গবেষণায় হাতে খড়ি

এই অভ্যাস না বদলালে বিজ্ঞানী হওয়া অসম্ভব

Share
Share

সন্ধ্যার ট্রাফিকে আটকে থাকা একটা বাস। ভেতরে গরমে হাঁসফাঁস মানুষ। হঠাৎ বাতাস নেই কেন? ড্রাইভার জানে না, কন্ডাক্টর জানে না, যাত্রীরা শুধু বিরক্ত। কিন্তু জানালার পাশে বসা এক ছেলেমেয়ে চুপচাপ ভাবছে, বাসে বাতাস ঢোকে কোথা দিয়ে, কোন দিক বন্ধ, ফ্যান কেন কাজ করছে না। সে ক্লাসের অঙ্কটা ভুলে গেছে, কিন্তু এই মুহূর্তে তার মাথা একটা অদ্ভুত অঙ্কে আটকে গেছে। সে বুঝতে পারছে, সমস্যা মানেই কেবল ভোগান্তি না, সমস্যা মানেই প্রশ্ন। আর প্রশ্ন মানেই বিজ্ঞানের শুরু।

আমরা অনেকেই ভাবি, বিজ্ঞানী মানে সাদা কোট, কঠিন সূত্র, ভয়ংকর যন্ত্রপাতি। অথচ বাস্তব বিজ্ঞানী হওয়ার প্রথম অনুশীলন শুরু হয় চায়ের কাপে, রিকশার চক্রে, মোবাইলের চার্জ ফুরোনোর রহস্যে। বিজ্ঞানী মানসিকতা মানে প্রশ্ন করার লাইসেন্স পাওয়া না, বরং প্রশ্ন না করলে অস্বস্তি বোধ করা। একটা বাল্ব কেন জ্বলে, একটা গাছ কেন মরে, ইন্টারনেট কেন স্লো হয়, এই ছোট প্রশ্নগুলোই বড় মানুষের জন্ম দেয়।

বাংলাদেশে আমাদের দৈনন্দিন জীবন সমস্যায় ঠাসা। পানি আসে না, বিদ্যুৎ যায়, বাস দেরি করে, মোবাইল নেটওয়ার্ক হঠাৎ উধাও। আমরা রাগ করি, গালাগালি করি, কিন্তু খুব কমই বুঝতে চেষ্টা করি। অথচ এই শহরই সবচেয়ে বড় ক্লাসরুম। UNESCO-র এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব শিক্ষার্থী বাস্তব সমস্যার সঙ্গে শিখতে শেখে, তাদের সমস্যার সমাধান করার দক্ষতা অন্যদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়। অর্থাৎ সমস্যা থেকে পালানো নয়, সমস্যার ভেতরে ঢুকতেই শেখা।

বিজ্ঞানী মানসিকতা তৈরির সবচেয়ে বড় শত্রু হলো অভ্যাসগত অবহেলা। আমরা অনেক কিছু ঘটতে দেখি, কিন্তু ভাবি না। ঘড়ির কাঁটা চলে, সূর্য ওঠে, রাস্তায় পানি জমে, আমরা সব মেনে নিই। বিজ্ঞানী জিজ্ঞেস করেন, “কেন?” আর এই “কেন”-এর পেছনে ছোটা মানেই চিন্তার পেশি গড়ে তোলা। যেমন, তুমি যদি লক্ষ্য করো, গরমে কেন শহর বেশি গরম হয়, গ্রামে তুলনামূলক ঠান্ডা—এই এক প্রশ্ন তোমাকে নিয়ে যেতে পারে জলবায়ু বিজ্ঞান পর্যন্ত।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, আগামী দুই দশকে সবচেয়ে বেশি চাহিদা হবে সমস্যাধান ও সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতার। ডিগ্রি নয়, চিন্তা বিক্রি হবে। অথচ আমাদের ক্লাসরুম এখনো মুখস্থনির্ভর। ফলে আমরা সার্টিফিকেট পাই, কিন্তু কৌতূহল হারাই। অথচ কৌতূহলই সেই শক্তি, যা স্কুলের বেঞ্চ থেকে গবেষণাগারের টেবিল পর্যন্ত নিয়ে যায়।

দৈনন্দিন সমস্যাকে বিশ্লেষণ করা মানে জটিল গণিত করা না, মানে ধীরে দেখা শেখা। তুমি যদি প্রতিদিন রাতে নিজেকে একটা প্রশ্ন দাও, “আজ আমি কী শিখলাম?”—এই ছোট অভ্যাসই বড় পরিবর্তন আনে। একদিন হয়তো তুমি লক্ষ করবে, কেন ফোনটা দ্রুত গরম হয়, কেন বৃষ্টিতে নেটওয়ার্ক খারাপ হয়, কেন কিছু মানুষ একই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। এই প্রশ্নগুলোই পরে হয়ে ওঠে প্রকল্প, থিসিস, উদ্ভাবন।

আইজ্যাক নিউটন আপেলের গল্পটা শুধু গল্প নয়, সেটা শেখায়, ছোট ঘটনাতেও মহাবিশ্ব লুকিয়ে থাকে। ডারউইন গ্যালাপাগোস দ্বীপে পাখি দেখেই বুঝে গিয়েছিলেন, জীবন বদলায়। আইনস্টাইন ট্রামে বসে আলোর গতির কথা ভাবতেন। তারা কেউই শুরুতে বড় বিজ্ঞানী ছিলেন না। তারা ছিলেন বড় প্রশ্নকারী।

আজকের যুগে বিজ্ঞানী মানসিকতা মানে শুধু বই পড়া না, মানে ডেটা বোঝা, প্যাটার্ন দেখা, সম্পর্ক খোঁজা। তোমার ফোনের হেলথ অ্যাপ, গুগল ম্যাপসের ট্রাফিক, ফেসবুকের অ্যালগরিদম—সবকিছুই জীবন্ত ল্যাব। তুমি যদি এগুলোকে শুধু ব্যবহার না করে বুঝতে চাও, তবেই তুমি আধুনিক বিজ্ঞানীর পথে হাঁটো।

বাংলাদেশে আমরা প্রায়শই বলি, সুযোগ নেই। কিন্তু সুযোগ কখনো তৈরি হয় না, সুযোগ খুঁজে নিতে হয়। তুমি যদি তোমার চারপাশকে প্রশ্নে ভরিয়ে দাও, তাহলে এই শহরই তোমাকে গবেষণার উপাদান দেবে। নদীর রং পরিবর্তন, বায়ুর গন্ধ, খাদ্যের স্বাদ—সবই তথ্য।

বিজ্ঞানী মানসিকতা গড়ার মানে এই নয় যে, তুমি সব সমস্যার উত্তর বের করবে। মানে তুমি মানবে না যে, উত্তর জানা যায় না। এই না-মানাই তোমাকে আলাদা করে।

রাত শেষে যখন তুমি একা, বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছ, তখন মনে রেখো—তোমার চারপাশ নিজেই একটা বই। পড়তে শিখলে তুমিও বিজ্ঞানী। আজ থেকে বাসে বসে শুধু জানালার বাইরে তাকাবে না, ভেতরের হিসাবও কষবে। এভাবেই সাধারণ জীবন ধীরে ধীরে গবেষণাগার হয়ে উঠবে।

এই দেশের দরকার এমন তরুণ, যারা সমস্যাকে গালি দেয় না, ব্যাখ্যা করে। যারা শুধু অভিযোগ করে না, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। যারা অন্ধকারে কাঁদে না, আলো খোঁজে।

আর সেই খোঁজের শুরুটা হয় আজ, এই মুহূর্তে, তোমার চোখ দিয়ে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org