উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ

“ভালো ল্যাব না পেলে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ও যথেষ্ট নয়”—ড. জুবায়ের শামীমের গবেষণা-বাছাইয়ের বাস্তব পরামর্শ

Share
Share

বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা পিএইচডি করার স্বপ্ন দেখলে বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর চোখ প্রথমেই চলে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের দিকে। হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ড, টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়—এই নামগুলো যেন এক ধরনের সাফল্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু বিজ্ঞানী ডট অর্গ-এর সাক্ষাৎকারে ড. জুবায়ের শামীম একটি বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন: একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেই যে গবেষণার অভিজ্ঞতা সর্বোত্তম হবে, এমনটি নয়। তাঁর মতে, একজন তরুণ গবেষকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সে কোন ল্যাব-এ কাজ করছে এবং কার সুপারভাইজারের অধীনে গবেষণা করছে।

গবেষণার পরিবেশ মূলত তৈরি হয় ল্যাবকে কেন্দ্র করে। ল্যাব মানে শুধু যন্ত্রপাতি বা ঘর নয়; এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ—যেখানে নিয়মিত আলোচনা হয়, সিনিয়র-জুনিয়রের মধ্যে জ্ঞান বিনিময় হয়, ব্যর্থতা থেকে শেখার সুযোগ থাকে। কোনো কোনো ল্যাবে পর্যাপ্ত ফান্ডিং থাকে, নিয়মিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকে, আবার কোনো কোনো ল্যাবে গবেষণার পরিসর সীমিত থাকে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেও এক ল্যাব থেকে আরেক ল্যাবের অভিজ্ঞতা আকাশ–পাতাল পার্থক্য হতে পারে। ফলে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দেখে সিদ্ধান্ত নিলে গবেষণার বাস্তব অভিজ্ঞতায় হতাশ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ড. জুবায়ের শামীম আরও জোর দেন সুপারভাইজারের ভূমিকার ওপর। পিএইচডি বা গবেষণার সময় সুপারভাইজার কেবল একজন শিক্ষক নন; তিনি পথপ্রদর্শক, পরামর্শক এবং অনেক ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের দরজা খুলে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একজন ভালো সুপারভাইজার শিক্ষার্থীকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে উৎসাহ দেন, ভুল করলে শিখতে সাহায্য করেন, আবার প্রয়োজন হলে সঠিক দিকনির্দেশনা দেন। বিপরীতে, যদি সুপারভাইজারের সঙ্গে শিক্ষার্থীর গবেষণার আগ্রহ বা কাজের ধরনে মিল না থাকে, তাহলে দীর্ঘ কয়েক বছর মানসিক চাপের মধ্যে কাটতে পারে।

বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে আবেদন করার সময় একধরনের “মাস (অনেক) অ্যাপ্লিকেশন” করে থাকেন—একই ইমেইল বা স্টেটমেন্ট কপি-পেস্ট করে বহু প্রফেসরের কাছে পাঠানো হয়। ড. জুবায়ের শামীম এই প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করেন। তাঁর মতে, যে ল্যাবে আবেদন করা হচ্ছে, সেই ল্যাবের গবেষণার বিষয় কী, সাম্প্রতিক প্রকাশনাগুলো কী নিয়ে—এসব না জেনে ইমেইল পাঠালে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ প্রফেসররা সাধারণত সেই শিক্ষার্থীকেই গুরুত্ব দেন, যারা তাদের কাজ সম্পর্কে জেনে, নির্দিষ্ট আগ্রহ নিয়ে যোগাযোগ করে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—শিক্ষার্থীর নিজের আগ্রহ ও লক্ষ্য পরিষ্কার থাকা। কেউ যদি তাপগতিবিদ্যা বা ম্যাটেরিয়াল সায়েন্সে কাজ করতে চান, কিন্তু এমন ল্যাবে আবেদন করেন যেখানে ফটোনিক্স বা বায়োমেডিক্যাল ইমেজিং নিয়ে কাজ হয়—তাহলে প্রোফাইল ভালো হলেও মিল না থাকার কারণে সুযোগ নাও মিলতে পারে। ড. জুবায়ের শামীম নিজেও এমন উদাহরণের কথা বলেছেন, যেখানে ভালো প্রোফাইল থাকা সত্ত্বেও গবেষণার ফোকাস না মেলায় আবেদন গ্রহণযোগ্য হয়নি।

তরুণদের জন্য এই পরামর্শের অর্থ হলো—আবেদন করার আগে সময় নিয়ে গবেষণা করা। কোন ল্যাবে কী ধরনের কাজ হয়, সুপারভাইজারের কাজের ধরণ কেমন, ল্যাবের বর্তমান শিক্ষার্থীরা কী নিয়ে কাজ করছে—এসব খোঁজ নেওয়া দরকার। আজকের দিনে ল্যাবের ওয়েবসাইট, প্রকাশিত পেপার, এমনকি ল্যাবের সদস্যদের লিংকডইন প্রোফাইল দেখে এই তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব।

ড. জুবায়ের শামীমের কথায় স্পষ্ট—ভালো ল্যাব ও ভালো সুপারভাইজার পেলে গবেষণার পথ অনেক সহজ ও অর্থবহ হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু গবেষণার বাস্তব অভিজ্ঞতা গড়ে ওঠে প্রতিদিনের কাজের ভেতর—ল্যাবের বেঞ্চে, আলোচনা টেবিলে, আর সুপারভাইজারের সঙ্গে নিয়মিত কথোপকথনে। এই জায়গাগুলো ঠিকভাবে বেছে নিতে পারলেই একজন তরুণ গবেষক তার সম্ভাবনাকে পূর্ণভাবে বিকশিত করতে পারে।

🔗মূল সাক্ষাৎকার পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles