Home / গণিত / বাগান থেকে মহাকাশ – মীজান রহমান

বাগান থেকে মহাকাশ – মীজান রহমান

মীজান রহমান

এক

ছোটবেলা থেকেই দু’টি ফলবৃক্ষের গল্প শুনে এসেছি আমরা। একটি আদম-হাওয়ার ‘নিষিদ্ধ’ ফলের গল্প, আরেকটি আইজ্যাক নিউটনের গাছ থেকে আপেল পড়ার গল্প। ‘নিষিদ্ধ’ ফল বলতে যে আসলে ‘জ্ঞান’ বোঝায় সেটা বুঝতে বেশ সময় লেগেছিল, যদিও সেযুগের (এবং এযুগেও) লোকেরা প্রায় আক্ষরিক অর্থেই মেনে নিয়েছিলেন গল্পটা (এবং যার সত্যতা বিষয়ে ধর্মগুরুরা যেমন নিঃসন্দেহ আধুনিক বিজ্ঞানীরা ঠিক তেমনই সন্দিহান)। তবে আপেলের গল্পটি তুলনামূলকভাবে অনেক ইহজাগতিক, অতএব বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু আসলেই কি ঘটেছিল ব্যাপারটা? আসলেই কি নিউটনের মাথাবরাবর হতভাগা আপেলটি পড়ে গিয়েছিল গাছ থেকে?

মহৎ লোকেদের নিয়ে চুটকি-চাটকি গল্প সবারই পছন্দ। আলবার্ট আইন্স্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব আমরা ক’জন বুঝি সেটা ভাববার বিষয়, কিন্তু তাঁর কাল্পনিক যানে করে মহাকাশ ভ্রমণের চিত্তাকর্ষক কাহিনী শুনতে কার না ভাল লাগবে বলুন। এটা চমক লাগানোর মত গল্প তো বটেই যে বড়ভাই শূন্যভ্রমণের পর থেকে ফিরে এসে দেখেন ছোটভাইয়ের বয়স তাঁর চেয়ে বেশি! এর চেয়ে বড় বিস্ময় আর কি হতে পারে। আপেক্ষিক তত্ত্বের এটুকু রহস্যই আমাদের জন্য যথেষ্ট—-আইনস্টাইন চিরকালের জন্য আমাদের মনে গেঁথে রইলেন। সত্যমিথ্যা কি আসে যায়। গল্প মজার হলেই হল।
প্রাচীন যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত ছিলেন সিরাকিউজের গ্রীক পণ্ডিত আর্কিমেডিস (খৃঃপূঃ ২৮৭-২১২)। একাধারে পদার্থবিদ, প্রকৌশলি, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, এবং সর্বোপরি সেসময়কার শ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞ। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাঁকে মনে রেখেছে কিভাবে? একটি শব্দ দিয়েঃ “ইউরেকা”। মানেঃ ‘পেয়েছি, পেয়েছি’। আর মনে রেখেছে শব্দটা উচ্চারণ করতে করতে তাঁর নির্বস্ত্র হয়ে বেরিয়ে পড়া বাড়ি থেকে। আমরা সাধারণ মানুষ যেমন লাখ টাকার লটারি জিতে ফেলতে পারলে নেংটা হয়ে রাস্তায় বেরুবার উপক্রম হই, উনি সেরকম কোনও লটারি জেতেননি—কেবল একটা বড় আইডিয়া মাথায় এসে গিয়েছিল টবের পানিতে স্নানরত অবস্থায় থাকাকালে। গল্পটা রসালো তাতে সন্দেহ নেই, এবং সাধারণ মানুষের জন্যে সেটাই যথেষ্ট। কার কি গরজ পড়ে গেছে জানার যে তিনি ছিলেন প্রকৌশলিদের অবশ্যপাঠ্য বিষয় স্ট্যাটিক্স ও হাইড্রোস্ট্যাটিক্সের জনক, ছিলেন পদার্থের আপেক্ষিক গুরুত্বতত্বের (specific gravity) উদ্ভাবক, এবং এই আপেক্ষিক গুরুত্বের আইডিয়াটিই তাঁকে উত্তেজনার চরম শিখরে পৌঁছে দিয়ে গোছলের জায়গা থেকে বের করে করে দিগম্বর অবস্থায় রাস্তায় নিয়ে গিয়েছিল। অনেকে হয়ত জানেও না যে রোমানদের বিরুদ্ধে গ্রীকপক্ষের যুদ্ধকালে এক মূর্খ রোমান সৈন্যের অস্ত্রাঘাতে এই মহান ব্যক্তিটির প্রাণহানি হয়েছিল।
আইজ্যাক নিউটনের আপেলপতনের গল্পটি তেমন মজাদার না হলেও একটা চমকপ্রদ রোমান্টিকতা ছিল এতেও। আপেলের বাগান, তরুণ নিউটন ঘাসের ওপর শুয়ে শুয়ে ডুবে আছেন তাঁর কল্পনার জগতে। এমন সময় গাছ থেকে টুপ করে একটা পাকা আপেল পরে গেল ঠিক তাঁর কপাল বরাবর। আর অমনি দৈববাণীর মত তাঁর মাথায় উদয় হল এক অসাধারণ চিন্তা—-তাইতো, এ তো মহাবিশ্বব্যাপী এক গূঢ় মহাশক্তির উপস্থিতিকে ঘোষণা করছে। অনেকটা যেন ধর্মগ্রন্থের অহি-নাজেলের মতই প্রেরণাজাগানো। আসলে নিউটন নিজেই নাকি ওই আপেলবৃক্ষটিকে আদিসৃষ্টির সেই বাইবেল-বর্ণিত ‘জ্ঞানবৃক্ষ’ বলে ধারণা করে বসেছিলেন (গল্পটি বিশ্বাসযোগ্য না হলেও এটা সত্য যে মহামতি নিউটন অতিশয় ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন, এবং প্রচলিত ভূতপ্রেতজাতীয় গল্পের প্রতি যথেষ্ট দুর্বলতাও ছিল তাঁর)। যা’ই হোক এ-নিবন্ধের প্রাথমিক আলোচ্য বিষয় হল গল্পগুলো কতখানি সত্য, এবং কতটুকুই বা পুরোপুরি বানোয়াট। নিউটনের বাগানে কি সত্যি সত্যি আপেল পড়েছিল তাঁর মাথায়? নাকি আর্কিমেডিসের গল্পের মতই সন্দেহসংকুল?
সম্ভবত আপেলের ঘটনাটি আসলেই ঘটেছিল নিউটনের গ্রামের বাড়িতে। তার অন্তত দু’টি ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে। প্রথম সাক্ষ্য এসেছে তাঁরই ভাইঝির স্বামী জন কনডুইট নামক এক যুবকের লিখিত বয়ান থেকে—কনডুইট পরবর্তীকালে স্যার আইজ্যাক নিউটনের সহযোগী ছিলেন ইংল্যাণ্ডের টাঁকশালাতে পরিচালকের পদে নিযুক্ত থাকাকালে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী ১৬৬৬ সালে ব্রিটেনের ব্যাপক মহামারির সময় নিউটন কেম্ব্রিজ থেকে তাঁর গ্রামের বাড়ি লিঙ্কনশায়ারে মায়ের কাছে চলে গিয়েছিলেন। ছুটিছাটাতে বরাবরই তা করতেন তিনি। একদিন ভাবাকুল অবস্থায় বাগানে হাঁটাহাঁটি করার সময় গাছ থেকে একটি পাকা আপেল টুপ করে মাটিতে পড়ে তাঁর চোখের সামনে। আর অমনি তাঁর মন ছুটে গেল অন্যজগতে। এই পড়াটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে হল তাঁঁর কাছে। নিচে পড়ছে কেন? এবং ঠিক লম্বালম্বিভাবে, কোণাকুণি বা আঁকাবাঁকা হয়ে নয়। এথেকে তিনটি জিনিস প্রতীয়মান হয়ে উঠল তাঁর মনে। এক, আপেল নিচে পড়ে, ওপরে ওঠে না, কারণ নিচের দিকেই আকর্ষণধর্মী একটা শক্তি তাকে টেনে নেয়। দুই, কোণাকুণি বা বাঁকানো পথে পড়ে না তার কারণ আকর্ষণটি পৃথিবীর ঠিক কেন্দ্রের দিকে—-অর্থাৎ মাধ্যাকর্ষণ একটি কেন্দ্রিক শক্তি(central force), যার একটা গভীর তাৎপর্য আছে। তিন, এই আকর্ষণ কেবল আপেলের বেলায় কাজ করে তা নয়, এটাই বিশ্বপ্রকৃতি—সকল বস্তুর ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য। প্রতিটি ভরযুক্ত বস্তুই আসলে একে অন্যকে এভাবে আকর্ষণ করে। ছোট বস্তুর বেলায় এটা লক্ষণীয় নয়, বড় বস্তু, যেমন ভূমণ্ডল, সেক্ষেত্রে অবশ্যই লক্ষণীয়।
দ্বিতীয় সাক্ষ্য আমরা পাই নিউটনের ব্যক্তিগত বন্ধু (লোকটার বিশাল প্রভাবপ্রতিপত্তি ছিল বটে সমগ্র দেশজুড়ে, কিন্তু বন্ধুসংখ্যা ছিল হাতে গোণার মত) উইলিয়াম স্টুকলি (১৬৮৭-১৭৬৫) ও বিশিষ্ট জীবনীকার ও ইতিহাসবিদ তাঁর বিখ্যাত বন্ধুর জীবনীতে লিখে গেছেন যে আপেলের গল্পটি তাঁর বন্ধুর নিজের মুখ থেকে শোনা—১৭২৬ খৃষ্টাব্দে, অর্থাৎ নিউটনের মৃত্যুর একবছর আগে লণ্ডনের কেন্সিংটন পার্কে বসে দুজনে ঘনিষ্ঠ আলাপ করা কালে। এবং তাঁর বর্ণনার সঙ্গে জন কনডুইটের বর্ণনা প্রায় হুবহু মিলে যায়। তাতে মনে হয়, বিজ্ঞানের অন্তত এ-গল্পটি হয়ত একেবারে মনগড়া নয়।
কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়। বিজ্ঞানের তো ধারাই এটা। কোনকিছুই চূড়ান্তভাবে মিটে যায় না। আপাতদৃষ্টিতে একটা প্রশ্নের সমাধান হয়ে গেলে নতুন প্রশ্ন সৃষ্টি হয়, অনেকসময় সেই সমাধান থেকেই প্রশ্নের উদ্রেক হয়। আপেলের ঘটনা সত্য হলেও প্রশ্ন ওঠে সর্বজনীন মাধ্যাকর্ষণের ধারণাটা কি হঠাৎ করে দৈববাণীর মত পেয়ে গিয়েছিলেন নিউটন, না, আগেও একটা ইতিহাস ছিল বা ছিল কোনও বৈজ্ঞানিক আভাস ইঙ্গিত। সাধারণত বিজ্ঞানের কোনও বড় আইডিয়া হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়ে যায় না। প্রচণ্ডরকম মেধাবি কোনও ব্যক্তি একদিন ঘুম থেকে উঠে ইউরেকা বলে ঘরের বাইরে চলে যান না তাঁর সদ্যপ্রাপ্ত বৃহৎ আইডিয়া নিয়ে। বিজ্ঞানের রীতিটাই এমন যে সব সৃষ্টির পেছনেই একটা দীর্ঘকালীন প্রস্তুতি লাগে, লাগে একটা চিন্তাভাবনার ধারাবাহিকতা, সেটা মৌলিক চিন্তাই হোক আর যৌক্তিক চিন্তাই হোক। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্বের পেছনে তিনশ’ বছর আগে ছিলেন গ্যালিলিও গ্যালিলি যাঁর নিজেরও একপ্রকার আপেক্ষিক তত্ব ছিল যা আইনস্টাইনের চিন্তাজগতে যথেষ্ট খোরাক যুগিয়েছিল। তদুপরি ছিল নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ব যা না থাকলে চট করে এতসব যুগান্তকারি ভাবনা তাঁর মাথায় প্রবেশ করার সুযোগ পেত কিনা সন্দেহ। শুধু তাই নয়, তাত্বিক বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় সহায় অন্য বিজ্ঞানীদের তত্বকথা নয়, ফলিত বিজ্ঞানীদের পরীক্ষালব্ধ ল্যাবরেটরিজাত তথ্যসমূহ।
নিউটন কেবল মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অস্তিত্বই উপলব্ধি করে ক্ষান্ত হননি, তার প্রকৃতিও পূর্ণভাবে নিরূপণ করে গিয়েছিলেন। দুটি বস্তু পরস্পরকে আকর্ষণ করে ঠিকই, কিন্তু সেই আকর্ষণের মাত্রা কমতে শুরু করে বস্তুদ্বয়ের দূরত্বের সাথে, ওটা প্রায় সাধারণ বুদ্ধিতেই বোঝার মত, কিন্তু এই কমে যাওয়ার পরিমাণটা যে দূরত্বের বিপরীত বর্গের অনুপাতে সেটা বুঝে ফেলা কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। নিউটন সেটা বুঝতে পেরেছিলেন সহজেই। কিন্তু কিভাবে বুঝেছিলেন, এবং তিনিই প্রথম ব্যক্তি কিনা বিপরীত বর্গনীতি আবিষ্কারের, তারও একটা পশ্চাদকাহিনী আছে।
মহাকাশের গ্রহনক্ষত্র নিয়ে মানুষের কৌতূহল আজকের নয়, পুরাকাল থেকেই। বর্তমান যুগে আমরা যেমন অমাবস্যার রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে অবাক বিস্ময়ে সপ্তর্ষিমণ্ডল আর নক্ষত্ররাজির মিটিমিটি আলোর রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করি, আদিযুগের মানুষরাও ঠিক একইভাবে তারাদের গতিবিধি বুঝবার চেষ্টা করতেন। এযুগে আমাদের হাতে হাজারটে যন্ত্র আছে দূর দূর নক্ষত্র, যা খালি চোখে দেখা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়, সেটা দূরবীন দিয়ে অনায়াসে দেখতে পারা। সেযুগের মানুষ তাই খালি চোখে যা দেখতেন তারই ওপর ভরসা করে প্রকৃতির ধারাপ্রকৃতি সম্বন্ধে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে যেতেন। তাঁরা দেখতেন চন্দ্রগ্রহ কিভাবে প্রতিমাসে নিয়মিত উদয় হচ্ছে আকাশে ছোট্ট কাস্তের আকারে, তারপর দুসপ্তাহের মাঝে বৃদ্ধি পেতে পেতে পূর্ণ গোলাকার মূর্তিতে আকাশ-পাতাল উজাড় করে দিচ্ছে আলোতে আলোতে। সেই যে সুনির্দিষ্ট সময়ান্তর প্রতিমাসে একইভাবে উদয় হওয়া, পূর্ণ হওয়া,আবার বুঁজে যাওয়া , সেই পর্যবেক্ষণ থেকেই জন্ম নেয় চান্দ্রবৎসর। প্রাচীন যুগে প্রায় সবদেশেই চান্দ্রবৎসরের ব্যবহার ছিল। এখন কোথাও তা ব্যবহার করা হয়না, যদিও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে প্রায় প্রতিটি মুসলিমপ্রধান ও ইহুদী রাষ্ট্র ইজরায়েলে চান্দ্রিক বৎসর অবধারিতভাবে প্রচলিত আজো পর্যন্ত।ইহুদীদের ইহুদী পঞ্জিকা আর মুসলমানদের হিজরি পঞ্জিকা পুরোপুরিই চন্দ্রানুসারী।
আধুনিক যুগে যেমন পাশ্চাত্য সভ্যতা জ্ঞানবিজ্ঞানের সর্বক্ষেত্রেই অগ্রসর প্রাচ্যের অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায়, মধ্যযুগের আগ পর্যন্ত পরিস্থিতি ছিল ঠিক তার বিপরীত—-পশ্চিমই বরং ছিল অনেক পশ্চাতে। বিশেষ করে ভারত, চীন এবং সর্বোপরি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের তুলনায়। সেসময় ইসলামিক সভ্যতার স্বর্ণযুগ—জ্ঞানবিজ্ঞানের সর্ববিষয়ে তারাই ছিলেন নেতৃস্থানীয়। ওদিকে ভারতের প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ আর্যভট্ট ৪৯৯ খৃষ্টাব্দে বিশ্বকেন্দ্রিক ব্রহ্মাণ্ডের পরিবর্তে একটি সূর্যকেন্দ্রিক ব্রহ্মাণ্ডের মডেল তুলে ধরলেন সর্বসমক্ষে—-শুধু তাই নয়, তিনি এ’ও বললেন যে পৃথিবী কেবল সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণই করে না, প্রতিদিন নিজেরই একটা কক্ষপথে একবার করে ঘুরপাক খায়। তারপর ১০০০ সালে আরব জগতের বিখ্যাত গবেষক আবু রায়হান বিরুনী প্রায় একই প্রস্তাব দাঁড় করালেন সুধিসমাজে, সম্ভবত আর্যভট্টের ঘোষণা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অনবহিত থেকেই। (সেকালে ইন্টারনেটের গুগুল সার্চ মেশিন দূরে থাক কাগজের ব্যবহারই শুরু হয়নি)। দুঃখের বিষয় যে পরবর্তিতে বিরুনী তাঁর অগ্রমুখি মতামত থেকে দূরে সরে গিয়ে গতানুগতিক বিশ্বাস, অর্থাৎ বিশ্বকেন্দ্রিকতা এবং চান্দ্রবৎসরে ফিরে গেলেন। তারপর ১৩০০ সালের দিকে নাজম আল-দিন আল-কাতিবি নামক এক গবেষক নানারকম ছবিটবি এঁকে প্রমাণ করতে চাইলেন যে পৃথিবী আসলেই সূর্যের চারদিকে ঘোরে, উল্টোটা নয়। কিন্তু তিনিই বা কি কারণে বিরুণীর মত গতানুগতিক ধারাতে ফিরে গেলেন, সে’ও এক রহস্য বটে।
এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা কি সব বিফল ছিল তাহলে? একবার এটা একবার ওটাতে বিশ্বাস করে তাঁরা কি মানুষকে বিভ্রান্ত করছিলেন? মোটেও না। গবেষণা কখনোই ব্যর্থ হয় না, যদিও তার ফলাফল সবসময় সত্য না’ও হতে পারে। দেখা গেল যে আল-কাতিবির সেই বর্জিত আঁকাজোঁকাগুলো বিস্তারিতভাবে ব্যবহার করেছিলেন পোলাণ্ডের নিকোলাস কপার্নিকাস(১৪৭৩-১৫৪৩) নামক এক বিজ্ঞানমনস্ক জ্যোতির্বিদ, যদিও কথাটি স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি কোথাও (তাঁর নিজের আঁকা ছবির সঙ্গে কাতিবির ছবিগুলো অবিকল মিলে যাওয়াতেই বিজ্ঞানের ঐতিহাসিকরা এমন একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছেন)। কপার্নিকাসের প্রণীত গ্রন্থ “On the Revolution of Celestial Spheres” (১৫৪৩) বলতে গেলে পশ্চিম বিশ্বে এক অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূচনা করে। খৃস্টান চার্চের তৎকালীন টলেমি ও আরিস্টটোলভিত্তিক ভূকেন্দ্রিক তত্বের অনড় বিশ্বাসের ভিত্তি নড়িয়ে তিনিই প্রথম স্থির বিশ্বাসের ওপর বুদ্ধি ও যুক্তির প্রাধান্য স্থাপন করে দিলেন। বইটি প্রাকাশলাভের অব্যবহিত পরই তিনি মারা যান। সম্ভবত মৃত্যু তাঁকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল চার্চের অপরিসীম লাঞ্ছনা, এমনকি দৈহিক অত্যাচারের কবল থেকে। তাঁর মতামত সমর্থন করার কারণেই সমসাময়িক বেশ কজন খ্যাতনামা ব্যক্তির ভাগ্যে অসীম দুর্ভোগ নেমে এসেছিল, মহামান্য গ্যালিলিও তা থেকে রেহাই পাননি। কিন্তু চার্চ রুদ্ধ করতে পারেনি প্রগতির পথ। বুদ্ধিকে যদি তার নিজস্ব নির্বাধ পথে অগ্রসর হতে না দেওয়া হয়, তাহলে সেজাতি আত্মদহনে কালে কালে নির্বাপিত হয়ে যেতে বাধ্য। ইউরোপীয় সভ্যতা তার জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত। কেবল ইউরোপীয়ানই বা বলব কেন, প্রাক-মধ্যযুগের ইসলামিক সভ্যতারও তো প্রায় একই ইতিহাস। ইসলামের যে বর্তমান বাধার দেয়াল দাঁড় করানো জ্ঞানসাধনার প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই বাধানিষেধগুলো সেসময় তা ছিল না। এবং ছিল না বলেই আজকে আমরা ‘ইসলামিক সভ্যতা’ বলে একটা যুগের কথা গর্বের সঙ্গে স্মরণ করতে পারি।
এবার আসুন আমরা সেই পুরনো প্রশ্নে ফিরে যাই—-কার আগে কে কি করেছিলেন। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, এবং বিশেষ করে বিপরীত বর্গনীতি, উভয় আবিষ্কারের জন্যেই আদি জনক হলেন রবার্ট হুক। অথচ নিউটন যখন তাঁর মাধ্যাকর্ষণ তত্ব এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলি সুবিন্যস্তভাবে প্রকাশ করেন ১৬৮৭ সালের ৫ই জুলাই, তাতে তিনি হুক সাহেবের নাম উল্লেখ করেছিলেন বটে, কিন্তু ‘জনক’এর গৌরব তাঁর সঙ্গে ভাগাভাগি করতে প্রস্তুত ছিলেন না। বেচারা হুক। বিপরীত বর্গনীতি, আসলে কি নিউটন সাহেব নিজে থেকেই টের পেয়েছিলেন বাগানের গাছ থেকে আপেল পড়ার পর, না, তাঁর পেছনে একটা কাহিনী ছিল যা তাঁকে সাহায্য করেছিল সেটাকে পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে। দেখা যায় যে রবার্ট হুক নামক এক সহব্রিটন (আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে ‘হুকস ল’ নামক একটা সূত্র অধ্যয়ন করেছি তাদের কাছে নামটি মোটেও অপরিচিত নয়) মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সম্বন্ধে কেবল অবহিতই ছিলেন না, এ শক্তি যে বিপরীত বর্গনীতি পালন করে সে-মর্মে পেপারও লিখেছিলেন, এবং সে পেপারটি ব্রিটেনের সম্মানিত প্রতিষ্ঠান ‘রয়েল সোসাইটি’তে পাঠ করেছিলেন ১৬৭০ সালের ২১শে মার্চ তারিখে। তদুপরি পেপারটি তিনি স্বয়ং আইজ্যাক নিউটনের কাছে ডাকযোগে প্রেরণ করেছিলেন ১৭৬৯ খৃষ্টাব্দে। এতে কি প্রমাণ হয় যে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সত্যিকার জনক ছিলেন রবার্ট হুক, নিউটন নন? নিউটনের বৈজ্ঞানিক নিবন্ধসমূহ (মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সহ) মুদ্রিত আকারে প্রকাশলাভ করে ১৬৮৭ খৃষ্টাব্দে, সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ Philosophiae Naturalis Principia Mathematica তে। তাতে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ও বিপরীত বর্গনীতির আইডিয়াটির আদ্যোপান্ত ইতিহাস সবিস্তারে বর্ণনা করেছিলেন, এবং হুক সাহেবের যেটুকু কৃতিত্ব প্রাপ্য বলে মনে হয়েছিল তাঁর তার স্বীকৃতি দেওয়াতে মোটেও কার্পণ্য করেননি। রবার্ট হুকের রয়েল সোসাইটিতে পড়া পেপার এবং তাঁর ব্যক্তিগত পত্র সবই তিনি উল্লেখ করেছেন, যা আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন যে-কোন গবেষকের জন্যে অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং পেশাগতভাবে শোভন ও অভীষ্ট। কিন্তু তা সত্বেও মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, বিপরীত বর্গতত্ব, এবং এসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যের মূল আবিষ্কারক হিসেবে তাঁর নিজস্ব দাবি প্রত্যাহার করতে রাজি ছিলেন না। তাঁর যুক্তিটা ছিল এরকমঃ ঠিক আছে, মানছি যে রবার্ট হুক এবং তাঁর আগে আরো দুএকজন গবেষক এই শক্তির অস্তিত্ব অনুভব করেছিলেন, এমনকি এই শক্তি যে দূরত্বের সাথে বিপরীত বর্গের নিয়মে হ্রাসপ্রাপ্ত হয় সেটাও তাঁদের কাজের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু এই তথ্যগুলো যে সত্যি সত্যি প্রকৃতির সকল পদার্থের বেলাতে প্রযোজ্য তার কোনও প্রমাণ তাঁরা দেননি। কোনও গাণিতিক গণনাকার্যদ্বারা তাঁদের সিদ্ধান্তগুলোকে সুদৃঢ় যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে যেতে পারেননি। তিনি বললেন যে তত্বগুলোর নির্ভুল প্রমাণের জন্যে বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষানিরীক্ষা দরকার। যেহেতু মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণেই গ্রহনক্ষত্রের নিত্য এবং নিয়মিত প্রদক্ষিণ, বিশেষ করে আমাদের সৌরমণ্ডলের সূর্যের চারদিকে পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহের বাৎসরিক আবর্তন, সেসব চাক্ষুশ তথ্যাবলির সঙ্গে হুবহু না হলেও অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোন তত্বই গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে না। তিনি যেসমস্ত তত্ব দাঁড় করিয়েছেন তা সেই কাজটি অত্যন্ত সফলভাবে করে, কিন্তু হুক বা তাঁর পূর্ববর্তী অন্য গবেষকরা সেধরণের পাকাপাকি কোনও যুক্তি দাঁড় করাতে পারেননি। উপরন্তু নিউটন যুক্তিসঙ্গতভাবেই দাবি করলেন যে তিনি বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইউহান কেপ্লারের (১৫৭১-১৬৩০)প্রামাণিক তথ্যসমূহ ব্যবহার করে দেখিয়েছেন যে তাঁর গাণিতিক ফলাফলের সঙ্গে সেগুলো সুন্দরভাবে মিলে যায়। সর্বোপরি তিনি গণিতের যে অংশটি আবশ্যিকভাবেই ব্যবহার করেছিলেন সেটা তাঁর আগে কেউ ব্যবহার করতে পারেন নি, কারণ তাঁর প্রণেতা নিউটন স্বয়ং—-ক্যালকুলাস, বা কলনশাস্ত্র।
কিন্তু কেপ্লারের পরীক্ষিত তথ্যগুলি কি সেটা তো বলা হল না এখনো। কেপ্লার সম্পূর্ণ নিজের কল্পনাতেই সৌরমণ্ডলের গ্রহউপগ্রহদের গতিবিধি নির্ধারণ করতে পেরেছিলেন তা নয়। সেকালের বড় মাপের জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং কেপ্লারের পূর্বসূরি ছিলেন টাইকো ব্রাহি ( ১৫৪৬-১৬০১) নামক এক অসাধারণ প্রতিভাশীল বিজ্ঞানী। তাঁর জন্ম ডেনমার্কে, যদিও তাঁর জন্মস্থানটি বর্তমানে সুইডেনের অংশ। তিনি ছিলেন দূরবীণের পোকা—-সারাক্ষণ দূরবীণ নিয়ে মজে থাকতেন আকাশের তারাদের গতিপথ আবিষ্কারের আশায়। একটু রগচটা প্রকৃতির মানুষ ছিলেন ভদ্রলোক—কারো সঙ্গেই খুব একটা সুসম্পর্ক রাখতে পারতেন না। এমনকি ডেনমার্কের রাজার সঙ্গেও রাগারাগি করে দেশ ছেড়ে চলে গেলেন চেকোশ্লাভাকিয়ার প্রাগ শহরে। সেখানে তাঁকে অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া হয় মনের খুশিতে গ্রহনক্ষত্রের দিকে দূরবীণ উঁচিয়ে তাকিয়ে থাকার। বেশ বড়রকমের একটা প্রেক্ষাগৃহও তৈরি করে দিয়েছিলেন প্রাগের তৎকালীন শাসনকর্তা। একা একা সব কাজ কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না বলে ইউহান কেপ্লার নামক একটি মেধাবী জার্মান তরুণকে নিযুক্ত করলেন সহকারী হিসেবে। সেটা ছিল ১৬০০ খৃষ্টাব্দ। শুরুতেই দুই প্রতিভার ঠোকাঠুকি লেগে গেল, প্রধানত কেপ্লারের পারিতোষিক নিয়ে। যাই হোক সেটা মীমাংসা হয়ে যাবার পর দুই বিজ্ঞানী উঠে পড়ে লেগে গেলেন সৌরমণ্ডলের সঠিক প্রকৃতি নির্ধারণ করার কাজে। ভাগ্যের এমনই লিখন যে তার ঠিক একবছর পরই মান্যবর ব্রাহি অন্তর্ধান করেন। তাঁর অবর্তমানে প্রাগের বিচক্ষণ শাসনকর্তা কেপ্লারকেই নিযুক্ত করে ফেললেন ব্রাহির স্থলে। কেপ্লার ব্রাহির দূরবীণলব্ধ বেশ কিছু তথ্য সৌরমণ্ডলের নিয়মকানুন হিসেবে গ্রহণ করে দুটি সূত্রের ওপর আস্থা স্থাপন করেন। সেগুলো এরকমঃ
১। সৌরমণ্ডলের যাবতীয় গ্রহাদি (পৃথিবীসহ) অধিবৃত্ত পথে প্রদক্ষিণ করে সূর্যের চতুর্পাশ্বে। (কপার্নিকাসের ধারণা ছিল গ্রহপথগুলো বৃত্তাকার। বৃত্তের প্রতি পুরাকাল থেকেই মণীষীদের একটা দারুণ পক্ষপাতিত্ব ছিল। তাঁরা ভাবতেন যে বৃত্ত, গোলক, এগুলো হল ‘নিখুঁত’, এবং যেহেতু সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনাতে খুঁত থাকা সম্ভব নয় সেহেতু বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যাবতীয় জ্যামিতিক আকৃতিকেও নিখুঁত হতে হবে। কপার্নিকাস নিজেও সেই আদর্শ বিশ্বাস করতেন)
২। এই প্রদক্ষিণের বেগটা এমন যে গ্রহ থেকে সূর্যবরাবর একটি সরলরেখা আঁকতে পারলে দেখা যাবে যে রেখাটি সমান সমান সময়ে সমান সমান এলাকা অতিক্রম করে যাচ্ছে।
তিনি দাবি করেন যে সূত্রগুলো দূরবীণের সূক্ষ পর্যবেক্ষণ দ্বারা দীর্ঘ পরীক্ষা নিরীক্ষার পর নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ঘোষণাটির সময়কাল ছিল ১৬০৯ সাল। কেপ্লারের তৃতীয় একটি সূত্র আছেঃ
৩।সূর্যের চারপাশে পুরো একবার ঘূর্ণনের জন্যে যে সময় ক্ষেপন হয় তার বর্গ হল তার অধিবৃত্তটির পরাক্ষের অর্ধাংশ নিয়ে তার তৃতীয় মাত্রার সমানুপাতিক সম্পর্কে সংযুক্ত। এতে করে প্রতিটি গ্রহের সৌরবৎসরের সাথে তার জ্যামিতিক অধিবৃত্তের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায়। অর্থাৎ সূর্য থেকে দূরত্ব যত হবে ততই লম্বা হবে তার বৎসর। সেটা হয়ত সাধারণ বুদ্ধিতেই বুঝে নেওয়া যায়, কিন্তু ঠিক কি নিয়মে তা ঘটে সেটা কেপ্লারের দূরবীণ তাঁকে সে সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। উল্লেখ্য যে এই সূত্রটি পাকাপাকিভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে তাঁকে পুরো দশ বছর ধরে চিন্তাভাবনা করতে হয়েছিল। এর প্রকাশকাল ছিল ১৬১৯ খৃষ্টাব্দ।
এখন কথা হল রবার্ট হুক কেপ্লারের সূত্রগুলো সম্বন্ধে জানতেন কিনা কিছু। যদিবা জেনে থাকেন তার ব্যবহার প্রকাশ পায়নি তাঁর সপ্তদশ শতকের সপ্তম দশকের প্রকাশিত গবেষণার মধ্যে। খুব সম্ভব উপায়ও ছিল না তাঁর। এবং সেকারণেই হয়ত তাঁর বৈজ্ঞানিক ঘোষণাগুলোকে কোনও পরীক্ষাগারিক তথ্য দ্বারা সমর্থন করতে সক্ষম হননি। নিউটন তা পেরেছিলেন, কারণ তাঁর হাতে তখন এক মোক্ষম হাতিয়ার তৈরি হয়েছিল, যার নাম ক্যালকুলাস, যেটা তাঁর নিজেরই আবিষ্কার। উপরন্তু তাঁর কাছে দ্বিতীয় আরেকটি মোক্ষম অস্ত্র ছিল—বস্তুর গতিসূত্রত্রয় (Three laws of Motion), যা নিউটনের নিজেরই উদ্ভাবন। ক্যালকুলাসের সাথে গতির ত্রিসূত্র ব্যবহার করে তিনি অনায়াসে দেখিয়ে দিলেন যে গাণিতিক গণনার সঙ্গে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিপরীত বর্গসূত্র জুড়ে দিলে কেপ্লারের সৌরমণ্ডলের গতিবিষয়ক তিনটি সূত্রই অনায়াসে বের হয়ে আসে, যা বর্তমান যুগের স্নাতকশ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরা ঘরে বসেই কষে ফেলতে পারে। ইউনিভার্সিটির ফলিত গণিতের ক্লাসে আমি নিজেও করেছি সেটা।অবশ্য নিউটন গোড়াতে যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন কেপ্লারের সূত্র প্রমাণ করতে তাতে ক্যালকুলাস প্রয়োগ করা হয়নি, প্রয়োগ করেছিলেন সেকালের জনপ্রিয় জ্যামিতিক পদ্ধতি। সেটা আজকের ছেলেমেয়েদের জন্যে চট করে বুঝে ফেলা সহজ হবে না। বলা যায় তাঁর জ্যামিতিক যুক্তিগুলো বেশ জটিলই মনে হবে এযুগের ছেলেমেয়েদের কাছে।
এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, গ্রামের বাড়ির আপেলবাগানে যখন গাছ থেকে আপেল পড়ে গেল তাঁর মস্তক বরাবর তখন কি তিনি আগেকার গবেষকদের মাধ্যাকর্ষণবিষয়ক চিন্তাভাবনার কথা জানতেন? সেসময় তাঁর বয়স ২৪, কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা ও গণিতের সেরা ছাত্র। ফ্রান্সের ইসমায়েল আর আরব বিজ্ঞানীদের কাজের কথা শুনেও থাকতে পারেন। কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ শক্তি যে বিপরীত বর্গের আইন পালন করে সেটা কেউ হলপ করে বলতে পারেননি, কারণ তাঁদের কাছে কোনও প্রমাণ ছিল না। পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীরা কেউ কেউ অনুমান করে বলেছেন বিপরীত বর্গের কথা, এমনকি কেপ্লার এমন মতামত রেখে গেছেন যে আইনটি সম্ভবত বিপরীত বর্গ নয়, শুধু বিপরীত মাত্রাই—-অর্থাৎ দূরত্ব যত বাড়বে আকর্ষণের তীব্রতা ততই কমবে, তবে ভগ্নাংশটি ১/(দূরত্ব) অনুসারে, ১/(দূরত্ব)*২ অনুসারে নয়। সমস্যা হল যে কেপ্লার সাহেবও কোন প্রমাণ দাঁড় করাতে পারেননি।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে আপেলপতনের দৃশ্য থেকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রকৃতি সম্বন্ধে নিউটনের মনে যে প্রেরণা উদয় হয় সেটা ছিল পুরোপুরি মৌলিক, কারো কাছ থেকে ধার করা নয়, এবং তাতে তাঁর তীক্ষ্ণ ধীশক্তির পরিচয়ই শুধু প্রকাশ পায়না, তাঁর অসাধারণ পর্যবেক্ষণ শক্তি ও অবরোহী ক্ষমতার স্বাক্ষর বহন করে। এই মানুষটি আপাদমস্তক একজন বিশুদ্ধ সৃষ্টিশীল প্রতিভা ছিলেন যাঁর সমকক্ষ বিজ্ঞানী হাজার বছরে একজন হয়না।
আমার নিজের অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে, ছাত্রাবস্থায়, কল্পনা করেছি এমন কোন শক্তির অস্তিত্ব প্রকৃতির মধ্যে যেখানে আকর্ষণ বা বিকর্ষণের শক্তি বর্গের নিয়মে ঘটে না, সম্পূর্ণ ভিন্ন নিয়মে চলে। অর্বাচীন মন, যৌবনের আকাশকুসুম কল্পনা। এখন বুঝি যে প্রকৃতির নিয়মগুলি এমনই যে তার থেকে একটু উনিশ বিশ হলেই আমাদের কোনও অস্তিত্বই থাকত না। নিউটন তাঁর সদ্য আবিষ্কৃত গাণিতিক পদ্ধতির মাধ্যমে প্রমাণ করতে পেরেছিলেন যে কেপ্লারের সৌরমণ্ডল সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো সত্য হলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বিপরীত বর্গ পালন করতে বাধ্য। তার উল্টোদিক থেকে ভাবতে গেলে বিপরীত বর্গের একমাত্র ফলাফলই হল কেপ্লারের সূত্র নির্ভুল।
মজার ব্যাপার হল যে এই বিপরীত বর্গের প্রতি প্রকৃতির যেন একটা বিশেষ পক্ষপাতিত্ব আছে। পদার্থের পারস্পরিক আকর্ষণের ক্ষেত্রেই কেবল নয়, চুম্বক, স্থিত তড়িত (Static Electricity), আলো বিকীরণ—-এসবের মধ্যেও সেই একই নিয়মের প্রভাব দেখা যায়। দু’টি বিদ্যুতকণা যেমন একে অন্যকে টানে বিপরীত বর্গের নিয়মে, দু’টি চুম্বককণাও ঠিক সেভাবেই টানে বা ঠেলে দেয় (বিপরীত মেরু বা সমমেরু অনুসারে)। অনুরূপভাবে, একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে টর্চলাইট জ্বেলে যদি সে আলোর বিকীরণ লক্ষ করা হয় গোলাকার (যার কেন্দ্র হচ্ছে সেই আলোর উৎসটি) কোনও পাতের ওপর তাহলে দেখা যাবে পাতটি যতই দূরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেই আলোর বিন্দু থেকে ততই তার জ্যোতি কমে যাচ্ছে ঠিক সেই অনুপাতেই, অর্থাৎ বর্গের নিয়মে। এর একটা সহজবোধ্য কারণও আছে—কেন্দ্র থেকে পাতটির মাঝখান পর্যন্ত যে দূরত্ব সেটি হল গোলকের ব্যাসার্ধ, এবং ওই গোলকাংশটুকুর আয়তন সেই ব্যসার্ধের বর্গেরই অনুপাতে, অতএব এটা সহজেই অনুমানসাপেক্ষ যে ওই টর্চের আলো থেকে বিচ্ছুরিত রশ্মির তীব্রতা হ্রাস পাবে বিপরীত বর্গেরই অনুসারে, যতই তার দূরত্ব বৃদ্ধি পাবে আলোর উৎস থেকে। অর্থাৎ এখানেও সেই একই বিপরীত বর্গনীতির প্রযোজ্যতা প্রকাশ পেল।
নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আর বিপরীত বর্গনীতির সঙ্গে পূর্ববর্তী গবেষকদের একটা জায়গায় বড় পার্থক্য—-অন্যেরা এই তত্বের প্রয়োগশীলতা যে কেবল স্থানীয় পরিবেশে অবস্থিত দুটি বস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, উর্ধাকাশের গ্রহনক্ষত্রসহ সমগ্র বিশ্বচরাচরেই সমানভাবে প্রযোজ্য সেটা তাঁরা স্পষ্ট করে উল্লেখ করেননি, সম্ভবত তাঁদের কাছে কোন পরীক্ষিত প্রমাণ ছিল না বলেই। কিন্তু নিউটনের তা ছিল, এবং সেকারণেই তাঁর তত্বে ছিল বিশেষভাবে আকর্ষণীয় একটি উপাদান—সর্বজনীনতা, যা ওঁদের তত্বে ছিল না।
কথা হল নিউটনের তত্ব কি একেবারেই নিখুঁত নির্ভুল? বহুলাংশে তাই। সাধারণ ব্যবহারের জন্যে তাঁর প্রদত্ত তথ্যসমূহ এখনও পূর্ণমাত্রায় প্রয়োগ করা হয়, এমনকি বর্তমান যুগের মহাশূন্যযানের প্রকৌশলশাস্ত্রেও। তবে সংসারের অন্যান্য বিষয়ের মত বিজ্ঞানেরও বিবর্তন বলে একটা কথা আছে—সময়ের সাথে তার আভ্যন্তরীন চিন্তাভাবনাগুলো নতুন যুগের আলোকে পুনঃপরীক্ষার বিষয় হয়ে ওঠে। উঠে আসে উন্নততর যন্ত্রপাতি, তৈরি হয় আধুনিকতর গবেষণাগার। উনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে বিজ্ঞানীদের উপলব্ধির নাগালে এসে গেল যে নিউটনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তত্বে একটা জিনিস স্বতসিঃদ্ধ বলে ধরে নেওয়া হয়েছে, প্রচ্ছন্নভাবে হলেও, যে আলোর গতি অসীম। সেটা আসলে সত্য নয়—-আলবার্ট আইনস্টাইনের গবেষণা থেকে সেটা অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে ফুটে উঠেছে। তদুপরি তাঁর গবেষণা প্রকাশলাভের বেশ আগেই আমেরিকান পদার্থবিদ মাইকেলসন আর মর্লির পর্যবেক্ষণে সেই একই তথ্য পরিষ্কারভাবে বের হয়ে এসেছে। তবে কথাটা হলঃ এই নবার্জিত জ্ঞান কি নিউটনের বলবিজ্ঞান আর বিপরীত বর্গনীতিসহ মাধ্যাকর্ষণ বিষয়ক যাবতীয় তত্বকে একেবার নাকচ করে দেয়? মোটেও না। সাধারণ ব্যবহারের জন্যে নিউটন এখনও রাজার আসনে বসে আছেন, এবং সম্ভবত থাকবেনও আজীবন। পরিবর্তন যা হয়েছে সেটা কতগুলো ছোটখাট বিষয়ে, যেমন বুধগ্রহটির গতিপরিক্রমাতে একটা সূক্ষ্ম ব্যাপার ছিল যা নিউটনের তত্বের সঙ্গে ঠিক খাপ খাচ্ছিল না, কিন্তু আইনস্টাইনের অভিনব তত্বপ্রদত্ত গণনাতে সেগুলো প্রায় নিখুঁতভাবে মিলে যায়। তদুপরি নিউটনের তত্ব অনুযায়ী বিশ্বব্রম্মাণ্ডের কোনও সীমা নেই, আইনস্টাইন বলছেন, না, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য নয়। সীমা আছে বইকি, মহাবিশ্বের সীমানা সেখানে যতদূর আলোকরশ্মি ভ্রমণ করতে পারে অপ্রতিহত অবস্থায়। তাঁর যুগান্তকারি যুক্তিসমূহের মাঝে একটি হল যে আলো ভরশূন্য হলেও বড় নাক্ষত্রদ্বারা প্রভাবিত, আলো তার কাছে এসে বেঁকে যায়, কারণ সেই নক্ষত্রটি তাকে টেনে নিচ্ছে, যেমন নেয় ভরযুক্ত বস্তুকে। স্বভাবতই এসব সূক্ষ্ম বিষয়গুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে একেবারেই প্রযোজ্য নয়—আমরা নিউটনকে পেয়েই খুশি।

দুই

নিউটনের মাধ্যাকর্ষণতত্বের আরেকটি সীমাবদ্ধতা হল এই যে এতে কেবল দু’টি বস্তুর পারস্পরিক আকর্ষণের কথা বলা হয়েছে। যতক্ষণ আমরা দুই বস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকি ততক্ষণ নিউটন অপরাজেয়। তাঁর বিপরীত বর্গনীতি আর গতিসূত্র—দুয়ে মিলে উভয় বস্তুর গতিপথ নিখুঁতভাবে বের করে দেবে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দুই বস্তুর মধ্যে সীমিত থাকা ঘটনা কত আর দেখা যায়। বিশেষ করে গ্রহনক্ষত্রের বেলায় এটা জলের মত পরিষ্কার যে একটা গ্রহ বা উপগ্রহ একাধিক বিশাল ভর বিশিষ্ট বস্তুর নৈকট্য দ্বারা প্রভাবিত। যেমন ধরুণ আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী চন্দ্রগ্রহ—-বেচারা আমাদের উপগ্রহের উপাধি পেয়েছে কারণ তার কপালটিই এরকম যে ক্ষুদ্র হওয়ার অপরাধে তাকে সূর্যের চারদিকে নয়, পৃথিবীরই চারদিকে প্রদক্ষিণ করতে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে।
কিন্তু তাতে বিষয়টা সরল হয়ে যায় না, বরং নতুন এক জটিলতার মাত্রা যোগ হয়। এখন একই পাড়াতে দুটি নয়, তিনটে নায়ক দাঁড়িয়ে যাচ্ছে—একদিকে সর্বাধিনায়কের আসনে নিজ গাম্ভীর্যময় আলোকসত্ত্বা নিয়ে বসে আছে সূর্যদেব। আরেকদিকে তারই অমোঘ আকর্ষণের বলয়তে আবদ্ধ হয়ে আছে আমাদের পৃথিবী, অপরদিকে রয়েছে ক্ষুদ্রতর চন্দ্রগ্রহ, যার আকার ছোট হলেও তারও আকর্ষণ নেহাৎ তুচ্ছুতাচ্ছিল্য করার মত নয়। সুতরাং মাহাকাশের একই পরিবেশের মাঝে দুটি নয়, তিনটি খেলোয়াড় দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হল নিউটনের তত্ব যদি দুই বস্তুর সীমানাতে আবদ্ধ হয়ে থাকে তাহলে তার অর্থ কি এই দাঁড়ায় যে তাঁর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিও অকেজো হয়ে যায় এই ত্রিদেহী জটের মধ্যে? না, সৌভাগ্যবশত তা হয় না, এখানেও দ্বিদেহী ক্রিয়ার মত মাধ্যাকর্ষণ শক্তিসহ নিউটনের বলবিদ্যার সমীকরণ সমূহ সমভাবে প্রযোজ্য। সমস্যা যেটা দাঁড়ায় সেটা হল যে দ্বিদেহী তত্বের মত বস্তুগুলোর গতিপথ চট করে বেরিয়ে আসে না দুচারটে অঙ্ক কষার পর। আসলে চট করে দূরে থাক আদৌ বেরুয় কিনা সন্দেহ। প্রথমদিকে নবীন প্রবীণ সবরকম গবেষকদের ধারণা ছিল এটা কোন সমস্যা হল? নিউটনের গতিবিষয়ক সমীকরণগুলো থাকতে চিন্তা কিসের। কিন্তু কাজের বেলায় দেখা গেল ব্যাপারটা অত সহজ নয়। যুগে যুগে বহু বহু জ্ঞানীগুণি মানুষ মাথা ঘামিয়েছেন ত্রি-দেহী সমস্যার সমাধান পেতে। ইংরেজিতে একে বলা হয় থ্রি-বডি প্রব্লেম, যা নিউটনের সময়কার টু-বডি প্রব্লেম থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, এবং যার জটিলতার মাত্রা একবারে সীমা ছাড়ানো। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গবেষক এ-সমস্যার বিশেষ বিশেষ সমাধান বের করেছেন সীমিত শর্তাদি ব্যবহার করে, এবং অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো কাজেও লেগেছে। কিন্তু কোনরকম শর্ত আরোপ না করে পূর্ণ প্রয়োগযোগ্যতাশীল সমাধান বের করতে, অন্তত নিউটনের কলনশাস্ত্র ব্যবহার করে, আজ পর্যন্ত কেউই সক্ষম হননি।
তর্কের খাতিরে প্রশ্ন তোলা যায়ঃ আচ্ছা, আমরা থাকি এই মরবিশ্বে, মাধ্যাকর্ষণ বলয়ের বাইরে কোনদিনই আমাদের যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, অতএব আমদের সাধারণ জীবনধারণের জন্যে একাধিক গ্রহের পারস্পরিক ঠোকাঠুকি নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকারই বা কি। অনর্থক একটা কাল্পনিক বিষয় নিয়ে অজস্র টাকা খরচ করে কি লাভ হবে আমাদের। এ-প্রশ্নের অন্তত দুটি উত্তর, যা মানবকূলের সকলের জন্যেই প্রাসঙ্গিক এবং প্রয়োজনীয়। প্রথমটি হল আমাদের জ্ঞানের সীমানা কোথায় সেটা তন্নতন্ন করে খুঁজে নেওয়ার অন্তহীন প্রচেষ্টা আমাদের মনুষ্যত্বকে একটা ভিন্ন মাত্রা দান করে। এই যে প্রতিদিন রাতের আকাশে এত এত গ্রহনক্ষত্রের সমাবেশ যা কবি আর বিজ্ঞানীকে সমভাবে অনুপ্রাণিত করে গেছে অনাদিকাল থেকে তাদের সঙ্গে আমাদের এই ভূখণ্ডটির আসল সম্পর্কটা কি। এটা যদি জানতে পারি তাহলে আমাদের আদি ইতিহাস—আমাদের অস্তিত্বের আগাগোড়া পরিক্রমা—কোথায় আমাদের যাত্রা শুরু, কোথায়ই বা শেষ, তার কিছুটা হদিস হয়ত পাওয়া যেতে পারে।
তবে দ্বিতীয় একটি মাত্রা আছে যা আধুনিক বিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি—শূন্যভ্রমণ। বলবেন, শূন্যেই বা যেতে হবে ভ্রমণের জন্যে কে বলল। লোকে ফ্লোরিডা যায়, মেক্সিকো যায়, বড়জোর ইউরোপে। শূন্যে যাবে কোন পাগল? হ্যাঁ, পাগল বটে। বড় বড় বিজ্ঞানীরা, গবেষকরা আসলেই পাগল। পাগল না হলে কি জীবনের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে দিনরাত ল্যাবের ঘিঞ্জি ঘরের ভেতর যন্ত্রপাতি নিয়ে সময় কাটায়? কি জানেন? ওরা কাটায় বলেই আমাদের জীবন আজকে এত আরাম আয়েসময় বিলাসদ্রব্য দ্বারা পরিপূর্ণ হতে পেরেছে। এত সব ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেটের মহাপ্লাবনে ভেসে যাচ্ছে আমাদের জীবন, সেই পাগলগুলোর কারণেই। তাছাড়া আমরা সবাই জানি ১৯৬৯ সালে মানুষ সশরীরে চন্দ্রগ্রহে গিয়েছে মাহাকাশের শূন্যযানে করে। অদূর ভবিষ্যতে হয়ত মঙ্গলগ্রহেও যাওয়া হয়ে যাবে। এই যে শূন্যভ্রমণের ব্যাপারটি, এখানেই অনিবার্যভাবে দাঁড়িয়ে যায় বহু-দেহী আকর্ষণ তত্বের প্রয়োজনীয়তা। আমরা দূরদর্শনেই দেখেছি, উর্ধলোকের একটা উচ্চতায় পৌঁছানোর পর যাত্রীরা কার্যত ‘ওজনহীন’ অবস্থায় দাঁড়িয়ে যায়—যানের অভ্যন্তরে তারা ভাসতে শুরু করে নদীর মাছের মত। এর পর যতই ওপরে উঠতে থাকে ততই নতুন গ্রহ-উপগ্রহদের পরিপার্শ্বে চলে আসে একসময়। তখন আবার নতুন করে ভিন্নরকম মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বলয়ের মধ্যে নিজেদের অবস্থিতি উপলব্ধ হতে শুরু করে। হয়ত একটি নয় একাধিক বিপুলদেহী বস্তুর টানে তারা একপ্রকার দিশেহারা হয়ে যায়—সে টানে এদিকে, ও টানে ওদিকে। অর্থাৎ একটি অতিবাস্তব বহুদেহী পরিস্থিতি। এর মাঝে নিউটনের বিপরীত বর্গনীতি অকেজো হয়ে যায় তা নয়, কিন্তু শূন্যযানের যাত্রাপথের মানচিত্রটি চট করে অঙ্ক কষে বের করে ফেলা একরকম দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। অথচ মহাশূন্যে যানপ্রেরণের আগেই তার যাত্রাপথ সঠিকভাবে নিরুপণ করার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার মনে যে করেই হোক একটা নিখুঁত বা প্রায় নিখুঁত মানচিত্র দাঁড় করাতেই হবে, সেটাই হল যাননিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের জ্ঞানীগুণি বিজ্ঞানীদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
কিন্তু তার উপায় কি। নিউটনের মত সোজা অঙ্ক কষে যদি সেটা জানা সম্ভব না হয় তাহলে বিকল্প আর কি পন্থা আছে?
সেসব কারণে ত্রিদেহী এবং বহুদেহী তত্বের প্রতি গাণিতিকদের মনোযোগ একটা জরুরি পর্যায়ে পৌঁছে যায় উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে। তাঁরা উঠে পড়ে লেগে যান প্রথম তিন বস্তু, পরে বহু বস্তু সম্বলিত সমাবেশে তাদের গতিপথের প্রকৃতি কি হবে তা গণিতের মাধ্যমেই উদ্ধার করা। রীতিমত একটা থমথমে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়ে যায় বলবিদ্যাবিষয়ক গণিতের গবেষণাতে। ঠিক এই সময় ঘটে এক অভিনব ঘটনা।

তিন

১৮৮৭ খৃষ্টাব্দে তৎকালীন যুক্ত রাষ্ট্র সুইডেন আর নরওয়ের রাজা তৃতীয় অস্কার তাঁর ষষ্ঠদশতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে একটা এককালীন পুরস্কার ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেন। ব্যক্তিগতভাবে রাজা অস্কার ছিলেন জ্ঞানবিজ্ঞনের প্রতি দারুণ আকৃষ্ট। বিশেষ করে গণিতের প্রতি। বর্তমান যুগের রাজাবাদশাদের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্যজনক মনে হলেও এটা সত্য যে সেযুগে জ্ঞানের প্রতি প্রচণ্ড একটা আকর্ষণ ছিল অনেক নৃপতিরই। সে সুবাদেই তাঁর ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সেসময়কার সুইডেন, তথা সারা ইউরোপের সেরা গাণিতিকদের মধ্যে একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব মিটাগ-লেফ্লার (১৮৪৬-১৯২৭)। নামটা একটু অদ্ভুত মনে হচ্ছে হয়ত। মিটাগ তাঁর প্রথম নাম আর লেফ্লার পারিবারিক, নাকি উল্টোটা? আসলে কোনটাই না। লোকটা সত্যি সত্যি একটু ভিন্ন প্রকৃতির পুরুষ ছিলেন। ঠিক নারীবাদী না হলেও নারীর সমান অধিকার এবং সামাজিক সম্মানের প্রতি ছিলেন দারুণ সহানুভূতিশীল । এবং সেসময়কার চিন্তাধারার পরিপ্রেক্ষিতে ভীষণ মুক্তমনা। তাঁর বাবার নাম ছিল মিটাগ, আর মায়ের অবিবাহিত নামটি ছিল লেফ্লার। জন্মকালে মিটাগ হলেও পরবর্তীতে তার সঙ্গে মায়ের নামটি নিজেই যুক্ত করে নিলেন—হয়ে গেলেন মিটাগ-লেফ্লার। গণিতজগতের অত্যন্ত সম্মানিত একটি নাম। সুইডেনের অধিবাসীদের কাছে তিনি একজন জাতীয় হিরো।
মিটাগ-লেফ্লার সেকালের সর্বাধুনিক অমীমাংসিত গাণিতিক সমস্যাগুলো সম্বন্ধে পুরোপুরি ওয়াকেফহাল ছিলেন। জানতেন যে দাঁত-বসানো-শক্ত এমন সব সমস্যার মধ্যে একেবারে চূড়ায় বসে আছে ভরযুক্ত বস্তুর ত্রিদেহী, তথা বহুদেহী সমস্যা। তাই এটিই হোক রাজার জন্মদিনের নির্বাচিত সমস্যা, মনে মনে ঠিক করে ফেললেন তিনি। রাজা অস্কারের কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসার সাথে সাথে তিনি সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন এবং সে অনুযায়ী গণিত জগতে বিস্তারিতভাবে সিদ্ধান্তটি প্রচার হয়ে গেল।
প্রতিভার স্বভাবটাই এমন যে সমস্যা যত কঠিন হবে তার প্রতি আকর্ষণটাও তেমন প্রবল হবে। তারা চ্যালেঞ্জ পছন্দ করে। সেকালের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টিকর গাণিতিক সমস্যাগুলোর মধ্যে ত্রি-দেহী সমস্যা ছিল একেবারে প্রথম সারিতে। অতএব ঘোষণার সাথে সাথে দেশ-বিদেশের মেধাবী গবেষকদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। একেতো সমস্যাটি এমনিতেই আকর্ষণীয়, তার ওপর পুরস্কার। সে তো আরো উত্তেজনার ব্যাপার। প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল তুমুল বিক্রমে।
এই প্রতিযোগীদের মধ্যে একজন ছিলেন ফ্রান্সের তৎকালীন তরুণ গাণিতিকদের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব আনরি পয়েনক্লেয়ার (১৮৫৪-১৯১২)। তিনি ছিলেন মূলত বলবিদ্যাবিশারদ—-নিউটন থেকে শুরু করে, অয়লার, লাগ্রাঞ্জ, হ্যামিলটন, জ্যাকবি, এঁদের মত শীর্ষস্থানীয় গবেষকদের যাবতীয় মৌলিক কাজের সঙ্গে সুপরিচিত। তিনি ত্রিদেহী সমস্যা নিয়ে আগেও অনেক ভাবনাচিন্তা করেছিলেন। পুরস্কার ঘোষণার পর সেটা মনোযোগের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল। কিছুদিন একনিষ্ঠ গবেষণা করে তাঁর মনে হল উত্তর পেয়ে গেছেন—এতদিনের দাঁত-বসানো-শক্ত সমস্যাটির পূর্ণ সমাধান তাঁর কাছে ধরা দিয়েছে! কাজটি একটু গোছগাছ করে সাজিয়ে মিটাগ-লেফ্লারের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। মিটাগ-লেফ্লার বেশ মনোযোগ দিয়েই পারলেন পেপারটি। কোনরকম ফাঁকফোকড় কোথাও আছে বলে মনে হল না। তাছাড়া গাণিতিক হিসেবে পয়েনক্লেয়ারের সুনাম সম্বন্ধে আগে থেকেই সচেতন ছিলেন তিনি—এ লোক কোনও কাঁচা কাজ করবে না সে-বিশ্বাস তাঁর যথেষ্টই ছিল। দুরূহ সমস্যার সাবলীল সমাধান পেয়ে মিটাগ-লেফ্লার মহাখুশি। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন—পুরস্কারের সুযোগ্য প্রাপক আনরি পয়েনক্লেয়ার। এই মর্মে ঘোষণা প্রচার হয়ে গেল গণিতজগতে। সাড়া পড়ে গেল চতুর্দিকে। বিজ্ঞানজগতের উত্তেজনা রাজনৈতিক উত্তেজনার চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। নিশ্চয়ই কালজয়ী প্রতিভা হবে লোকটা—পয়েনক্লেয়ারের সুনাম আরো শতগুণে ছড়িয়ে পড়ল গণিতের উর্ধমহলে। রাজপ্রাসাদে যথাযথ আড়ম্বরের সাথে পুরস্কারপ্রদান পর্ব সমাপ্ত হবার পর পেপারটি মিটাগ-লেফ্লার সাহেব ছাপার জন্যে পাঠিয়ে দেন তাঁর নিজেরই প্রতিষ্ঠিত সেসময়কার এক শীর্ষস্থানীয় গাণিতিক জর্ণালে। সেটার ভুলভ্রান্তি কিছু পেলে সেগুলো শুধরে প্রুফ দেখার ভার দেওয়া হল এডভ্যান ফ্র্যাগমেনের কাছে (এই ভদ্রলোক বয়সে তখন খুব তরুণ হলেও ভবিষ্যতের বিরাট সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়ে মিটাগ-লেফ্লারের আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলেন)। ফ্র্যাগমেন প্রুফ দেখাকালে পয়েনক্লেয়ারের থেওরেমের প্রমানটিতে যৌক্তিক স্খলন দেখতে পেলেন কিছুটা, এবং সে-মর্মে মঁসিয়ে পয়েনক্লেয়ারের কাছে একটি পত্র পাঠিয়ে দিলেন, যদিও পেপার প্রকাশের ব্যাপারে কোনও সমস্যা আছে এমন কোন দুর্বিনীত ইঙ্গিত ছিল না তাঁর প্রুফ দেখাতে। যথাসময়ে পেপার ছাপা হয়ে গেল, এবং অত্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে না দেখলে তাতে কারুরই কোন ফাঁকফোকড় চোখে পড়ার কথা নয়, যেমন পড়েনি স্বয়ং মিটাগ-লেফ্লারের চোখে। কিন্তু ফ্র্যাগমেনের চিঠি পড়ার পর পয়েনক্লেয়ার যখন দ্বিতীয়বার তাঁর কাজটি নেড়ে চেড়ে দেখলেন তখন তাঁর মাথা ঘুরে গেল—-সর্বনাশ, এতো ডাহা ভুল। গোটা ব্যাপারটাই, প্রমাণের যুক্তিই কেবল নয়, প্রমাণিতব্য সিদ্ধান্তটিও। মানে নিউটনের কলনশাস্ত্র আর প্রথাগত কলাকৌশলগুলো ব্যবহার করে যে ফলাফল তিনি পেয়েছিলেন তা আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও আসলে তা নয়। সে কি লজ্জা পয়েনক্লেয়ার সাহেবের—পত্রিকা বের হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। সবাই জেনে গেছে ত্রিদেহী সমস্যার চূড়ান্ত মীমাংসা হয়ে গেছে। তিনি তখন তাড়াহুড়ো করে সম্পাদক মিটাগ-লেফ্লারের কাছে খবর পাঠালেন যে প্রকাশিত পেপারটি তিনি প্রত্যাহার করছেন, এবং সংশোধিত কাগজ শেষ হয়ে গেলে তার পুঃনপ্রকাশের সম্পূর্ণ ব্যয়ভার তিনি নিজের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বহন করবেন। মিটাগ-লেফ্লার আগ্রহসহকারেই রাজি হয়ে গেলেন তাঁর প্রস্তাবে।
পরবর্তি কাহিনী গণিতজগতের এক যুগান্তকারি ঘটনা। পয়েনক্লেয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলেন যে গতানুতিক গাণিতিক পদ্ধতিতে এ-সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সম্পূর্ণ নতুন চিন্তার সূচনা না হলে ত্রিদেহী বা বহুদেহী বিশ্বের দ্বারোদ্ঘাটন হবে না। কলনশাস্ত্র আর বীজগণিতের পথ এড়িয়ে তিনি জ্যামিতির শরণাপন্ন হলেন। এবং তাতেই হল অভীষ্টসিদ্ধি—-ধীরে ধীরে প্রকৃতি তাঁর অবগুণ্ঠন উন্মুক্ত করতে শুরু করলেন। কিছুদিন দিনরাত খাটাখুটি করে আনরি পয়েনক্লেয়ার এক অপূর্ব উপহার নিয়ে এলেন গণিতের বিচিত্র জগতে। তাঁর সমাধানের মধ্য দিয়ে নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিদ্বারা ধাবিত গতির যে সূক্ষ্ম বিষয়গুলো কিছুতেই ধরা দিতে চাচ্ছিল না তাঁর দ্বিদেহী তত্বের বলয়তে, তার পূর্ণ সমাধান অবিশ্বাস্য এক রূপসীর রূপ ধারণ করে আবির্ভূত হল। এবং সেটা হল এমনই এক নতুন সজ্জায় যে তাতে করে জ্যামিতিক গণিতের একটা পুরোপুরি নতুন শাখাই সৃষ্টি হয়ে গেল বলতে গেলে। শাখাটির নাম ‘টপলজি’ যার সঠিক বাংলা আজ পর্যন্ত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। (পরাজ্যামিতি বলা ঠিক হবে কি?)এই নতুন জ্যামিতি অনুযায়ী একটি বর্গক্ষেত্র আর একটি বৃত্তের মাঝে (দুয়ের ভেতরটা যেন একইরকমভাবে ফাঁকা থাকে) প্রকৃতিগত কোনও প্রভেদ নেই—দুটোই টেনেটুনে ছোট আকারে সংকুচিত করে করে বিন্দুতে পরিণত করা যায়, সুতরাং পরাজ্যামিতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তারা অভিন্ন। স্পষ্টতই গতানুগতিক ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির সঙ্গে আকাশপাতাল তফাৎ।
কিন্তু তার চেয়েও বড় যে-জিনিসটি পরিষ্কার ভাষাতে ফুটে উঠেছে সেটা হল বিশ্বপ্রকৃতি সম্বন্ধে পয়েনক্লেয়ারের অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি পূর্ণ অনুধাবন, যেন সকল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তাঁর সন্ধানী দৃষ্টির তীক্ষ্ণবাণে বিদ্ধ হয়ে অবশেষে নতশিরে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল এই যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া যতই জটিল হোক (এবং আকর্ষণ-বিকর্ষণের অমোধ বিধান দ্বারা নিবদ্ধ বস্তুর সংখ্যা নিউটনের দ্বিদেহী সংস্থার গণ্ডী পার হয়ে তিন বা তারও উর্ধ সংখ্যাতে পৌঁছে গেলে), যতই জটিল থেকে জটিলতর পথ পরিক্রম করুক না কেন, ‘শেষ পর্যন্ত’ প্রতিটি চলমান বস্তুই তার যাত্রাবিন্দুতে প্রত্যাবর্তন করে, সাময়িকভাবে হলেও। শর্ত হল যে তাদের পারস্পরিক ঘাত-প্রতিঘাতের নিরন্তর প্রক্রিয়াটি অবিরাম যেন চলতে থাকে। সেখানে কোনরকম বিরতি ঘটলে চলার শকটটিও স্থিতাবস্থাতে সমাপ্ত হয়ে যাবে। কিছুটা ঘড়ির কাঁটার মত। পাঠক নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন যে আমি একটা গুরুত্ব আরোপ করেছি ‘শেষ পর্যন্ত’ শব্দযুগলের ওপর—-তার কারণ এই যে ফিরে আসাটা, এটি কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে মোটেও টের পাওয়া যাবে না। আসলে অধিকাংশ গতিই এরকম প্রত্যাবর্তী আচরণ প্রদর্শন করে না—-অনেক অনেক কাল ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারলে তবেই সে ধরা দেবে। অবশ্য সব বস্তু পূর্বাবস্থানে ফিরে এসে অন্তহীন পরিক্রমায় ঘুরতে থাকবে তা’ও নয়—-কিন্তু যারা আসে তাদের প্রতিই আমাদের বেশি জোর দিতে হয়। যেমন সূর্যের চারপাশে নিত্য ঘূর্ণমান পৃথিবীএকবার ঘুরে এসে আবারও ঠিক একই পথে চলতে শুরু করে। পয়েনক্লেয়ার সেকথাটার ওপরই জোর দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর নিজেরই ভাষায়ঃ “The reason the periodic solutions are so precious to us is that they are the only opening by which we can enter this inaccessible fortress”. (এই পৌনঃপুনিক সমাধানগুলো এত মূল্যবান আমাদের কাছে কারণ এই একটিমাত্র উপায় আমাদের যাতে করে আমরা প্রকৃতির দুর্ভেদ্যে রহস্যপুরিতে প্রবেশ করতে পারি) জটিল গণিতের সাধকরাও যে কখনও কখনও কাব্যিক ভাষাতে তাঁদের ভাব প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখেন এই পংক্তিটি যেন তারই খানিক ইঙ্গিত দেয়।
আমরা সাধারণ মানুষ হয়ত বিজ্ঞের মত মুচকি হেসে বলবঃ এগুলো সব পাগল গাণিতিকদের উর্বর কল্পনার উদ্ভট আবিষ্কার ছাড়া কিছু নয়। এর সঙ্গে বাস্তবতার সম্পর্ক কি? হ্যাঁ আছে। আমরা অজ্ঞ বলেই বুঝেও বুঝি না, দেখেও দেখিনা। পয়েনক্লেয়ারের কথাগুলো যে বর্ণে বর্ণে সত্য তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ তো আমাদের চোখের সামনে—রোজই ডগডগ করে তাকিয়ে থাকে আমাদের দিকে। মানে আমাদেরই চিরপরিচিত সূর্য-চন্দ্র-পৃথিবী নিয়ে যে ত্রিদেহী সমাবেশটি উর্ধগগনে, আমি তারই কথা বলছি। এরা তো তিনটিতে মিলে সেই একই দৃশ্যের অবতারণা করে চলেছে অনাদিকাল ধরে—একে অন্যকে টানছে নিজ নিজ ভরমাফিক ক্ষমতা দিয়ে, অতএব তিনটিরই তো কিছু-না-কিছু নড়াচড়া হবার কথা ঐ কারণে। হয়ও। তবে সূর্য তারকাটি আকারে এত বিশাল অন্যদুটির তুলনায় যে তার গায়ে বলতে গেলে সামান্য একটু আঁচড়ও লাগে না। লাগে অপরদুটির গায়ে। লাগে বলে পৃথিবী বছরে একবার করে সূর্যবাবার চারদিকে ঘোরে, আর চন্দ্র ঘোরে পৃথিবীর চারদিকে মাসে একবার। ওদের মধ্যে যে ইতোমধ্যে নানারকম টানাটুনি হয়ে যাচ্ছে তা আমরা খালিচোখে টেরও পাচ্ছি না। তবে নভোদর্শীরা পায় তাঁদের শক্তিশালী দূরবীণের সাহায্যে। তাঁরাই কেবল টের পান যে প্রায় প্রতিবছরই পৃথিবী এবং চন্দ্র, দুটিই সামান্য পরিমাণে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে তাদের গ্রহপথ থেকে, যদিও পয়েনক্লেয়ারের সেই “দীর্ঘকাল অপেক্ষা”র পর দেখা যায় তারা আবার সেই একই জায়গায় ফিরে এসেছে। এভাবেই বিশ্বচরাচর তার চিরকালীন স্থিতিস্থাপকতা অক্ষুণ্ণ রেখে চলেছে।
পয়েনক্লেয়ারের যুগান্তকারি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির আরো এক বিচিত্র বৈশিষ্ট্য একটু উঁকি মারতে শুরু করেছে, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় Chaos, সাধারণ অর্থে যাকে আমরা চরম বিশৃংখলা হিসেবে বুঝি। এর বৈজ্ঞানিক অর্থ তার চেয়ে অনেকটাই গভীর—বর্তমান যুগে ফলিত গণিতের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় পরিণত হয়েছে বলা যায়। যেখানেই বহু বস্তুর যুগপৎ সংঘাতের ব্যাপার সেখানেই কেয়সের সম্ভাবনা। ঢাকা শহরের বহু-আলোচিত, প্রায়-কিংবদন্তীতে-পরিণত-হওয়া যানজটের সঙ্গেই তুলনীয় বলা চলে। শব্দটির বিজ্ঞানসম্মত কোনও বাংলা প্রতিশব্দ বেরিয়েছে কিনা জানিনা, তবে শব্দটির বৈজ্ঞানিক অর্থের সঙ্গে সাধারণ ব্যবহারিক অর্থের এতটাই দূরত্ব যে আমার মনে হয় এর কোন তরজমাই হওয়া ঠিক হবে না।
যা’ই হোক, উপরের কথাগুলোর সারমর্ম এই যে পয়েনক্লেয়ারের গবেষণার একটি উপরি প্রাপ্তি বিজ্ঞানের এই নতুন চিন্তার ধারাটি। কিন্তু এটা হল তাঁর পরোক্ষ ফলাফল, প্রত্যক্ষ নয়। প্রত্যক্ষটি হল ভরযুক্ত বস্তুর গতি বিশ্লেষণের এক অভিনব পন্থার আবিষ্কার—-জ্যামিতিক পন্থা। নিউটন আমাদের শিখিয়েছিলেন কিভাবে তাঁর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সাথে বস্তুর ত্বরণ সমীকরণীকৃত করে কলনবিদ্যার রীতিনীতি (যা নিউটনের নিজেরই আবিষ্কৃত)দ্বারা সোজা অঙ্ক কষে বের করে ফেলা যায় আদ্যোপাত সব সমস্যার সমাধান। অবশ্য এখানে বলে রাখা দরকার যে জ্যামিতির পদ্ধতিতে আঁকা চিত্রচিত্রায়নের এই প্রক্রিয়াটি গতানুগতিক ইউক্লিডিয়ান ছবির মত ঠিক নয়। এগুলো সাধারণত অবস্থানভিত্তিক স্পেসে আঁকা নয়, অবস্থান এবং গতি দুটোকেই সমান মর্যাদা দেওয়া স্পেসে, যাকে গণিতের ভাষায় বলা হয় ‘ফেজ স্পেস’। এখানে বস্তুর অবস্থানকে দেওয়া হয় একটি অক্ষ, আরেকটি থাকে গতির দখলে। অর্থাৎ এই মানচিত্রে একটা বিন্দু দৈর্ঘ-প্রস্থ-উচ্চতা ইত্যাদি সূচিত করে না, করে একটি চলমান বস্তুটি তার চলার পথে এ-মুহূর্তে কোথায় অবস্থিত এবং এর গতিবেগ কত। এই চিত্রটিতে একটি পরীক্ষমান বস্তুর গতিবিধি অনুসরণ করে কিধরণের ছবি সৃষ্টি করে যাচ্ছে তার গোটা ইতিহাসটিই কেবল বোঝা যায় না, এই গতির প্রকৃতিটাও পরিমাপন করা যায়—-স্থিতিশীল, সুশৃংখল না একেবারেই এলোমেলো, বিভ্রাটময় (অর্থাৎ কেয়টিক)। বহুমাত্রিক এবং বহুদেহী পরিস্থিতিতে এই তথ্যটুকু অত্যন্ত প্রয়োজন।

