গবেষণার প্রথম পদক্ষেপসাধারণ বিজ্ঞান

“প্রতিদিনের জীবনে ‘কেন হচ্ছে?’—এই প্রশ্ন থেকেই গবেষণা শুরু” — ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদ

Share
Share

অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই গবেষণা মানে বিশাল ল্যাবরেটরি, দামি যন্ত্রপাতি আর দুর্বোধ্য সব বৈজ্ঞানিক শব্দ। ফলে গবেষণা যেন দূরের কোনো জগৎ—সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে যার সরাসরি সম্পর্ক নেই। কিন্তু ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের মতে, গবেষণার সূচনা এত দূরের নয়। তাঁর ভাষায়, “প্রতিদিনের জীবনে ‘কেন হচ্ছে?’—এই প্রশ্ন থেকেই গবেষণা শুরু।” এই বক্তব্য গবেষণাকে সাধারণ মানুষের জীবনের কাছাকাছি এনে দেয়।

প্রতিদিন আমরা অসংখ্য ঘটনা দেখি—কেন খাবার দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়? কেন কোনো ওষুধ এক জনের শরীরে ভালো কাজ করে, আরেক জনের ক্ষেত্রে কম কাজ করে? কেন কোনো এলাকায় পানির স্বাদ বদলে যাচ্ছে? এই ‘কেন’-এর প্রশ্নগুলোই মূলত বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের বীজ। গবেষণা মানে কেবল বড় কোনো আবিষ্কারের দিকে দৌড় নয়; বরং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে গভীরভাবে দেখা এবং তার পেছনের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা। ড. আশরাফউদ্দিন তাঁর দীর্ঘ গবেষণাজীবনে এই মনোভাবকেই অনুসরণ করেছেন।

বিজ্ঞানচর্চায় প্রশ্ন করার সংস্কৃতি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক সময় শিক্ষার্থীরা মুখস্থবিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। পাঠ্যবইয়ের তথ্যকে প্রশ্ন না করে মেনে নেওয়াকেই সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৌতূহল ধীরে ধীরে কমে যায়। ড. আশরাফউদ্দিনের অভিজ্ঞতায়, গবেষণাগারে যারা এগিয়ে যায়, তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহস রাখে। তিনি নিজেও এনজাইম নিয়ে গবেষণার সময় এমন প্রশ্ন তুলেছিলেন—যেখানে সবাই ধরে নিয়েছিল একটি এনজাইম একটি নির্দিষ্ট কাজই করে, সেখানে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, “কেন এটি অন্যভাবে কাজ করতে পারবে না?” এই প্রশ্ন থেকেই নতুন ফল বেরিয়ে আসে।

‘কেন’ প্রশ্নটি শুধু ল্যাবরেটরির ভেতরের বিষয় নয়; এটি সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কেন নদীর পানি দূষিত হচ্ছে? কেন শহরের বাতাসে ধোঁয়া বাড়ছে? কেন কৃষকের উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না? এসব প্রশ্ন থেকেই গবেষণার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো চিহ্নিত করা যায়। ড. আশরাফউদ্দিন মনে করেন, উন্নয়নশীল দেশের গবেষণার অগ্রাধিকার হওয়া উচিত স্থানীয় বাস্তব সমস্যা—পানি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, পরিবেশ। বড় বড় তাত্ত্বিক প্রশ্নের পাশাপাশি বাস্তব সমস্যার দিকে তাকানোই গবেষণাকে সমাজের সঙ্গে যুক্ত রাখে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি তরুণদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিক্ষার্থী গবেষণায় যেতে ভয় পায় এই ভেবে যে তাদের কাছে উন্নত যন্ত্রপাতি বা বিদেশি ল্যাবের সুযোগ নেই। অথচ ড. আশরাফউদ্দিনের মতে, গবেষণার প্রথম ধাপ যন্ত্রপাতি নয়—ভাবনা। প্রশ্ন করার অভ্যাস তৈরি হলে সীমিত উপকরণেও ছোট পরিসরে অনুসন্ধান শুরু করা সম্ভব। একটি স্কুল বা কলেজের ল্যাবেও পর্যবেক্ষণ, তুলনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষণার মানসিকতা গড়ে তোলা যায়।

সবচেয়ে বড় কথা, ‘কেন হচ্ছে?’—এই প্রশ্ন আমাদেরকে নিছক দর্শক থেকে সক্রিয় অনুসন্ধানীতে পরিণত করে। সমাজের নানা সমস্যাকে যখন আমরা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিই, তখন পরিবর্তনের সুযোগ নষ্ট হয়। কিন্তু যখন আমরা প্রশ্ন করি, তখনই পরিবর্তনের দরজা খুলতে শুরু করে। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের এই দর্শন আমাদের শেখায়—গবেষণা মানে কেবল নতুন তথ্য যোগ করা নয়; গবেষণা মানে চারপাশের পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখা।


ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles