লেখক: ড. মশিউর রহমান | সম্পাদকীয় পর্যালোচনায়: মো. মঞ্জুরুল ইসলাম | তথ্য যাচাই: মো. ইফতেখার হোসেন
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০১২ | সর্বশেষ হালনাগাদ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬
বিদ্যুৎ, পানি ও ইন্টারনেটের মতোই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টোকেন ক্রমশ আধুনিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সম্পদ হয়ে উঠছে। কিন্তু এই সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে শুধু এআই ব্যবহার জানলেই চলবে না, জানতে হবে কখন, কীভাবে এবং কতটুকু ব্যবহার করা প্রয়োজন।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা জানি যে, সুইচ টিপলেই আলো জ্বলে এবং কল খুললেই পানি আসে। ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের তথ্য আমাদের সামনে হাজির হয়। এই সুবিধাগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এতটাই মিশে গেছে যে আমরা সাধারণত ভাবি না, এর পেছনে কত বিপুল সম্পদ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগ রয়েছে। কেবল বিদ্যুৎ চলে গেলে, পানির সরবরাহ বন্ধ হলে কিংবা ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেই আমরা এসব সম্পদের প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি করি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের ফলে আমাদের প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ—টোকেন (Token)।
একসময় শব্দটি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা গবেষক ও প্রকৌশলীদের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ChatGPT, Claude, Gemini এবং অন্যান্য জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির প্রসারের ফলে টোকেন এখন সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছেও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, টোকেন আসলে কী? কেন এর ব্যবহার নিয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন? আর ভবিষ্যতে এটি কি সত্যিই বিদ্যুৎ, পানি কিংবা ইন্টারনেটের মতো একটি অপরিহার্য সেবায় পরিণত হতে যাচ্ছে?
টোকেন কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
সহজভাবে বলতে গেলে, টোকেন হলো ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের একটি মৌলিক একক। একটি শব্দ, শব্দের অংশ, সংখ্যা কিংবা বিশেষ চিহ্ন—সবই এক বা একাধিক টোকেনে বিভক্ত হতে পারে। আমরা যখন কোনো এআই মডেলকে প্রশ্ন করি, তখন মডেলটি আমাদের লেখা সরাসরি মানুষের মতো পড়ে না। বরং লেখাকে টোকেনে রূপান্তর করে প্রক্রিয়াকরণ করে এবং সেই টোকেনের ভিত্তিতেই উত্তর তৈরি করে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি ছোট ইংরেজি বাক্য কয়েকটি টোকেনে বিভক্ত হতে পারে। অন্যদিকে বাংলা ভাষার একই অর্থবোধক বাক্যে টোকেনের সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে। কারণ টোকেনের সংখ্যা শুধু শব্দের ওপর নির্ভর করে না, বরং সংশ্লিষ্ট মডেলের টোকেনাইজেশন পদ্ধতির ওপরও নির্ভর করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনেক সেবায় এই টোকেনই ব্যবহার ও ব্যয় হিসাবের অন্যতম ভিত্তি। অর্থাৎ একটি প্রশ্ন করতে এবং তার উত্তর তৈরি করতে কত টোকেন প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে, তা সরাসরি প্রযুক্তিগত সম্পদ ব্যবহার ও পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখান থেকেই টোকেনের সঙ্গে বিদ্যুৎ বা পানির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য তৈরি হয়। যেমন বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ কিলোওয়াট-ঘণ্টায় হিসাব করা হয়, তেমনি অনেক এআই সেবায় ব্যবহৃত টোকেনের সংখ্যার ভিত্তিতে খরচ নির্ধারণ করা হয়।
তবে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। টোকেন নিজে বিদ্যুৎ বা পানির মতো কোনো ভৌত সম্পদ নয়। এটি মূলত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও ব্যবহারের একটি পরিমাপ। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে বাস্তব কম্পিউটিং অবকাঠামো, শক্তিশালী প্রসেসর, বিদ্যুৎ, শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং বিপুল পরিচালন ব্যয়। তাই টোকেনকে ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারযোগ্য সম্পদের একক হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
ছোট একটি প্রশ্নেও কেন এত টোকেন খরচ হতে পারে?
অনেকের ধারণা, এআই ব্যবহারের সময় শুধু প্রশ্ন ও উত্তরের শব্দসংখ্যা অনুযায়ী টোকেন ব্যয় হয়। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। ধরা যাক, একজন ব্যবহারকারী একটি এআই মডেলের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা করছেন। সেখানে বিভিন্ন নথি, গবেষণাপত্র, প্রতিবেদন ও পূর্ববর্তী প্রশ্নোত্তর রয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার একপর্যায়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই বিষয়টির মূল সিদ্ধান্ত কী?’
প্রশ্নটি অত্যন্ত ছোট। কিন্তু উত্তর তৈরির জন্য মডেলকে হয়তো আগের কথোপকথনের বড় একটি অংশ পুনরায় প্রক্রিয়াকরণ করতে হবে। ফলে মাত্র কয়েকটি শব্দের প্রশ্নের পেছনেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টোকেন ব্যবহৃত হতে পারে।
এআই ব্যবহারে টোকেন ব্যয়ের সঙ্গে সাধারণত কয়েকটি বিষয় জড়িত থাকে:
- ব্যবহারকারীর নতুন প্রশ্ন বা নির্দেশনা
- প্রাসঙ্গিক পূর্ববর্তী কথোপকথন
- সংযুক্ত নথি ও অন্যান্য তথ্য
- মডেলের তৈরি করা উত্তর
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ যুক্তি প্রক্রিয়াকরণ ও বিভিন্ন টুলের আদান-প্রদান
অর্থাৎ শুধু আমরা কতটুকু লিখছি, তা নয়; এআইকে কতটুকু তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করতে হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণেই অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ কথোপকথন, বিপুল পরিমাণ নথি এবং অতিরিক্ত বিস্তৃত উত্তরের অনুরোধ অনেক সময় টোকেন ব্যবহারের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।
বড় কনটেক্সট উইন্ডো মানেই বেশি বুদ্ধিমান এআই নয়
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, যে মডেলের কনটেক্সট উইন্ডো (Context Window) যত বড়, সেটি তত বেশি বুদ্ধিমান। কনটেক্সট উইন্ডো বলতে বোঝায়, একটি মডেল একবারে কতটুকু তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য গ্রহণ করতে পারে। কোনো মডেলের কনটেক্সট উইন্ডো বড় হলে সেটি দীর্ঘ নথি, বিস্তৃত কথোপকথন কিংবা বিপুল পরিমাণ তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণের সুযোগ পায়।
কনটেক্সট বিষয়টি সহজভাবে বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দেয়া যাক। মনে করুন, আপনি পড়ার টেবিলে বসে একটি প্রতিবেদন লিখছেন। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য টেবিলে কয়েকটি বই, নোটখাতা ও গবেষণাপত্র খুলে রেখেছেন। এসব উৎস থেকে প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে আপনি প্রতিবেদনটি তৈরি করছেন। আপনার সামনে থাকা এই বই, নোটখাতা ও গবেষণাপত্রের তথ্যসমষ্টিকে সহজভাবে ‘কনটেক্সট’ (Context) হিসেবে কল্পনা করা যায়। অর্থাৎ, কোনো কাজ সম্পন্ন করার জন্য যে তথ্য ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া হয়, সেটিই হলো কনটেক্সট।
কিন্তু তথ্য গ্রহণের সক্ষমতা এবং সেই তথ্য থেকে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এক বিষয় নয়। একজন শিক্ষার্থীকে হাজার পৃষ্ঠার বই দেওয়া হলে তিনি যে অবশ্যই ভালো বিশ্লেষণ করতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে একটি এআই মডেল বিপুল পরিমাণ তথ্য গ্রহণ করতে পারলেও তার যুক্তি প্রয়োগ, সমস্যা সমাধান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হয়।
এমনকি বড় কনটেক্সট উইন্ডো থাকলেও মডেল সব তথ্য সমান নির্ভুলভাবে ব্যবহার করতে পারবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সুতরাং এআই মডেল নির্বাচনের ক্ষেত্রে কনটেক্সট উইন্ডোর পাশাপাশি যুক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা, নির্ভুলতা, গতি, ব্যয় এবং কাজের ধরন বিবেচনা করা উচিত।

ছোট সমস্যার জন্য বড় হাতিয়ার কেন?
