বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে জমির পরিমাণ সীমিত, অথচ খাদ্য উৎপাদন ও বন সংরক্ষণ—দুয়েরই চাহিদা বাড়ছে। এই দ্বৈত চাপে অনেক সময় কৃষি সম্প্রসারণের জন্য বন উজাড় হয়, আবার বন সংরক্ষণের নামে কৃষকের জীবিকার প্রশ্ন উপেক্ষিত থাকে। ড. কাজী হোসেনের গবেষণাপথে অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি এই দ্বন্দ্বের একটি সম্ভাবনাময় সমাধান হিসেবে উঠে এসেছে। অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি হলো এমন একটি ধারণা, যেখানে একই জমিতে কৃষিকাজ ও বৃক্ষরোপণকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা হয়।
অ্যাগ্রোফরেস্ট্রির মূল দর্শন হলো—কৃষি ও বনকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে সহযোগী হিসেবে দেখা। যেমন, ফসলের মাঠের পাশে বা মাঝে গাছ লাগালে মাটির উর্বরতা বাড়ে, ছায়া ও বাতাসের ভারসাম্য বজায় থাকে, আবার দীর্ঘমেয়াদে কাঠ বা ফলের মতো অতিরিক্ত সম্পদও পাওয়া যায়। ড. কাজী হোসেন বলেন, অনেক দেশে এই পদ্ধতি পরীক্ষিত। বিশেষ করে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার কিছু অঞ্চলে সীমিত জমিতে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অ্যাগ্রোফরেস্ট্রির সম্ভাবনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গ্রামীণ এলাকায় রাস্তার পাশে, বাড়ির আঙিনায় বা পতিত জমিতে ফলদ ও বনজ গাছ লাগানো হলে একদিকে পরিবেশ রক্ষা হয়, অন্যদিকে পরিবারিক আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। ড. কাজী হোসেনের মতে, শুধু বড় বনভূমির দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না; ছোট ছোট উদ্যোগের মাধ্যমেও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।
অ্যাগ্রোফরেস্ট্রির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। গাছ মাটিতে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে, অতিবৃষ্টির সময় ভূমিক্ষয় কমায় এবং খরার সময় মাটির তাপমাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে ফসল উৎপাদন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে। এই প্রাকৃতিক সুরক্ষা কৃষকদের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। কোন এলাকায় কোন ধরনের গাছ ফসলের সঙ্গে মানানসই হবে, কীভাবে গাছের ছায়া ফসলের ক্ষতি না করে বরং উপকার করবে—এসব বিষয় স্থানীয় বাস্তবতার আলোকে গবেষণা দরকার। ড. কাজী হোসেন মনে করেন, গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার সমন্বয় ছাড়া অ্যাগ্রোফরেস্ট্রির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে যদি নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে অ্যাগ্রোফরেস্ট্রিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে এটি কৃষি উৎপাদন ও বন সংরক্ষণের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। কৃষক, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের যৌথ উদ্যোগে এই ধারণা বাস্তবায়িত হলে সীমিত জমিতে টেকসই উন্নয়নের একটি কার্যকর পথ তৈরি হতে পারে।
এই আলোচনার বিস্তারিত জানতে পাঠকরা biggani.org–এ প্রকাশিত ড. কাজী হোসেনের পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি দেখতে পারেন।:

Leave a comment