চিকিৎসা বিদ্যাবায়োটেকনলজি

“কে এটাকে শক্ত বানাচ্ছে?”—ক্যান্সারের পেছনের নীরব কোষ ‘ফাইব্রোব্লাস্ট’-এর গল্প

Share
Share

ক্যান্সারকে আমরা সাধারণত ক্যান্সার কোষের একটি সমস্যা হিসেবেই দেখি। কিন্তু টিউমারের ভেতরের পরিবেশ আসলে অনেক বেশি জটিল। সেখানে কেবল ক্যান্সার কোষই থাকে না—থাকে আরও নানা ধরনের কোষ, প্রোটিন ও আঁশের মতো কাঠামো। এই সমগ্র পরিবেশকে বলা হয় টিউমার মাইক্রো-এনভায়রনমেন্ট। ড. বাশার ইমন তাঁর গবেষণায় এই জটিল পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছেন—“কে এটাকে শক্ত বানাচ্ছে?”

গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে টিউমার তুলনামূলকভাবে নরম থাকে। কিন্তু রোগ যত বাড়ে, টিউমার তত শক্ত হয়ে ওঠে। এই শক্ত হয়ে যাওয়ার পেছনে কেবল ক্যান্সার কোষের ভূমিকা নেই। বরং বড় ভূমিকা রাখে এক ধরনের সহায়ক কোষ—ফাইব্রোব্লাস্ট (Fibroblast)।

ফাইব্রোব্লাস্ট আসলে আমাদের শরীরের ‘মেরামত কর্মী’। কোথাও কেটে গেলে বা ক্ষত হলে এরা সেখানে গিয়ে কোলাজেন নামের প্রোটিন জমা করে টিস্যুকে জোড়া লাগায়। অনেকটা যেমন দেয়ালে ফাটল ধরলে রাজমিস্ত্রি সিমেন্ট দিয়ে তা পূরণ করে দেয়। স্বাভাবিক অবস্থায় এই প্রক্রিয়াটি শরীরের জন্য উপকারী।

কিন্তু ক্যান্সারের পরিবেশে এই মেরামতকারী কোষগুলো যেন ভুল বার্তা পায়। ক্যান্সার কোষগুলো তাদের এমনভাবে প্রভাবিত করে যে ফাইব্রোব্লাস্ট অতিরিক্ত কোলাজেন তৈরি করতে থাকে। ফলে টিউমারের চারপাশে একটি শক্ত “জাল” তৈরি হয়। এই শক্ত পরিবেশ ক্যান্সার কোষের চলাচল ও আচরণ বদলে দেয়। নরম জায়গায় কোষগুলো তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকে, কিন্তু শক্ত পরিবেশে তারা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ে।

এই ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় মেটাস্ট্যাসিস। এটিই ক্যান্সার রোগীর জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়, কারণ তখন রোগটি আর একটি জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। ড. ইমনের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ফাইব্রোব্লাস্ট দ্বারা তৈরি এই শক্ত পরিবেশ মেটাস্ট্যাসিসকে সহজ করে তোলে। অর্থাৎ ক্যান্সারের বিস্তারে এই ‘নীরব’ কোষগুলোর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এখানেই আসে প্রকৌশলীর দৃষ্টিভঙ্গি। ড. বাশার ইমন ক্যান্সার কোষ ও ফাইব্রোব্লাস্টের এই পারস্পরিক সম্পর্ককে যান্ত্রিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করছেন। তিনি কোষগুলোর ওপর কী পরিমাণ বল প্রয়োগ হচ্ছে, তারা একে অপরকে কীভাবে টানছে বা চেপে ধরছে—এসব বিষয় পরিমাপ করছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, টিউমারের ভেতরের ‘কাঠামো’ ক্যান্সারের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।

এই গবেষণা থেকে ভবিষ্যতে নতুন ধরনের চিকিৎসার ধারণা আসতে পারে। যদি ফাইব্রোব্লাস্টের এই অস্বাভাবিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে টিউমারের শক্ত হওয়া কমানো সম্ভব হতে পারে। এতে ক্যান্সার কোষের ছড়িয়ে পড়ার গতি ধীর হতে পারে। অর্থাৎ ক্যান্সারের চিকিৎসা শুধু কোষ ধ্বংস করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, টিউমারের ভেতরের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের দিকেও এগোতে পারে।

ড. বাশার ইমনের এই কাজ আমাদের দেখায়—ক্যান্সার মানে শুধু ‘খারাপ কোষ’ নয়; এটি একটি পুরো পরিবেশের সমস্যা। সেই পরিবেশের ভেতরের নীরব খেলোয়াড়দের চিনতে পারলেই হয়তো আমরা ভবিষ্যতে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে আরও কার্যকরভাবে লড়তে পারব।

🔗 পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org