একটি সাধারণ গাণিতিক প্রশ্ন বিবেচনা করা যাক।
‘৮,০০০-এর ২৫ শতাংশ কত?’ ⇒ উত্তর ২,০০০।
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী যুক্তিনির্ভর এআই মডেলের প্রয়োজন নেই। সাধারণ ক্যালকুলেটরই যথেষ্ট। অথচ বাস্তবে আমরা অনেক সময় এমন সাধারণ কাজেও সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল ব্যবহার করি। এটি অনেকটা একটি ছোট পেরেক ঠুকতে ভারী নির্মাণযন্ত্র ব্যবহার করার মতো।
এআই প্রযুক্তিতে সব কাজের জটিলতা এক নয়। একটি সংক্ষিপ্ত ইমেইল লেখা, সাধারণ অনুবাদ করা বা কয়েকটি বাক্যের সারসংক্ষেপ তৈরি করার জন্য যে সক্ষমতা প্রয়োজন, একটি জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যার বিশ্লেষণ কিংবা সফটওয়্যার স্থাপত্য পরিকল্পনার জন্য তার চেয়ে অনেক বেশি সক্ষমতা প্রয়োজন হতে পারে।
তাই সবচেয়ে শক্তিশালী মডেল নির্বাচন করাই দক্ষতার পরিচয় নয়; বরং নির্দিষ্ট কাজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মডেল নির্বাচন করাই প্রকৃত দক্ষতা।
উদাহরণ হিসেবে OpenAI-এর ChatGPT-এর কথা বলা যায়। ChatGPT-তে কাজের জটিলতা অনুযায়ী বিভিন্ন মডেল ও চিন্তনক্ষমতার (Thinking Effort) স্তর নির্বাচন করা যায়। সাধারণ প্রশ্নের উত্তর, অনুবাদ, ইমেইল লেখা কিংবা সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ তৈরির মতো দৈনন্দিন কাজের জন্য Instant মোড সাধারণত যথেষ্ট। অন্যদিকে গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ, জটিল সমস্যা সমাধান, প্রোগ্রামিং কিংবা গভীর যুক্তিনির্ভর কাজের জন্য Thinking মোড ব্যবহার করা অধিক উপযোগী। প্রয়োজন অনুযায়ী Medium, High কিংবা Extra High চিন্তনক্ষমতার স্তর নির্বাচন করে আরও গভীর বিশ্লেষণের সুযোগ পাওয়া যায়। তবে বেশি চিন্তনক্ষমতা ব্যবহারের অর্থ সাধারণত বেশি কম্পিউটিং সম্পদ ও প্রক্রিয়াকরণ সময়ের প্রয়োজন হওয়া। তাই প্রতিটি কাজের জন্য সর্বোচ্চ ক্ষমতার মোড নির্বাচন না করে কাজের জটিলতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত মোড বেছে নেওয়াই এআই ব্যবহারের প্রকৃত দক্ষতা।
অনুরুপভাবে Anthropic-এর Claude মডেল পরিবারের কথা বলা যায়। Haiku শ্রেণির মডেল সাধারণত দ্রুত ও তুলনামূলক কম ব্যয়ে সহজ কাজ সম্পন্ন করার জন্য উপযোগী। Sonnet শ্রেণির মডেল গতি, ব্যয় ও সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে বহু ধরনের দৈনন্দিন পেশাগত কাজ সম্পন্ন করতে পারে। অন্যদিকে Opus শ্রেণির মডেল সাধারণত অধিক জটিল বিশ্লেষণ, গভীর যুক্তিনির্ভর কাজ এবং কঠিন সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবহৃত হয়।
তবে কোনো মডেলের প্রকৃত ব্যয় বা উপযোগিতা তার নির্দিষ্ট সংস্করণ, মূল্যকাঠামো এবং কাজের ধরনের ওপর নির্ভর করে। তাই মডেলের নামের পরিবর্তে কাজের প্রয়োজনীয়তাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই যুক্তিসংগত।

টোকেন ব্যবস্থাপনায় পাঁচটি কার্যকর অভ্যাস
এআই ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানোর জন্য সব সময় গভীর প্রযুক্তিগত জ্ঞান প্রয়োজন হয় না। বরং কয়েকটি সাধারণ অভ্যাসই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
- প্রথমত, কাজ অনুযায়ী মডেল নির্বাচন করুন। সাধারণ অনুবাদ, ছোট ইমেইল বা প্রাথমিক সারসংক্ষেপের জন্য দ্রুত ও সাশ্রয়ী মডেল ব্যবহার করা যেতে পারে। জটিল গবেষণা, কোড বিশ্লেষণ কিংবা বহুমাত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অধিক সক্ষম মডেলের সহায়তা নেওয়া যুক্তিযুক্ত।
- দ্বিতীয়ত, শুধু প্রাসঙ্গিক তথ্য সরবরাহ করুন। ধরা যাক, আপনি গতকালের একটি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানতে চান। সে ক্ষেত্রে আলোচনার কার্যবিবরণী বা নোট সরবরাহ করাই যথেষ্ট হতে পারে। অপ্রাসঙ্গিকভাবে গত ১৮ মাসের ইমেইল, শতাধিক পৃষ্ঠার চুক্তিপত্র ও পুরোনো প্রতিবেদন যুক্ত করলে টোকেনের ব্যবহার বাড়তে পারে এবং মূল প্রশ্নের প্রাসঙ্গিকতা দুর্বল হতে পারে।
- তৃতীয়ত, প্রত্যাশিত উত্তরের পরিধি নির্দিষ্ট করুন। পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে চাইলে স্পষ্টভাবে পাঁচটি বিষয়ের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা চাইতে পারেন। এক পৃষ্ঠার সারসংক্ষেপ যথেষ্ট হলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ প্রতিবেদন তৈরি করানোর দরকার নেই। তবে যে কাজের জন্য বিস্তারিত বিশ্লেষণ জরুরি, সেখানে শুধু টোকেন বাঁচানোর উদ্দেশ্যে তথ্য কমিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়।
- চতুর্থত, নতুন বিষয়ের জন্য আলাদা কথোপকথন শুরু করুন। একটি দীর্ঘ আলোচনায় সম্পূর্ণ নতুন প্রসঙ্গ যুক্ত করলে অনেক ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী তথ্যও পুনরায় প্রক্রিয়াকরণ করতে হয়। নতুন চ্যাট শুরু করলে অপ্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট কমানো সম্ভব। তবে একই প্রকল্পের ধারাবাহিক কাজের ক্ষেত্রে পুরোনো কথোপকথন বজায় রাখা উপকারী হতে পারে। তাই বিষয়ভিত্তিক সংগঠিত কথোপকথন অধিক কার্যকর।
- পঞ্চমত, গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল সংরক্ষণ করুন। কোনো গবেষণার সারসংক্ষেপ, প্রতিবেদন বা বিশ্লেষণ তৈরি হয়ে গেলে সেটি সংরক্ষণ করা উচিত। একই কাজ বারবার নতুন করে করালে অতিরিক্ত সময় ও টোকেন প্রয়োজন হতে পারে। পূর্ববর্তী ফলাফলকে ভিত্তি করে নতুন কাজ এগিয়ে নেওয়া অধিক ফলপ্রসূ।

টোকেন সাশ্রয়ের নামে সৃজনশীলতা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়
টোকেন ব্যবহারে সচেতনতার কথা বলতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—অতিরিক্ত সাশ্রয়ী হওয়ার চেষ্টা যেন এআই শেখা ও নতুন কিছু আবিষ্কারের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। যারা প্রথমবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছেন, তাদের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রশ্ন করা এবং বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দিয়ে ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শেখার সময় ভুল হওয়া স্বাভাবিক। একই প্রশ্ন বিভিন্নভাবে করা, ভিন্ন মডেলের উত্তর তুলনা করা কিংবা নতুন পদ্ধতিতে কোনো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা—এসবই এআই ব্যবহারে দক্ষতা অর্জনের অংশ। তাই নতুন ব্যবহারকারীদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তিটিকে ভালোভাবে বোঝা এবং এর সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা।
অন্যদিকে অভিজ্ঞ ব্যবহারকারী, সফটওয়্যার নির্মাতা, গবেষক এবং যাঁরা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ এআই সেবা ব্যবহার করেন, তাঁদের জন্য টোকেন ব্যবস্থাপনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য হওয়া উচিত অপচয় কমানো, প্রয়োজনীয় ব্যবহার সীমিত করা নয়।

ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে টোকেনের অবস্থান
প্রযুক্তির ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, একসময়ের ব্যয়বহুল ও সীমিত সুবিধাগুলো ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য সেবায় পরিণত হয়েছে। একসময় বিদ্যুৎ ছিল সীমিতসংখ্যক মানুষের নাগালের মধ্যে। পরে তা আধুনিক সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। ইন্টারনেটও প্রথমদিকে গবেষণা ও বিশেষায়িত যোগাযোগের অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এখন শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, যোগাযোগ ও বিনোদনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রেও একই পরিবর্তন ঘটেছে। নিজেদের বিশাল সার্ভার অবকাঠামো তৈরির পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন প্রয়োজন অনুযায়ী কম্পিউটিং সক্ষমতা ভাড়া নিতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও অনুরূপ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে বিভিন্ন সফটওয়্যার, চিকিৎসাব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণাগার এবং শিল্পকারখানায় এআই সেবা আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে পারে। মানুষ হয়তো প্রতিটি কাজের জন্য আলাদাভাবে এআই ব্যবহারের কথা ভাববে না। বরং এআই-নির্ভর সক্ষমতা বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠবে।
সেই অর্থে টোকেন হতে পারে এআই-নির্ভর ডিজিটাল অর্থনীতিতে ব্যবহারের হিসাব রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ একক। অবশ্য ভবিষ্যতের সব এআই সেবার মূল্য যে টোকেনের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সাবস্ক্রিপশন, নির্দিষ্ট কাজভিত্তিক মূল্য, কম্পিউটিং সময় কিংবা অন্যান্য পদ্ধতিও সমান্তরালভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। তবু টোকেন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল দক্ষতা হয়ে উঠতে পারে।
শেষ কথা: বেশি ব্যবহার নয়, বিচক্ষণ ব্যবহারই আসল দক্ষতা
বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা যেমন অপ্রয়োজনীয় বাতি নিভিয়ে রাখি, পানির ক্ষেত্রে যেমন অপচয় এড়ানোর চেষ্টা করি, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন সচেতনতা। তবে এআই ব্যবহারের লক্ষ্য শুধু টোকেন সাশ্রয় নয়। বরং যথাযথ পরিমাণ সম্পদ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ কার্যকর ফলাফল অর্জন করা। একটি জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যা সমাধানে অধিক টোকেন ব্যবহার করা প্রয়োজন হলে সেটি অপচয় নয়। আবার সাধারণ একটি কাজের জন্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যয়বহুল মডেল ব্যবহার করাও দক্ষতার পরিচয় নয়।
আমাদের এমন একটি ব্যবহারিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রযুক্তির সক্ষমতার পাশাপাশি তার ব্যয়, প্রাসঙ্গিকতা ও কার্যকারিতাও বিবেচনায় থাকবে। আগামী দিনের এআই-নির্ভর পৃথিবীতে কে কত বেশি টোকেন ব্যবহার করল, সেটি হয়তো সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হবে না। বরং কে কত কম অপচয়ে, কত নির্ভুলভাবে এবং কত অর্থবহ কাজ সম্পন্ন করতে পারল, সেটিই হয়ে উঠবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রকৃত দক্ষতা শুধু ভালো প্রশ্ন করতে জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সঠিক কাজের জন্য সঠিক প্রযুক্তি এবং সঠিক পরিমাণ সম্পদ ব্যবহার করতে জানার মধ্যেও নিহিত।

Leave a comment