গবেষণার প্রথম পদক্ষেপগবেষণায় হাতে খড়ি

ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মৌলিক কৌশল

Share
Share

ক্লাস নাইনের একটি ছাত্র যখন প্রথমবার পরীক্ষার খাতার শেষ পাতায় “গণিত: ৭২”, “পদার্থবিজ্ঞান: ৬৮” দেখে, তখন তার মাথায় প্রশ্ন আসে—আমি কি সত্যিই বিজ্ঞানী হতে পারব? সাতচল্লিশের মতো ভাঁজ পড়া সেই প্রশ্নের উত্তর কখনো আসে না পাঠ্যবই থেকে, আসে এমন কোনো বই থেকে, যা চোখ খুলে দেয় বাস্তবের দিকে। ঠিক সেই জায়গায় এসে হাজির হয় “ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মৌলিক কৌশল”—একটি বই, যা পরীক্ষার নম্বরের দেয়াল ভেঙে বিজ্ঞানকে নিয়ে যায় বাস্তব জীবনের মাঠে, যেখানে তথ্যই শেষ কথা আর কৌতূহলই প্রথম শর্ত।

এই বইয়ের লেখক ড. আরিফ মাহমুদ, একজন ডেটা সায়েন্টিস্ট ও শিক্ষক, যিনি একাধারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে পড়ান এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব সমস্যার সমাধান করেন। তাঁর কেরিয়ারের পথ ধরে হাঁটলে বোঝা যায়, ডেটা শুধু ল্যাপটপের পর্দায় থাকা সংখ্যা নয়, ঘাম-ঝরানো মাঠপর্যায়ের গল্পও। বাংলাদেশের নদীভাঙন থেকে শুরু করে শহরের বায়ুদূষণ—সবখানেই তথ্য আছে, শুধু তাকে ধরার কৌশল দরকার। লেখক সেই কৌশলই শেখান সহজ ভাষায়, যেন গ্রামের স্কুলের মেধাবী ছাত্রও নিজেকে কোনো আন্তর্জাতিক ল্যাবের অংশ মনে করে।

বইটি কী নিয়ে? সংক্ষেপে বললে, এটি আমাদের শেখায় কীভাবে প্রশ্ন তৈরি করতে হয়, সেই প্রশ্নের উত্তর বের করতে কী ধরনের তথ্য দরকার, তথ্য কোথা থেকে আসবে, কীভাবে যাচাই হবে, আর শেষ পর্যন্ত কীভাবে সেই তথ্যের ভেতর লুকিয়ে থাকা মানে খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু আসলে বইটি এই কথাগুলোকে ক্লাসের নোটের মতো করে বলে না। লেখক গল্পের ভঙ্গিতে দেখান—একটি নদীর পানি হঠাৎ কেন ঘোলা হয়ে গেল, একটি স্কুলের ফলাফলে কেন হঠাৎ গড় নামল, কিংবা একটি এলাকায় কেন রোগ বাড়ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পথটাই ডেটা। আর ডেটা যে শুধু পরীক্ষার খাতার টেবিল নয়, সেটি বোঝাতে তিনি আমাদের নিয়ে যান হাসপাতালের ওয়ার্ডে, আবহাওয়া কেন্দ্রের স্ক্রিনে, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিসংখ্যানে।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য বইটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমরা অনেক সময় বিজ্ঞানকে দেখি কঠিন সূত্রের পাহাড় হিসেবে, যেখানে ওঠার আগে অক্সিজেন মাস্ক দরকার। এই বই সেই পাহাড়ে সহজ পথ খুলে দেয়। লেখক বুঝিয়ে দেন—আপনি মোবাইল দিয়ে ছবি তুলছেন, সেটিও ডেটা; আপনি প্রতিদিন কত ঘণ্টা পড়ছেন, সেটিও ডেটা; এমনকি, আপনার আশপাশের তাপমাত্রার ওঠানামাও ডেটা। বিজ্ঞান তখন আর ভয়ের বিষয় নয়, আপনার প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। ক্লাসরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে আপনি যখন বুঝতে শিখবেন যে একটি ভালো প্রশ্ন মানেই অর্ধেক উত্তর, তখনই বিজ্ঞান আপনার বন্ধু হয়ে যাবে।

এই বইয়ের প্রতিটি পাতায় যে বৈজ্ঞানিক মনোভাবটি ফুটে ওঠে, তা হলো সন্দেহ করতে জানা, কৌতূহলকে বাঁচিয়ে রাখা আর সহজ উত্তর মেনে না নেওয়া। লেখক বলেন, “ডেটা কখনো মিথ্যা বলে না, মিথ্যা বলে আমাদের তাড়াহুড়ো করা ব্যাখ্যা।” এই লাইনটি পড়ে একজন কিশোর বুঝে যায়—তথ্যকে সমীহ করতে হয়, আর সিদ্ধান্ত নিতে ধৈর্য লাগে। পৃথিবীর বড় বড় আবিষ্কার এসেছে এমনই ধৈর্য থেকে, বারবার ভুল করার সাহস থেকে। বইটি সেই সাহসটুকুই শেখায়।

বইয়ের ভেতরে থাকা বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলো খুব সহজভাবে সাজানো। লেখক বোঝান কীভাবে একটি প্রশ্নকে ছোট ছোট অংশে ভেঙে ফেলতে হয়, যেন উত্তর খোঁজা সহজ হয়। তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন নমুনা সংগ্রহের ধারণার সঙ্গে, যেখানে দেখা যায়—সবকিছু না দেখে কয়েকটি প্রতিনিধিত্বমূলক অংশ দেখেই পুরো চিত্র বোঝা যায়। এরপর আসে ডেটা পরিষ্কারের কথা, যেখানে বোঝানো হয়—ভুল তথ্য বাদ না দিলে সিদ্ধান্তও ভুল হবে। গ্রাফ, চার্ট, সহজ গড় আর শতকরা হিসাবের মাধ্যমে লেখক দেখান—সংখ্যা আসলে গল্প বলে, শুধু তার ভাষা শিখতে হয়।

মানসিকভাবে এই বই এক তরুণ পাঠককে সাহসী করে তোলে। কারণ সে বুঝতে শুরু করে—বিজ্ঞানে ভুল করা লজ্জার নয়, বরং শেখার অংশ। বইটি পড়ে একজন শিক্ষার্থী হয়তো প্রথমবার অনুভব করবে যে সে নিজেই গবেষক হতে পারে। তাকে কোনো বিদেশি ল্যাবের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হবে না; তার হাতের খাতাই হতে পারে ল্যাব, তার আশপাশের মানুষই হতে পারে গবেষণার বিষয়বস্তু। এই অনুভূতি আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, যা বাংলাদেশের মতো দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য অমূল্য।

আমাদের বাস্তবতায় অনেক সময় বিজ্ঞান শিক্ষা মানেই ভালো কলেজ, ভালো কোচিং, ভালো নম্বরের চাপ। কিন্তু এই বই সেই চাপের পাশে দাঁড়িয়ে বলে—ভালো প্রশ্ন করাই বড় শিক্ষা। আপনি যদি বৃষ্টির দিনে পানির স্বচ্ছতা নিয়ে ভাবেন, যদি গাছের পাতার রং বদল নিয়ে কৌতূহলী হন, তবে আপনি বিজ্ঞানী হওয়ার পথে আছেন। বইটি স্কুলের পরীক্ষার বাইরের পৃথিবীকে শ্রেণিকক্ষের ভেতরে এনে বসায়, যেন শেখা শুধু সিলেবাসের ভেতরে আটকে না থাকে।

লেখকের কণ্ঠস্বর বিশ্বাসযোগ্য, কারণ তিনি জীবন্ত অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তাঁর ভাষায় বোঝা যায়—তিনি শুধু শিক্ষক নন, তিনি মাঠে কাজ করা গবেষক। তিনি যখন বলেন যে ডেটা বিশ্লেষণ আমাদের দেশের কৃষিকাজ উন্নত করতে পারে, রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করতে পারে, কিংবা ট্রাফিক ব্যবস্থাকে স্মার্ট করতে পারে—তখন কথাগুলো কাগুজে থাকে না, বাস্তবের রোদে-পোড়া সত্য হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতা বইটিকে আলাদা করে।

এই বই পড়ে একজন শিক্ষার্থীর শেখার ধরন বদলাতে পারে। সে আর মুখস্থ করতে চাইবে না, সে জানতে চাইবে—কেন এমন হলো। একসময় সে বুঝবে, প্রশ্ন করতে পারা মানেই শক্তি। আর সেই শক্তি তাকে নিয়ে যেতে পারে দূরদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে, কিংবা নিজের গ্রামের স্কুলের বিজ্ঞান ক্লাব পর্যন্ত। পথ আলাদা হতে পারে, কিন্তু দিক এক—জানার আনন্দ।

শেষে এসে বলতে হয়, “ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মৌলিক কৌশল” কোনো সাধারণ বই নয়। এটি একটি মানসিক দরজা, যা খুলে দেয় নতুন পৃথিবীর দিকে। যে পৃথিবীতে সংখ্যা শুধু সংখ্যা নয়, মানুষের গল্প; যেখানে গ্রাফ শুধু রেখা নয়, ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। বাংলাদেশের কোনো স্কুলছাত্র যদি এই বইটি পড়ে একদিন সিদ্ধান্ত নেয়—সে নদী নিয়ে গবেষণা করবে, কিংবা স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করবে—তবেই এই বইয়ের সার্থকতা পূর্ণ হবে।

তাই স্কুলব্যাগের ভেতরে যখন পরেরবার নতুন বই ঢুকবে, সেখানে এই বইটির জন্য একটু জায়গা করে রাখুন। কারণ কোনো এক বিকেলে, জানালা দিয়ে সূর্য নামার সময়, এই বইয়ের একটি লাইন আপনার মন বদলে দিতে পারে। হয়তো আপনি তখন ধীরে ধীরে অনুভব করবেন—বিজ্ঞান মানে নম্বর নয়, বিজ্ঞান মানে চোখ খুলে পৃথিবী দেখা। আর সেই চোখ খুলে গেলে, আর কোনো কিছুই অসম্ভব মনে হয় না।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org