ছোটদের জন্য বিজ্ঞান

“গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ থাকলে বিজ্ঞান মানুষের কাজে লাগে না” — ড. আবুল হুস্সাম

Share
Share

বাংলাদেশে প্রতিবছর অসংখ্য গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে থিসিস সম্পন্ন হয়, আন্তর্জাতিক জার্নালে দেশের গবেষকদের নাম ওঠে। তবু সাধারণ মানুষের জীবনে সেই গবেষণার প্রভাব খুব সীমিত। গবেষণাগারের ভেতরে জন্ম নেওয়া অনেক ধারণাই মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না। এই বৈপরীত্যের দিকে ইঙ্গিত করে ড. আবুল হুস্সামের উপলব্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কথায়, “গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ থাকলে বিজ্ঞান মানুষের কাজে লাগে না।”

ড. হুস্সামের কাজ এই কথাটির বাস্তব উদাহরণ। আর্সেনিক দূষণ নিয়ে বাংলাদেশে বহু গবেষণা হয়েছে। পানিতে কতটা আর্সেনিক আছে—এ নিয়ে ডাটা সংগ্রহ করা হয়েছে, মানচিত্র তৈরি হয়েছে, রিপোর্ট লেখা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন ছিল আরও মৌলিক: আমরা নিরাপদ পানি পাব কীভাবে? গবেষণাগারের পরিমাপের বাইরে গিয়ে এই প্রশ্নের সমাধান খোঁজার মধ্য দিয়েই ড. হুস্সাম সোনো ফিল্টারের মতো একটি ব্যবহারিক প্রযুক্তি তৈরি করেন। এটি দেখিয়ে দেয়, গবেষণার প্রকৃত মূল্য তখনই তৈরি হয়, যখন তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে।

এই সমস্যার পেছনে একটি কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। আমাদের দেশে গবেষণার সাফল্য অনেক সময় মাপা হয় কতটি পেপার প্রকাশিত হলো বা কোন জার্নালে ছাপা হলো তার মাধ্যমে। মাঠপর্যায়ে সেই গবেষণা প্রয়োগ হলো কি না—এই প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়। ফলে গবেষকরা স্বাভাবিকভাবেই তাত্ত্বিক বা পরীক্ষাগারভিত্তিক কাজে বেশি মনোযোগ দেন। অথচ উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতায় প্রয়োগমূলক গবেষণার প্রয়োজন আরও বেশি।

গবেষণাগার ও মাঠের মধ্যে এই দূরত্ব কমাতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার এবং শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ দরকার। ড. হুস্সামের কাজ দেখায়, একজন গবেষক যদি মাঠের সমস্যাকে নিজের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখেন, তবে প্রযুক্তি ও মানুষের জীবনের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করা সম্ভব। তিনি কেবল গবেষণাপত্র লেখেননি; বরং স্থানীয় বাস্তবতা মাথায় রেখে এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যা গ্রামীণ পরিবেশে ব্যবহারযোগ্য।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যবহারকারীর অংশগ্রহণ। অনেক সময় গবেষণা প্রকল্প পরিকল্পনার সময় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত বা বাস্তব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলে প্রযুক্তি মাঠে গিয়ে ব্যবহারকারীর প্রয়োজনের সঙ্গে খাপ খায় না। ড. হুস্সামের উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ায় মানুষ সহজেই প্রযুক্তিটি গ্রহণ করেছে। এটি প্রমাণ করে, গবেষণাকে কার্যকর করতে হলে ব্যবহারকারীকেও গবেষণার অংশীদার হিসেবে ভাবতে হবে।

বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের জন্য এই বার্তাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণাগারে কাজ শেখার পাশাপাশি মাঠে গিয়ে সমস্যা দেখা, মানুষের কথা শোনা এবং সেই সমস্যাকে গবেষণার প্রশ্নে রূপ দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। তবেই গবেষণা হবে জীবন্ত, কার্যকর এবং সামাজিকভাবে প্রাসঙ্গিক। গবেষণাগারে জন্ম নেওয়া বিজ্ঞান যখন মাঠে মানুষের জীবন বদলায়, তখনই তার সার্থকতা পূর্ণতা পায়।

ড. আবুল হুস্সাম এর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