চার

প্রাচীনকালে দর্শনশাস্ত্রের সঙ্গে গণিত আর বিজ্ঞানের বড় একটা বৈষম্য ছিল না—-একই বিষয়ের এপিঠ-ওপিঠ। প্ল্যাটো, এরিস্টটোল (বিশেষ করে এরিস্টটোল), উভয়ই বড় দার্শনিকই ছিলেন না কেবল, বড় গাণিতিক-বিজ্ঞানীও ছিলেন বটে। এরিস্টটোল যে প্রাণীবিজ্ঞানের আদিজনক সেটা আমাদের অনেকেরই জানা নেই। শুধু প্রাচীনযুগের কথাই বলি কেমন করে, মধ্যযুগের বেলাতেও অনেকটা প্রযোজ্য কথাটি। ওমর খৈয়ামের রুবায়েতে যে গভীর জীবনদর্শন প্রকাশ পায় তা অদ্যাবধি মানুষকে দোলা দেয়। ওদিকে তিনি ছিলেন একজন বড়মাপের গাণিতিক এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী। লিওনার্ডো দ্য ভিঞ্চির কথা বলতে শুরু করলে তো একবেলায় শেষ হবে না। তাঁর মত শতমুখি প্রতিভা পৃথিবীতে বোধ হয় হাজার বছরে একটি জন্মায়। সাধারণ মানুষ কেবল তাঁর মোনালিসার দিকেই চেয়ে রইল এতটা কাল, তাঁর অন্যান্য কাজের দিকে ফিরেও তাকালো না। তিনি একাধারে মানবদেহতত্বের (Human Anatomy) অবিসংবাদিত জনক, উড়োজাহাজের প্রথম মডেল তাঁরই হাতে গড়া, তিনি ভাস্কর, তিনি স্থপতি, তিনি গণিতের একনিষ্ঠ সাধক। উপরন্তু তিনি মানবচরিত্র সম্বন্ধে যেসব ভবিষ্যদ্বানী রেখে গিয়েছিলেন তা বর্তমান যুগের দিকে তাকালে অবিশ্বাস্য মনে হবে—-এতটাই মিল।
পাঠক হয়ত ভাবতে শুরু করেছেন, এসবের সঙ্গে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কি সম্পর্ক। আছে। আছে বলেই এটুকু ভূমিকার অবতারণা। নিউটনের সময়কালে এটা ধরেই নেওয়া হত যে প্রকৃতি কোনও ‘ভুল’ করতে পারেনা, এখানে মনুষ্যসুলভ বিভ্রান্তিকর বালখিল্যতার প্রশ্রয় নেই, কারণ মহান সৃষ্টিকর্তার সুপরিকল্পিত মানচিত্রে এসবের স্থান নেই। সংসারে কোন ঘটনাই ঘটা সম্ভব নয় একটা নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া। ধর্মগ্রন্থে পরিষ্কার লেখা আছেঃ ঈশ্বরের ইচ্ছা ছাড়া গাছের তুচ্ছ পাতাও নড়ে না। এই সহজবোধ্য ধ্যানধারণার সঙ্গে নিউটনীয় কার্যকারণসম্বন্ধীয় চিন্তাধারা পুরোপুরি মিলে যায়। নিউটনের তত্ব অনুযায়ী একটা বস্তু, যত ক্ষুদ্র বা বৃহৎই হোক, এক মুহূর্ত থেকে পরের মুহূর্তে, বা আরো অনেক পরের মুহূর্তে কোথায় যাবে তা নির্ভর করে বস্তুটি যাত্রাকালে কোথায় ছিল, কতটা বেগ ছিল তার তখন, এবং কিসের তাড়নাতে তার চলন, এগুলো জানা থাকলে এর ভবিষ্যত গতিবিধির নিখুঁত মানচিত্র এঁকে দেওয়া সম্ভব। সৌভাগ্যবশত আমাদের সাধারণ দৈনন্দিন জীবনের তাগিদাতে যা কিছু জানা দরকার সেগুলো এভাবেই জেনে নেওয়া হয়। লণ্ডন থেকে একটি ঢাকাগামী প্লেন বেলা তিনটেয় রওয়ানা হলে ঠিক কটার সময় ঢাকার বিমানবন্দরে গিয়ে পৌঁছুবে সেটা আগে থেকে জানা থাকে। কারণ প্লেন মোটামুটিভাবে নিউটন এবং আধুনিক বিমানবিজ্ঞানীদের গণনা অনুসারে অত্যন্ত আজ্ঞানুবর্তিতার সঙ্গে সব নিয়মকানুন পালন করে চলে।
কিন্তু প্রকৃতি সবসময় এমন সুশীল আজ্ঞাবহতার ধার ধারে না। আগের অধ্যায়ে এর একটা ছোট্ট আভাস দিয়েছি—-ত্রিদেহী সমস্যা নিয়ে পয়েনক্লেয়ার সাহেবের যে মাথা দিয়ে ধোঁয়া বেরুচ্ছিল তার উৎসটাই তো সেখানে। দুটির বদলে তিনটি মিলে একে অন্যকে টানাটানি শুরু করলে কে কোনদিকে যাবে সেটা স্বয়ং নিউটনসাহেবও হয়ত হলপ করে বলতে পারতেন না। আসলে এটা কোনও পারিবারিক ঝগড়াঝাটির মত নয়, এটাই প্রকৃতির মৌলিক চরিত্র। এই যে ছোট ছোট বিশৃংখলা থেকে একসময় লাগামছাড়া বিশৃংখলা সৃষ্টি হওয়া, যেটা একসময় পূর্ণমাত্রা কেয়সের আকার ধারণ করে তা প্রকৃতির বিকার নয়, স্বরূপ।
কার্যকারণসম্পর্কহীনতা যে কেবল বহুদেহী ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য তা নয়। অনেকসময় একটিমাত্র বস্তুর গতিতেও এরকম আপাত বিকারগ্রস্ততা পরিলক্ষিত হয়—-নির্ভর করে বস্তুটি কিরকম আধারে ধারণ করা হয়েছে, কেমন তার পরিবেশ, ইত্যাদি। বাচ্চাদের খেলার মাঠে একটা দোলনায়-চড়া শিশু প্রায় কখনোই বেসামাল গতিতে চলতে শুরু করবে না—-এটা কার্যকারণের আওতার ভেতরই পড়ে। একটি গোলাকার পাত্রের কথা ভাবুন। এবং ধরা যাক পাত্রটির ভেতরকার দেয়ালটি খুবই মজবুত, একেবারে মসৃণ মেঝের মত চকচকে। এবার কল্পনায় তার ভেতরে একটা ছোট্ট বল ছুঁড়ে দিলেন একটা কৌণিক লক্ষ বরাবর, এবং ঠিক কতটা কোণে সেটা ছুঁড়লেন সেটা সঠিক জেনে রাখুন। বস্তুটি সেই কোণের মাত্রা অনুযায়ী আরেকটা দিকে প্রতিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে। সেখান থেকে ওটা সেই গোলাকার পাত্রেরই একটা বিশেষ বিন্দুতে গিয়ে ঘা খেয়ে তৎক্ষণাৎ নিক্ষিপ্ত হবে ঠিক একই কোণেতে অন্যত্র। আরম্ভের কোণটা যদি ৩৬০ ডিগ্রির একটি ভগ্নাংশের গুণক হয় তাহলে একসময় সেই প্রথম বিন্দুটিতে প্রত্যাবর্তন করে আবার নতুন পথে চলতে শুরু করবে। ছবিটা একটি গোলাকার (কাল্পনিক যদিও) পিং পং টেবিলের ওপর বলটির অন্তহীন লাফালাফি করার মত। তবে গোড়ার কোণের পরিমানটি যদি ৩৬০ ডিগ্রির ভগ্নাংশ(rational number) না হয়, তাহলে কিন্তু বলটা তার অন্তহীন চলার পথে কখনোই আর আগের বিন্দুটিতে ফিরে আসবে না। তথাপি একটা সত্য থেকে যায়—–একটি কোণ কেবল একটা পথই(সরলরেখা, যদি তার চিত্র আঁকা হত) নির্দেশ করে। পাত্রের আধারখানি গোলাকার না হয়ে যদি অধিবৃত্তের আকারে হত তাহলেও গতিপ্রকৃতি মূলত একই থাকত, কেবল চিত্র, মানে গ্রাফ আঁকতে গেলে সেটা সরলরেখা না হয়ে বাঁকা হয়ে যেত।
এই উদাহরণদুটির মধ্যে মৌলিক মিল যেখানে সেটা হলঃ কার্যকারণ সম্পর্ক অর্থাৎ হেতুবাদ অক্ষুণ্ন থাকছে দুটিতেই। মূল সংখ্যাটি যা হবে পরবর্তি সংখ্যাগুলো সে অনুসারেই তৈরি হবে—-অর্থাৎ কারণ যেরকম ফলটাও সেরকম। নিউটনতত্বের সঙ্গে বেশ খাপ খেয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এই সরল চিত্রটি একেবারেই ওলটপালট হয়ে যায় যখন সেই আধারটির জ্যামিতিক প্রকৃতি আগাগোড়া বদলে যায়। ওটা যত জটিল হবে বলটির গতিপ্রকৃতিও ঠিক সেই পরিমাণে জটিল হতে শুরু করবে। তখন এমন হয় যে বলসংখ্যা মাত্র একটি হলেও তার গতিপথের যে ছবিটা উঠে আসে তা আর একটি সরলরেখা বা বক্ররেখা না হয়ে একটা হযবরল ধরণের জগাখিচুড়ি বা কুজ্ঝটিকাজাতীয় অস্পষ্ট জিনিস বের হয়ে আসে। যেন একটা মেঘের দলা। অর্থাৎ একটা পুরোদস্তুর কেয়স। বিষয়টি আমার এই চিত্রবিহীন সংক্ষিপ্ত বর্ণনাতে ভালো করে হয়ত ফুটে উঠল না। তাই কৌতূহলী পাঠকদের আমি উৎসাহ দিচ্ছি যেন ইভার একল্যাণ্ড-প্রণীত গ্রন্থঃ The Best of All Worlds (১), বা জেমস গ্লাইকের লেখা কেয়সবিষয়ক পূর্ণাঙ্গ বই Chaos (২) এর পাতা উল্টিয়ে দেখার চেষ্টা করেন। এটি বর্তমান যুগের বিজ্ঞানজগতে একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিষয়। এতে একাধারে উঁচুমানের গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, দর্শন, সব একসাথে মিলে একটা রহস্যময় জগত তৈরি হয়ে গেছে।

পাঁচ
এবার আমাদের পুরনো প্রশ্নে ফিরে আসা যাক—-বহুদেহী বস্তুর সমাবেশে প্রকৃতির নিয়মকানুন কোথায় দাঁড়ায়। আগেই বলেছি, এই কঠিন প্রশ্নটিতে কিভাবে বারবার ব্যাহত হয়েছেন উনবিংশ শতাব্দীর বাধাবাঘা প্রতিভা। এবং স্বয়ং পয়েনক্লেয়ার সাহেবও (যিনি ওই শতাব্দীর, অনেকের মতে, সর্বকালের, অন্যতম শ্রেষ্ঠ গাণিতিক হিসেবে পরিচিত) চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলেন এই দুরূহ সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে—-পেপার ছাপা হবার পর তাতে সম্পূর্ণ ভুল উপপাদ্যের ‘প্রমাণ’ আবিষ্কার করা যে কি লজ্জা সেটা আমি কিছুটা বুঝি। ভাগ্য ভাল যে সময় থাকতে ফ্রাগম্যানের মত একজন শ্যনদৃষ্টিসম্পন্ন তূখোড় এবং তরুন গাণিতিকের হাতে গিয়ে পড়েছিল তাঁর পেপারটি, নইলে হয়ত সেই ভুল অবস্থাতেই পয়েনক্লেয়ারের পেপার বলে পরিচিত একটি অসত্য ‘উপপাদ্য’ গণিতশাস্ত্রের এক কলঙ্কিত ইতিহাস হয়ে থাকত।
যাই হোক অবশেষে ওই পেপারটির শেষরক্ষাই হয়নি কেবল, পয়েনক্লেয়ারের অসাধারণ গাণিতিক চিন্তাচেতনার এক সুবর্ণ দলিল হিসেবে তাঁর পরিবর্তিত পেপারটি অমরত্ব লাভ করেছে। এতে তিনি যুক্তিপ্রমাণ দিয়ে অতি সহজবোধ্যভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন যে নিউটন সাহেবের তত্বাবলি অক্ষুণ্ণ থাকা সত্ত্বেও তাঁরই সৃষ্ট কলনপদ্ধতি দিয়ে উর্ধাকাশের গ্রহনক্ষত্রাদির চালচলন বুঝে উঠা সম্ভব নয়—-সেখানে সবসময় সরলবুদ্ধি কার্যকারণ সম্পর্ক কাজ করে না। বরং ইউক্লিড-বহির্ভূত একপ্রকার অদ্ভুত জ্যামিতিই যেন সেখানকার প্রচলিত ভাষা। এই অভিনব ভাষারই প্রাথমিক আভাস উঁকি দিয়েছিল পয়েনক্লেয়রারের পরিমার্জিত পেপারে, যা পরবর্তিকালে টপলজিতে পল্লবিত হয়। তারো কিঞ্চিৎ আভাস আমি দিয়েছি এ-রচনার গোড়ার দিকেই। এবিষয়টি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন বিজ্ঞান ও গণিতের এক প্রসিদ্ধ লেখক ইয়ান স্টুয়ার্ট। আমি এ-নিবন্ধে প্রধানত তাঁর বিবরণই(৩) অনুসরণ করেছি অধিকাংশ সময় আমার বক্তব্য পেশ করার জন্যে।
পয়েনক্লেয়ার শুরুতে প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন ত্রিদেহী গতিরেখার ছবি আঁকতে গিয়ে। সূর্যকে স্থির রেখেও চন্দ্র আর পৃথিবী মিলে অবিশ্বাস্য জটিলতা সৃষ্টি করে দেয়—-ওদের গতিপথগুলো অসংখ্যবার পরস্পরকে ছেদ করে, যার ফলে ওদের গতির হদিস রাখা একেবারে সাধ্যাতীত হয়ে পড়ে। সেসময় যে-কথাটি তাঁর মাথায় হয়ত পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠেনি তা হল যে এই অসংখ্য ঠোকাঠুকির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল কেয়সের পূর্বাভাস। পরে অবশ্য কেয়স শব্দটি স্পষ্ট করে খুলে না বললেও অন্যরা ওই সূত্র ধরে পুরো আইডিয়াটি সংজ্ঞাবদ্ধ করে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। আরো একটি ঘটনা ঘটে, কচিৎ কদাচিৎ যদিও, সেটি হল যে একটা আবদ্ধ গতিপথ তৈরি হয়ে যায়, অর্থাৎ সেখানে গতির পুনঃপৌনিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। মানবজাতির স্থিতিস্থাপকতার দিক থেকে ভাবতে গেলে এই পুনঃপৌনিকতাই আমাদের অস্তিত্বের শেষ ভরসা। সেকারণেই সূর্য-চন্দ্র-বিশ্ব এই ত্রিশক্তির মাঝেও আমাদের জীবনে বছর ঘুরে বছর আসে, লিপ-ইয়ার হয় প্রায় ঘড়ির কাঁটা ধরে, এবং বিজ্ঞানীরা দূর ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিতে পারেন। এই পুনঃপৌনিকতার সন্ধান, এই অধিবৃত্তিক গ্রহপথের সন্ধানই ছিল পয়েনক্লেয়ার সাহেবের ইউক্লিডের বাইরে নতুন জ্যামিতি সৃষ্টি করতে যাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য।
আমরা যদ্দিন পৃথিবীপৃষ্ঠে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করেই সন্তুষ্ট ততক্ষণ অন্য কোন বড় সমস্যার সম্মুখিন হওয়ার সম্ভাবনা তেমন নেই। কিন্তু মানুষ কখনোই এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না—-অজানাকে জানবার স্পৃহা আমাদের অন্তহীন। তাই মানুষ উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেছে, বেলুনে করে আকাশভ্রমণ করতে চেয়েছে, শেষে এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহতে যাবার চেষ্টা করেছে। সেই চেষ্টারই রূপায়ন ঘটেছে চন্দ্রগ্রহের অভিযানে। প্রথমে চালকবিহীন, পরে চালকসহ—-এক নয় একাধিক। প্রশ্ন হল ওই প্রথমবার যখন শূন্যযান পাঠানো হয় চাঁদের দিকে, তখন নাসার প্রকৌশলীরা কিভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যানটিকে কোন রাস্তা ধরে চালিত করবেন? এবং তাঁদের সেই সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে কিসব যুক্তি তৈরি করা হয়েছিল? সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হতে পারে, কেন, সোজা চাঁদ বরাবর ছুঁড়ে মারলেই তো হয়। না, ব্যাপারটি তত সহজ নয়। প্রথমত ‘ চাঁদ বরাবর সোজা দিক’ বলে কোন দিক নেই। ভুলে গেলে চলবে না যে চাঁদ আমাদের চারপাশে ঘুরছে, সাথে সাথে আমরাও ঘুরছি পৃথিবীর চারপাশে। অতএব আমাদের সোজা দিকটিকে ঠিকমত বাঁকাতে না পারলে কখনও ওটা গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছুবে না। দ্বিতীয়ত ভূপৃষ্ঠ থেকে চন্দ্রগহের দূরত্ব ৩৫৮,০০০ কিঃমিঃ(২২১,৮০০ মাইল) থেকে ৪০৮,৩০০কিঃমিঃ (২৫২,৫০০মাইল) পর্যন্ত উঠানামা করে, আমাদের থেকে সূর্যের দূরত্ব যেমন গ্রীষ্মে কমে যায় আর শীতে বাড়ে। দুটোরই মূল কারণ হল অধিবৃত্তাকার কক্ষপথ উভয়েরই। সুতরাং এতটা পথ মহাশূন্যের অচেনা পথে ভ্রমণ করবার এমন একটা রাস্তা খুঁজতে হয় যাতে, এক, সবচেয়ে কম খরচে উদ্দেশ্য সাধন করা যেতে পারে; দুই, সময় বাঁচানো, বিশেষ করে যদি এক বা একাধিক চালক থাকে সাথে (তাদের স্বাস্থ্যের কথা ভাবতে হবে, তাদের খাবারদাবার, তাদের নিরাপত্তা ইত্যাদি নানা বিষয় ওদের বিবেচনায় রাখতে হয়); তিন, যাতে ফেরার পথে অনায়াসে ফেরা যায় চাঁদের আকর্ষণের বলয় থেকে বের হয়ে, এবং যাতে ওজনহীন অবস্থায় কিছুক্ষণ ঝুলে থাকবার পর বিনা ঝাঁকুনিতে পৃথিবীর আকর্ষণ ক্ষেত্রে প্রবেশ করা যায় নিশ্চিন্তে। এগুলো ছোটখাটো প্রশ্ন নয়—-কমাণ্ড সেন্টারের বাঘা বাঘা বিজ্ঞানী-প্রকৌশলী ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা এগুলো আদ্যোপান্ত বিবেচনা না করে মানুষ চালিত যান আকাশে উড্ডীন হতে দেবেন না।
চাঁদে যেতে সোজা তাক করে যাত্রা শুরু করার বড় সমস্যা হল প্রচণ্ডরকম জ্বালানি তেল খরচ হয় তাতে—–গোটা মিশনটা তখন ব্যয়সাধ্যতার বাইরে চলে যায়। ভুলে গেলে চলবে না যে পৃথিবী থেকে চাঁদের পথে রওয়ানা হতে প্রথম তার আকর্ষণ বলয় অতিক্রম করতে হয়, এবং সেখানেই জ্বালানি শক্তি ব্যয় হয় সবচেয়ে বেশি। এই সমস্যাটির একটা ছোটখাটো সমাধান বের হয়েছে তথাকথিত হোম্যান অধিবৃত্তবদল তত্বের মধ্য দিয়ে। আইডিয়াটি এরকম। পৃথিবী থেকে একটানে সোজা উপরে চলার পরিবর্তে প্রথমে উর্ধমুখি হতে হতে পাশে, বৃত্তাকারে পৃথিবীর চারপাশে একবার ঘুরে তারপর আস্তে আস্তে চাঁদের দিকে অগ্রসর হওয়া——সরলরেখায় নয়, একটি চিকন অধিবৃত্তের রেখা ধরে, এতে কম তেল খরচ হয়। তারপর একটা জায়গায় এসে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ দুর্বল হতে হতে যানটিকে ওজনহীন অবস্থাতে এনে দেয়। অর্থাৎ তখন পৃথিবী আর চন্দ্র দুয়ের আকর্ষণ থেকেই অপেক্ষাকৃত মুক্ত আমাদের শূন্যযানটি—-সেটা বেশ আরামের সময়। তেল প্রায় একেবারেই খরচ হয়না। তারপর ওকে আস্তে আস্তে চাঁদের দিকে চলতে শুরু করতে হবে। তবে একবারে নয়। প্রথমে চাঁদের চারদিকে একবার চক্কর দেওয়া—–ঠিক পৃথিবীর চারপাশে যেমন ঘোরা হয়েছিল একবার। সেটাও ওই একই উদ্দেশ্যে—–জ্বালানির খরচ কমানো। শেষে ধীরে ধীরে কক্ষ বদল করে চাঁদের দিকে অগ্রসর হওয়া। ১৯৬০ আর ১৯৭০ এর মাঝে যে কবার চাঁদে ভ্রমণ করা হয়েছিল, তার সবগুলিই এই নীতি পালন করেছে।
কিন্তু আধুনিক যুগের শূন্যযাত্রীদের জন্য চন্দ্রগ্রহ এখন প্রায় ডালভাত। বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল দুটিই হুহু করে এগিয়ে গেছে। এতটাই অগ্রসর এযুগের প্রযুক্তি যে অতি সম্প্রতি নাসার বিজ্ঞানীরা মঙ্গলগ্রহে একটি অনুসন্ধানী (যন্ত্রচালিত স্বভাবতই) যান পাঠাতে সক্ষম হয়েছেন। সেখানে ব্যাপারটি তত সোজা নয়। প্রথমত মঙ্গলগ্রহের দূরত্ব গড়ে প্রায় ২২৫ মিলিয়ন কিঃমিঃ, এবং গ্রহটির আকার এত বিশাল যে সেখানে একটি ৩৬৫ দিনবিশিষ্ট বছরের যে পৃথিবীতে আমরা বাস করি তার তুলনায় ওটা ৬৮৭ দিন। সেখান থেকে আলোরশ্মি পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছাতে লাগে তিন মিনিট, যেতে লাগে আরো তিন মিনিট। সেখানে যেতে কেবল নিউটন সাহাবের দ্বিদেহী তত্বের ওপর ভরসা করে যাওয়া যাবে না, কারণ ওই দীর্ঘ পথে ভ্রমণ করতে গিয়ে পথিমধ্যে অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম করতে হবে। সেখানে সাধারণ ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতিও বড় একটা কাজে আসে না। তার চেয়ে পয়নক্লেয়ার সাহেবের নতুন তত্ব ব্যবহার করা অনেক লাভজনক। যাই হোক আমাদের বর্তমান প্রসঙ্গের জন্যে এসব জটিল প্রশ্ন যতই আকর্ষণীয় হোক খুব একটা প্রাসঙ্গিক হবে বলে মনে হয়না। আমার মনে হয় আগ্রহী পাঠকের তৃষ্ণা মেটাবার জন্যে এবিষয়ের সত্যিকার বিশেষজ্ঞ যারা তাদের প্রণীত গ্রন্থাদি খোঁজা উচিত—–আজকাল বাজারে অনেক বইই বের হয়েছে এসব বিষয়ের ওপর। সহজবোধ্য পাঠের জন্য গ্রন্থসূত্রতে যে দুটি বই(৪ ও ৫) আমি উল্লেখ করেছি তার পৃষ্ঠাগুলো উল্টেপাল্টে দেখলেও হয়ত কিছুট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
এলেখাটি আমি শেষ করে দেব ভবিষ্যতে যারা শূন্যভ্রমণ করার ইচ্ছা পোষণ করেন তাদের জন্যে কিছু টুকিটাকি খবর তুলে ধরা। মহাশূন্যে ভ্রমণ করতে গেলে এটা ধরেই নিতে হবে যে একটা জায়গায় গিয়ে যাত্রীদের কোনও ওজন বলে কিছু থাকবে না—-ভর থাকবে কিন্তু ওজন কাটাকুটি হয়ে শূন্যতে চলে যাবে। কিন্তু সে অবস্থাটি কতক্ষণ বজায় থাকবে সেটা নির্ভর করবে যানের গতি, অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহের নৈকট্য কতদূর, এবং তাদের আকর্ষণ শক্তির জোর কতটা। শুধু তাই নয়, গ্রহ-উপগ্রহ কি একটি না একাধিক, এবং একাধিক হলে তাদের সংখ্যা কত। সাধারণত উর্ধাকাশে বহুসংখ্যক গ্রহ-উপগ্রহ এমনকি উল্কা ধূমকেতু এগুলোর সাক্ষাৎ পাওয়াও বিচিত্র কিছু নয়। কথা হল সে অবস্থায় শূন্যযানের চালককে কিধরণের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে হয়। মনে রাখতে হবেঃ তেল বাঁচানো একটা জরুরি বিষয়—-কোনক্রমে যদি তেল ফুরিয়ে যায় এক লক্ষ মাইল উপরে তাহলে আপনাকে সরাসরি বিধাতার দরবার পৌঁছে যেতে হবে—–স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের মুখ দেখার ভাগ্য হবে না আর। কিন্তু তেল বাঁচাতে কি করতে হয়? সেপ্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবেন প্রকৌশলীরা, যাঁরা পাহাড়ী রাস্তায় রেলগাড়ি চালানোর জন্যে পাহাড়ের গায়ে রেল না বসিয়ে পাহাড়ের ভেতরে গর্ত করে সুড়ং তৈরি করেন—-উদ্দেশ্য একই, এতে খরচ বাঁচে অনেকগুণ। আধুনিক নগরজীবনে অনেকেই পাতালট্রেন ব্যবহার করেন। পাতালট্রেন তৈরি করা হল কেন? কেবল যানবাহনের ভিড় লাঘব করার উদ্দেশ্যেই নয়, খরচ বাঁচাবার জন্যেও অনেকখানি। অনুরূপভাবে শূন্যভ্রমনের বেলাতেও আজকাল ‘পাতাল ট্রেন’ বলে একটা অদ্ভুত আইডিয়া আলোচিত হচ্ছে। পাঠক নিশ্চয়ই সন্দিহান হয়ে উঠছেন ইতোমধ্যেঃ শূন্যে আবার পাতাল এল কি করে? ঠিকই ধরেছেন, জাগতিক অর্থে পাতাল নেইও সেখানে, কিন্তু এখানে ‘পাতাল’ শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে ভাবার্থে। এর সত্যিকার কোনও অস্তিত্ব নেই, গাণিতিকের কল্পনাতে মাত্র। শুধু তাই নয়, এর মাত্রাসংখ্যা তিনের চেয়ে বেশি, সাধারণত পাঁচ থেকে সাত পর্যন্ত যেতে পারে (মাত্রা বলতে আমি ইংরেজির ডাইমেনসনকে বুঝাচ্ছি)। আসল ব্যাপারটা হল শূন্যের ‘পাতালপথ’ মানে যেখানে জ্বালানি খুব কমই ব্যবহার করতে হয় অন্যান্য পথের তুলনায়, এবং যেখান থেকে এক গ্রহের কক্ষপথ বদল করে অন্য গ্রহের কক্ষপথে স্থানান্তরিত হবার সুন্দর ব্যবস্থা আছে। অনেকটা টরন্টো-মন্ট্রিয়ল-নিউইয়র্কের পাতালট্রেনের এক লাইনে করে একটা স্টেশনে যাবার পর সেখানে নেমে অন্য লাইনের ট্রেনে উঠে গন্তব্যে পৌঁছানোর মত। এতে গোটা যাত্রাটি খুব অল্প সময় ও ব্যয়ে শেষ করা সম্ভব হয়। আমাদের শূন্যভ্রমণের জন্যে ‘পাতালট্রেন’এর ধারণাটিও অনেকটা সেরকম। কম ঝামেলা, কম খরচ।
অবশ্য এ সবই এমুহূর্তে কল্পকাহিনী ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু আজকে যেটা কল্পনা, দশ-পনেরো বছর পর যে সেটা বাস্তবে পরিণত হবে না কে বলবে সেকথা। অতীতের অনেক উদ্ভট কল্পকাহিনীই তো বাস্তবে রূপ পেয়ে গেল এযুগের প্রযুক্তির কল্যানে। ভবিষ্যতে আরো কত কি ঘটবে কে জানে!
তথ্যসূত্রঃ
(১) The Best of All Possible Worlds, by Ivar Ekeland, University of Chicago Press, 2006; Paperback edition, 2007.
(২) Chaos, by James Gleick, Penguin Books paperback edition, 1988.
(৩) In Pursuit of the Unknown, by Ian Stewart, Basic Books, 2012.
(৪) The Hitchhiker’s Guide to the Galaxy, by Douglas Adams, Published by Del Ray, 2005.
(৫) Across the Universe, by Beth Revis, Published by Razorbill, 2011.
(৬) Internet.

অটোয়া,
২২ শে আগস্ট, ‘১২
মুক্তিসন ৪১

About Shafiul

ড. শফিউল ইসলাম: কানাডীয় TexTek Solutions এর ডিরেক্টর ও Institute of Textile Science এর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট। স্পাইডার সিল্ক প্রযুক্তির উদ্ভাবক। যুক্তরাজ্য থেকে টেক্সটাইল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করেন। তাঁর অনেক গবেষণাপত্র, বই ও প্যাটেন্ট প্রকাশ পেয়েছে। ব্যক্তিগত সাইট: https://www.linkedin.com/in/shafiul2009/

Check Also

ম্যাজিক স্কয়ার ও রামানুজন

  Magic Square হল একটি n×n ম্যাট্রিক্স যার উপাদানগুলো অঋণাত্মক পূর্ণসংখ্যা, যাদের সারি, স্তম্ভ এবং …

ফেসবুক কমেন্ট


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।