কৃষিগবেষণার প্রথম পদক্ষেপ

গবেষক হওয়ার স্বপ্নটি যখন চোখেই পড়ত না

Share
Share

“গবেষক হওয়াও যে একটি পথ হতে পারে, তা আমার সামনে কখনো আসেনি।”

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এক এলাকায় বেড়ে ওঠা ড. শিরিন আক্তারের শৈশবে ভবিষ্যৎ পেশার তালিকা ছিল ছোট। বড় হয়ে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হওয়ার কথা শোনা যেত। কিন্তু একজন বিজ্ঞানী কী করেন, গবেষণাগারে কীভাবে প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন, কিংবা গবেষণাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া যায় কি না—সেসব দেখার সুযোগ ছিল না। বিজ্ঞানী ডট অর্গের সাক্ষাৎকারে তাঁর এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, স্বপ্ন দেখার জন্য আগে কোনো সম্ভাবনাকে চোখে পড়তে হয়।

চিকিৎসা ও প্রকৌশল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ পেশা। কিন্তু শিশুর সামনে সাফল্যের উদাহরণ যদি কেবল এই কয়েকটি পেশাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সে নিজের অন্য আগ্রহগুলো চিনতে নাও পারে। পরিবার, শিক্ষক ও চারপাশের মানুষ যে পেশাগুলোর কথা বলেন, সেগুলোই ধীরে ধীরে তার কল্পনার সীমানা হয়ে ওঠে। শিরিনের নিজের জীবনেও গবেষণার পথটি শুরুতে অচেনা ছিল।

কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হয়ে তিনি কৃষিতত্ত্ব, উদ্যানতত্ত্ব, কীটতত্ত্ব ও মৃত্তিকাবিজ্ঞানের মতো নানা বিষয় পড়েন। তৃতীয় বা চতুর্থ সেমিস্টারে জিনতত্ত্ব তাঁর বিশেষ আগ্রহ জাগায়। অনেকের কাছে কঠিন মনে হওয়া বিষয়টিতে তিনি খুঁজে পান আকর্ষণীয় সব প্রশ্ন: একটি উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য পরের প্রজন্মে কীভাবে যায়? কিছু গাছ প্রতিকূল পরিবেশে অন্যগুলোর চেয়ে ভালো টিকে থাকে কেন? এই প্রশ্নগুলোই তাঁকে বুঝতে সাহায্য করে, কৃষির পরিচিত সমস্যার উত্তর খোঁজার মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কারের সুযোগ আছে।

তবু আগ্রহ তৈরি হওয়া আর গবেষণার পেশায় পৌঁছানো এক নয়। স্নাতকোত্তরের শুরুতে তিনিও ভেবেছিলেন, টমেটো বা আলুর মতো কোন ফসল নিয়ে কাজ করলে দ্রুত গবেষণা শেষ করে ডিগ্রি পাওয়া যাবে। তখন এক শিক্ষক জানতে চান, তিনি বিদেশে পড়তে চান কি না। তাঁর সম্মতিই হয়ে ওঠে যাত্রার মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। সেই শিক্ষকের সহায়তায় তিনি গাজীপুরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানে খরার মধ্যে ভুট্টার সহনশীলতা নিয়ে কাজ করেন—যে প্রশ্নের সঙ্গে জলবায়ুর চাপ মোকাবিলা করা কৃষকের বাস্তব সম্পর্ক রয়েছে। স্নাতকোত্তরের মৌখিক পরীক্ষার আগেই তাঁর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।

এরপর বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক বিজ্ঞানী তাঁকে বিদেশে পিএইচডির জন্য আবেদন করতে উৎসাহ দেন। ইচ্ছা থাকলেও কীভাবে আবেদন করবেন, তা তিনি জানতেন না। চীনে পিএইচডি করা এক সহকর্মী তাঁকে প্রক্রিয়াটি বুঝতে সাহায্য করেন। পরে বেইজিংয়ে চীনা কৃষিবিজ্ঞান একাডেমির এক অধ্যাপকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের সুযোগ পান। শিরিনের ভাষ্যমতে, অধ্যাপক তাঁকে জানিয়েছিলেন, ওই পদের প্রায় এক হাজার আবেদনকারীর মধ্য থেকে তাঁকে বেছে নেওয়া হয়েছে। খবরটি তাঁর আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দেয়। বৃত্তিতে পড়াশোনা, থাকা ও জীবনযাত্রার খরচের ব্যবস্থা হয়েছিল; বিমানভাড়া তাঁকে নিজে বহন করতে হয়েছিল। আজ তিনি চীনের লানচৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করছেন।

এই যাত্রার প্রতিটি বাঁকে কাউকে না কাউকে তিনি পেয়েছেন, যিনি একটি নতুন পথের কথা বলেছেন বা পথটি কীভাবে ধরতে হয়, তা দেখিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী গবেষণার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের সেই সুযোগটুকুও পান না। শিরিনের অভিজ্ঞতায়, ব্যবহারিক ক্লাস কখনো ছবি আঁকা ও মুখস্থভিত্তিক শনাক্তকরণেই সীমিত থাকে; দামি যন্ত্র নষ্ট হওয়ার ভয় এবং মেরামতের অর্থের অভাবে শিক্ষার্থীদের হাতে যন্ত্র তুলে দেওয়া হয় না। অথচ গবেষণা শেখার জন্য পরীক্ষা চালানো, ভুল হওয়া এবং কেন ভুল হলো তা খুঁজে দেখার সুযোগ দরকার।

তাই তাঁর আহ্বান, শিশুদের সামনে বিজ্ঞানী, উদ্ভিদের নতুন জাত উদ্ভাবনকারী ও উদ্ভাবকদের কাজ তুলে ধরতে হবে। তাদের দেখাতে হবে, বন্যা, খাদ্যসংকট বা ফসলের রোগের মতো বাস্তব সমস্যার উত্তর খোঁজাও একটি অর্থবহ পেশা। তাহলে আজ যে শিক্ষার্থী নিজের ভবিষ্যৎ কেবল কয়েকটি পরিচিত পেশায় দেখতে পাচ্ছে, সে হয়তো একদিন নতুন প্রশ্ন করার সাহস পাবে।

কীভাবে সেই প্রশ্ন শিরিন আক্তারকে খরাসহিষ্ণু ভুট্টার গবেষণা থেকে আন্তর্জাতিক গবেষণাঙ্গনে নিয়ে গেল, আর নতুন শিক্ষার্থীরা কোথা থেকে শুরু করতে পারে—সেসব বিস্তারিত জানতে পড়ুন বিজ্ঞানী ডট অর্গে ড. শিরিন আক্তারের পূর্ণ সাক্ষাৎকার।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles