, তবে এবার ভাষা ভিন্ন।

এই সংযোগ আমাকে বারবার ভাবায়। শৈশবের সেই খেলা আর বর্তমানের এই একাডেমিক অন্বেষণ-দুটির মধ্যে কি কোনো অদৃশ্য সেতুবন্ধন রয়েছে? নাকি এটি কেবলই সময়ের এক আশ্চর্য মিল? ধীরে ধীরে আমি উপলব্ধি করেছি, মানুষ হঠাৎ করে কোনো কিছু হয়ে ওঠে না। আমাদের ভেতরের আগ্রহ, আমাদের কৌতূহল, আমাদের চিন্তার জগৎ-এসবের বীজ বোনা হয় অনেক আগেই, যখন আমরা তা বুঝতেও শিখিনা। এটিই মনে হয় প্রকৃতির হেয়ালি। 

আজ যখন আমি কোনো গবেষণাপত্রের জটিল তত্ত্ব বিশ্লেষণ করি, কোনো ম্যানুসক্রিপ্টের শক্তি ও দুর্বলতা খুঁজে বের করি, কিংবা নতুন কোনো ধারণাকে শব্দে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করি, তখন আমার মনে পড়ে সেই ছোট্ট শিশুটির কথা-যে নিঃশব্দে বসে বিভিন্ন পাতার রস মিশিয়ে অপেক্ষা করছিল এক অলৌকিক ঘটনার জন্য। তখন বুঝতে পারি, বিজ্ঞান কেবল পরীক্ষাগারের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এক দীর্ঘ যাত্রা-কৌতূহল থেকে জ্ঞান, খেলা থেকে বিশ্লেষণ, এবং অনুভূতি থেকে প্রজ্ঞার দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক অবিরাম পথ।

আমার এই গল্পটি কেবল আমার একার নয়; এটি সেই সব মানুষের গল্প, যারা তাদের শৈশবের কৌতূহলকে কখনো হারিয়ে ফেলেনি। কারণ প্রকৃতি আমাদের পথ দেখাতে শুরু করে অনেক আগেই-শুধু আমরা বড় হতে হতে সেই ভাষা ভুলে যাই। আর যারা সেই ভাষাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে, তাদের জীবনই হয়ে ওঠে এক অনবদ্য উপাখ্যান।

লেখক:
ড. রিপন সিকদার,
ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর (বীজ), পার্টনার প্রকল্প, বিএডিসি, ঢাকা

ইমেইল:
[email protected]
[email protected]

Share
Written by
ড. রিপন সিকদার

কৃষি উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ | উদ্ভিদ স্ট্রেস ফিজিওলজিস্ট | বিজ্ঞান যোগাযোগকর্মী | উপদেষ্টা, বিজ্ঞানী.অর্গ | ড. রিপন সিকদার একজন বাংলাদেশি কৃষি উন্নয়ন পেশাজীবী, উদ্ভিদ স্ট্রেস ফিজিওলজিস্ট এবং বিজ্ঞান যোগাযোগকর্মী। তিনি চীনের Chinese Academy of Agricultural Sciences থেকে Crop Cultivation and Farming System বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন, যেখানে তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল লবণাক্ততা ও পরিবেশগত চাপের মধ্যে নাইট্রোজেন-নিয়ন্ত্রিত ফসল সহনশীলতা বৃদ্ধি। পাশাপাশি তিনি Human Resource Management (HRM)-এ এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি Bangladesh Agricultural Development Corporation (বিএডিসি)-এ কর্মরত এবং World Bank এর PARTNER Program-এ উপপ্রকল্প পরিচালক (বীজ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি BMC Plant Biology, Scientific Reports, Frontiers in Plant Science সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক জার্নালের রিভিউয়ার এবং বাংলা ভাষায় জনপ্রিয় বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক।

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles