অন্তর্দৃষ্টি আলাপনউচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগসাধারণ বিজ্ঞান

“সমস্যা থেকে দূরে দাঁড়িয়ে তাকালে তার প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায়” – ড. মোহাম্মদ আতাউল করিম

Share
Share

বিজ্ঞানচর্চায় গভীর মনোযোগ একটি অপরিহার্য গুণ। গবেষকরা কোনো একটি সমস্যার সমাধানে এতটাই নিবিষ্ট হয়ে পড়েন যে অনেক সময় তার চারপাশের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট চোখ এড়িয়ে যায়। অথচ অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের মতে, কেবল সমস্যার ভেতরে ডুবে থাকলে তার প্রকৃত গুরুত্ব, প্রভাব ও সীমাবদ্ধতা অনেক সময় স্পষ্ট হয় না। এই উপলব্ধি থেকেই ডক্টর মোহাম্মদ আতাউল করিম বলেন, “সমস্যা থেকে দূরে দাঁড়িয়ে তাকালে তার প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায়।”

এই কথার অর্থ হলো গবেষণাকে সময় সময় একটি দূরত্ব থেকে মূল্যায়ন করা। যেমন একজন চিত্রশিল্পী খুব কাছ থেকে ছবির একটি ছোট অংশ দেখলে হয়তো রঙের সূক্ষ্মতা বুঝতে পারবেন, কিন্তু পুরো চিত্রের সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে হলে কয়েক কদম পিছিয়ে দাঁড়ানো প্রয়োজন। গবেষণার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কোনো নির্দিষ্ট অ্যালগরিদম বা পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে যদি আমরা শুধু প্রযুক্তিগত দিকেই আটকে থাকি, তবে সেই কাজ সমাজে কী প্রভাব ফেলবে বা বৃহত্তর সমস্যার সমাধানে কতটা ভূমিকা রাখবে—তা উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ডক্টর করিমের গবেষণা-অভিজ্ঞতায় এই দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব বারবার সামনে এসেছে। অপটিক্যাল কম্পিউটিংয়ের মতো নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তাঁকে কেবল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এর প্রয়োগযোগ্যতা, খরচ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়েও ভাবতে হয়েছে। কোনো প্রযুক্তি পরীক্ষাগারে সফল হলেই বাস্তবে কার্যকর হবে—এমনটি সব সময় ঘটে না। তাই গবেষণার মাঝপথে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে প্রশ্ন করতেন: এই কাজ বৃহত্তর সমস্যার সমাধানে কতটা প্রাসঙ্গিক? অন্য কোনো পদ্ধতি কি আরও কার্যকর হতে পারে? এই আত্মসমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে গবেষণার দিকনির্দেশনা বদলাতে বা পরিমার্জন করতে সাহায্য করেছে।

সমস্যা থেকে দূরে দাঁড়িয়ে দেখার আরেকটি দিক হলো আন্তঃবিষয়ক সংযোগ খোঁজা। কোনো একটি সমস্যাকে ভিন্ন শাখার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে নতুন সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো সমস্যার সমাধানে কেবল জীববিজ্ঞানী নয়, কম্পিউটার বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলীর দৃষ্টিভঙ্গিও প্রয়োজন হতে পারে। এই বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তখনই আসে, যখন গবেষক নিজের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে সমস্যাটিকে দেখেন।

বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের জন্য এই দর্শন বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। অনেক সময় আমরা পরীক্ষার ফলাফল বা প্রকাশনার সংখ্যাকেই গবেষণার সাফল্য হিসেবে দেখি। কিন্তু গবেষণার প্রকৃত গুরুত্ব তখনই স্পষ্ট হয়, যখন তা সমাজের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়। কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ কিংবা নগরায়নের মতো ক্ষেত্রগুলোতে গবেষণার ফলাফল কীভাবে মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে—এই প্রশ্নগুলো নিজেকে জিজ্ঞেস করা জরুরি।

শেষ পর্যন্ত “সমস্যা থেকে দূরে দাঁড়িয়ে তাকালে তার প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায়”—এই বাণীটি বিজ্ঞানীদের জন্য একটি মানসিক কৌশল। গভীর মনোযোগের পাশাপাশি মাঝে মাঝে পিছিয়ে এসে পুরো দৃশ্যটি দেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে গবেষণা শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা সমাজের জন্য অর্থবহ ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।

ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles