“যারা প্যাশনের জন্য কাজ করে, তারা সবসময় তাদের চেয়ে বেশি ধনী—যারা শুধু টাকার জন্য কাজ করে।”
এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে যায় টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. জুবায়ের শামীমের দীর্ঘ পথচলার দর্শন। ধনসম্পদ এখানে কেবল আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রতীক নয়; বরং জীবনের তৃপ্তি, কাজের আনন্দ, নিজের সক্ষমতাকে পূর্ণভাবে কাজে লাগানোর এক গভীর অনুভূতির কথাই তিনি বোঝাতে চান। বিজ্ঞান ও গবেষণার মতো কঠিন, দীর্ঘমেয়াদি পথে যারা হাঁটতে চান, তাদের জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি এক ধরনের মানসিক শক্তির উৎস।
বাংলাদেশের বহু শিক্ষার্থীর কাছে উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার স্বপ্ন প্রায়ই বাস্তবতার চাপের মুখে ফিকে হয়ে যায়। পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা, দ্রুত চাকরির প্রয়োজন, আর্থিক নিরাপত্তার ভাবনা—সব মিলিয়ে অনেক সময় আগ্রহের জায়গা থেকে সরে গিয়ে “নিরাপদ” পথ বেছে নেওয়া সহজ মনে হয়। কিন্তু ড. জুবায়ের শামীমের জীবনকথা দেখায়, নিরাপত্তা আর তৃপ্তি সবসময় একই পথে চলে না। কখনও কখনও প্যাশনের পথে হাঁটাটাই দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে বেশি সমৃদ্ধ করে—জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও আত্মতৃপ্তির দিক থেকে।
ড. জুবায়ের শামীমের যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং দিয়ে। পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং জাপানের ইউনিভার্সিটি অব টোকিওতে পড়াশোনা ও গবেষণার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন নতুন মাত্রা পায়। কিন্তু এই পথটি ছিল না পূর্বনির্ধারিত কোনো স্বপ্নের রূপরেখা। বরং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন—আমি কী চাই? কোন কাজটি করলে দীর্ঘদিন ধরে আগ্রহ ধরে রাখা সম্ভব? এই আত্মজিজ্ঞাসাই তাঁকে ধীরে ধীরে গবেষণার পথে টেনে এনেছে।
তিনি একসময় শিল্পখাতে স্থিতিশীল চাকরিও করেছেন। বাইরে থেকে সেটি ছিল নিরাপদ ও সম্মানজনক একটি পেশা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি অনুভব করছিলেন, গবেষণার যে আনন্দ—নতুন কিছু আবিষ্কারের উত্তেজনা, প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার রোমাঞ্চ—তা তিনি মিস করছেন। তখনই তাঁর সামনে আবার সিদ্ধান্তের মুহূর্ত আসে: স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা ধরে রাখবেন, নাকি অনিশ্চিত হলেও নিজের আগ্রহের পথে ফিরবেন? এই দ্বিধার জায়গায় দাঁড়িয়েই তাঁর উক্তিটি যেন আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে—প্যাশনের জন্য কাজ করলে যে “ধন” পাওয়া যায়, তা অনেক সময় টাকার অঙ্কে ধরা পড়ে না, কিন্তু জীবনের মানে ও তৃপ্তিকে গভীর করে।
বিজ্ঞানী হওয়ার পথ দীর্ঘ ও শ্রমসাধ্য। গবেষণায় ফল পেতে সময় লাগে, কখনও ব্যর্থতা আসে, কখনও স্বীকৃতি পেতে দেরি হয়। এই দীর্ঘ যাত্রায় কেবল বাহ্যিক পুরস্কার মানুষকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। ভিতরের আগ্রহ, কৌতূহল ও আনন্দই প্রকৃত চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। ড. জুবায়ের শামীমের কথায় সেই সত্যটাই ধরা পড়ে—যে কাজ ভালোবাসা থেকে আসে, সেই কাজের সঙ্গে মানুষ দীর্ঘদিন লেগে থাকতে পারে। আর সেই ধারাবাহিকতাই শেষ পর্যন্ত বড় সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দেয়।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এই উপলব্ধি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু কেবল বাজারের চাহিদার দিকে তাকিয়ে পথ বেছে নিলে অনেক সময় নিজের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো হয় না। বরং নিজের আগ্রহের জায়গাটি খুঁজে নিয়ে সেখানে দক্ষতা গড়ে তুললে পথ খুলে যায় নানামুখী সুযোগের দিকে—দেশে বা বিদেশে, গবেষণায় বা শিল্পে।
ড. জুবায়ের শামীমের এই একটি উক্তি তাই কেবল ব্যক্তিগত দর্শন নয়; এটি তরুণ প্রজন্মের জন্য এক ধরনের দিকনির্দেশনা। প্যাশনের পথে হাঁটতে সাহস লাগে, ধৈর্য লাগে। কিন্তু সেই পথেই লুকিয়ে থাকে দীর্ঘমেয়াদি তৃপ্তি ও অর্থবহ জীবনের সম্ভাবনা।
🔗 মূল সাক্ষাৎকার পড়ুন:

Leave a comment