একটা ছোট গল্প বলি।
সে অনেক দিন আগের কথা। একটা মহিষের দলে বাঁচার নিয়মটাই ছিল এমন, দলে যত মহিষ বেশি, বাঘের সামনে তত নিরাপত্তা বেশি। একদিন সেই দলের সবচেয়ে বলবান মহিষটা প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সর্দারের সঙ্গে লড়াইয়ে জিতে গেল। লড়াই করেছিল একটাই মহিষ। রক্ত ঝরেছিল তারই শরীর থেকে। ক্ষতও হয়েছিল তারই। কিন্তু সেই রাতে পুরো দলের প্রতিটা মহিষ যেন নতুন করে শিং উঁচু করে হাঁটতে শুরু করল। যে মহিষটা লড়াইয়ের সময় দূরে নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছিল, সেও অন্য দলের সামনে বুক ফুলিয়ে হাঁটল, যেন জয়টা তারও। কারণ তার মস্তিষ্ক তখন একটাই কথা বুঝেছিল, “আমার দল জিতেছে। তাই আমিও নিরাপদ। আমিও শক্তিশালী।”
মানুষের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা এমনই। শুধু এখানে “দল” শব্দটির জায়গায় অনেক সময় চলে আসে “দেশ”।
এই যে নিজের কোনো সরাসরি অবদান না থাকলেও দেশের অর্জনে নিজের সাফল্যের অনুভূতি পাওয়া, এটা কোনো দুর্বলতা নয়, কোনো ভানও নয়। এটি মানুষের মস্তিষ্কের খুবই মৌলিক একটি বৈশিষ্ট্য। আমাদের চিন্তা, অনুভূতি এবং সিদ্ধান্তের বড় একটি অংশ গড়ে ওঠে আমরা কোন পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করি, তার ওপর। তাই অনেক সময় “আমি” এবং “আমার দেশ” মস্তিষ্কের কাছে আলাদা দুটি সত্তা নয়, বরং একই পরিচয়ের দুটি অংশ।
এই ধারণাটিকেই ১৯৭০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী হেনরি তাজফেল তাঁর Social Identity Theory বা সামাজিক পরিচয় তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন। তিনি দেখান, একজন মানুষের পরিচয়ের বড় একটি অংশ নির্ভর করে সে নিজেকে কোন গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে দেখে তার ওপর। সেই গোষ্ঠী হতে পারে একটি দেশ, একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি খেলার ক্লাব, একটি পেশা, এমনকি একটি অনলাইন কমিউনিটিও। যখন আমরা বলি, “বাংলাদেশ জিতেছে” কিংবা “আমরা জিতেছি”, তখন আসলে আমরা শুধু দেশের সাফল্য উদযাপন করি না, নিজের পরিচয়েরও একটি অংশকে উদযাপন করি। কারণ মস্তিষ্ক দেশের পরিচয়কে নিজের পরিচয়ের সঙ্গেই যুক্ত করে ফেলে।
এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে মনোবিজ্ঞানী রবার্ট চিয়ালডিনির গবেষণায়। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল দল জয়ের পরদিন শিক্ষার্থীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো বা রঙের পোশাক পরে ক্যাম্পাসে আসে। কথা বলার সময় তারা বলে, “আমরা জিতেছি।” কিন্তু দল হারলে একই মানুষ বলে, “ওরা হেরে গেছে।” অর্থাৎ সাফল্যকে নিজের পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে নেওয়া মানুষের খুব স্বাভাবিক একটি মানসিক প্রবণতা। মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় Basking in Reflected Glory, সংক্ষেপে BIRGing। দেশের ক্ষেত্রেও আমরা অনেকটা একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাই। যখন দেশের মানুষ কোনো বড় অর্জন করে, তখন সেই আনন্দ ব্যক্তিগত আনন্দেও রূপ নেয়।
স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণাও এই আচরণের পেছনে জৈবিক ভিত্তির ইঙ্গিত দেয়। মস্তিষ্কের মেডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যে অংশটি নিজের পরিচয়, মূল্যবোধ এবং “আমি কে” এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত, সেটিই আমাদের নিজের দেশ নিয়ে ভাবার সময়ও সক্রিয় হয়। অর্থাৎ মস্তিষ্ক অনেক ক্ষেত্রেই দেশকে নিজের অস্তিত্বেরই একটি সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচনা করে। তাই দেশের অর্জন আমাদের কাছে কেবল একটি সংবাদ নয়, ব্যক্তিগত আনন্দেরও উৎস হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে জাতীয় বিজয় উদযাপন, সমবেতভাবে জাতীয় সংগীত গাওয়া কিংবা একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সময় ডোপামিন আমাদের আনন্দ ও পুরস্কারের অনুভূতি বাড়ায়। অন্যদিকে অক্সিটোসিন মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস, সংযুক্তি এবং একাত্মতার অনুভূতি জোরদার করতে সাহায্য করে। সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুরখেইম এই সম্মিলিত আবেগময় অভিজ্ঞতাকে Collective Effervescence নামে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাই কোনো জাতীয় অর্জনের মুহূর্তে হাজারো মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে আনন্দ প্রকাশ করার অভিজ্ঞতা একা সেই খবর পড়ার চেয়ে অনেক বেশি তীব্র অনুভূত হয়।
তাই দেশের কোনো বৈজ্ঞানিক সাফল্য, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিজয়, সাংস্কৃতিক অর্জন কিংবা অন্য কোনো জাতীয় অর্জনের খবর শুনে আমাদের বুক গর্বে ভরে ওঠে। ব্যক্তিগতভাবে সেখানে আমাদের কোনো অবদান না থাকলেও, মস্তিষ্ক সেই সাফল্যের একটি অংশ নিজের বলেই অনুভব করে। এই অনুভূতিই মানুষকে একে অপরের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে, জাতীয় পরিচয়কে আরও দৃঢ় করে এবং একটি দেশের মানুষকে একই আনন্দে, একই গর্বে ও একই স্বপ্নে একসূত্রে বেঁধে রাখে।
মহিষের সেই গল্পটি শুধু একটি উপমা নয়। এটি মানুষের সামাজিক মস্তিষ্কেরও একটি গল্প। দেশের সাফল্যে নিজের সাফল্যের অনুভূতি পাওয়া শুধু একটি আবেগ নয়, বরং মানুষের পরিচয়, সামাজিক বন্ধন এবং একসঙ্গে পথচলার গভীর মানসিক ও স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ভিত্তিরই একটি স্বাভাবিক প্রকাশ।
লেখক পরিচিতিঃ
মো. ইফতেখার হোসেন
এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ |
আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Leave a comment