বিজ্ঞানীদের খবর

“প্রত্যাখ্যান মানেই শেষ নয়, বরং আরও ভালো করার সুযোগ” – ড. মো. হাফিজুর রহমান

Share
Share

“প্রত্যাখ্যান মানেই শেষ নয়; ভালো জার্নাল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া গবেষণাও একদিন উন্নত হয়ে বিশ্বমানের প্রকাশনায় পৌঁছাতে পারে।”

গবেষণার জগতে সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতার একটি হলো প্রত্যাখ্যান। একজন শিক্ষার্থী বা তরুণ গবেষক অনেক দিন ধরে একটি কাজ করেন, পরীক্ষা করেন, ডাটা বিশ্লেষণ করেন, প্রবন্ধ লেখেন, শিক্ষক বা সহগবেষকের সঙ্গে বারবার সংশোধন করেন। তারপর যখন সেই গবেষণাপত্র কোনো আন্তর্জাতিক জার্নালে জমা দেওয়া হয়, তখন মনে হয়—এবার হয়তো স্বীকৃতি মিলবে। কিন্তু অনেক সময় উত্তর আসে—প্রবন্ধটি গ্রহণ করা হলো না।

এই একটি “রিজেকশন” অনেক শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিতে পারে। কেউ ভাবে, “আমার গবেষণা ভালো নয়।” কেউ ভাবে, “আমি হয়তো গবেষণার জন্য উপযুক্ত নই।” কেউ আবার প্রথম প্রত্যাখ্যানের পরই থেমে যায়। কিন্তু অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের গবেষণাজীবন আমাদের শেখায়—প্রত্যাখ্যান কোনো শেষ দরজা নয়; অনেক সময় সেটিই উন্নতির প্রথম দরজা।

সাক্ষাৎকারে তিনি খোলাখুলিভাবে বলেছেন, বাংলাদেশে ফিরে গবেষণা শুরু করার পর ভালো জার্নালে প্রবন্ধ জমা দিলে প্রথম দিকে অনেকবার প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হতে হয়েছে। জাপানের গবেষণাগারে কাজ করার সময় তাঁর প্রবন্ধগুলো সহজে রিভিউ প্রক্রিয়ায় গেলেও দেশে ফেরার পর বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। প্রয়োজনীয় উপকরণ নেই, যন্ত্রপাতি নেই, পর্যাপ্ত সুবিধা নেই—এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তাঁকে গবেষণা করতে হয়েছে। যে কাজ জাপানে তিন মাসে করা সম্ভব ছিল, বাংলাদেশে সেটি শেষ করতে কখনো এক বছর লেগেছে। তবু তিনি কাজ চালিয়ে গেছেন।

২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের দিকে ভালো জার্নালে জমা দেওয়া প্রবন্ধ অনেক সময় প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কিন্তু তিনি এটিকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখেননি। কোথাও প্রবন্ধটি অন্য জার্নালে স্থানান্তরের সুযোগ এসেছে, কোথাও নিচু ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের জার্নালে প্রকাশের পথ তৈরি হয়েছে, কোথাও আবার কাজের মান আরও উন্নত করার প্রয়োজন বোঝা গেছে। ধীরে ধীরে গবেষণার পদ্ধতি, বিশ্লেষণ, লেখা, উপস্থাপনা—সবকিছু উন্নত হয়েছে। এরপর ২০২০-২১ সালের দিক থেকে তাঁর গবেষণাপত্র কিউওয়ান জার্নালেও প্রকাশ পেতে শুরু করে। আজ তাঁর দল বছরে একাধিক উচ্চমানের গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে পারছে।

এই পথচলা তরুণ গবেষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দেয়—প্রথম প্রত্যাখ্যান আপনার গবেষণার চূড়ান্ত বিচার নয়।

একটি গবেষণাপত্র প্রত্যাখ্যাত হতে পারে নানা কারণে। গবেষণার বিষয়টি জার্নালের পরিধির সঙ্গে না মিলতে পারে। পরীক্ষার পদ্ধতি আরও পরিষ্কার করার প্রয়োজন হতে পারে। ডাটার ব্যাখ্যা দুর্বল হতে পারে। ভাষা, কাঠামো বা চিত্র উপস্থাপনা উন্নত করতে হতে পারে। কখনো একই গবেষণাকে আরও উপযুক্ত জার্নালে জমা দিলেই ভালো ফল পাওয়া যায়। তাই রিজেকশন মানেই “সব শেষ” নয়; বরং এটি একটি সংকেত—আরও ভালোভাবে ভাবতে হবে, লিখতে হবে, সাজাতে হবে, ব্যাখ্যা করতে হবে।

গবেষণা আসলে সংশোধনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একটি ভালো গবেষণাপত্র প্রথম খসড়াতেই পরিপূর্ণ হয় না। যেমন একজন কারিগর কাঠ ঘষে, কেটে, মেপে, বারবার ঠিক করে সুন্দর আসবাব বানান, তেমনি একজন গবেষকও নিজের কাজকে বারবার ঘষে-মেজে পরিণত করেন। প্রত্যাখ্যান সেই প্রক্রিয়ার অংশ।

ড. হাফিজুর রহমানের অভিজ্ঞতা আরও একটি বিষয় শেখায়—গবেষণার মান ধীরে ধীরে তৈরি হয়। কেউ একদিনে আন্তর্জাতিক মানের গবেষক হয়ে ওঠে না। প্রথমে ছোট জার্নালে প্রকাশ হতে পারে, পরে মাঝারি মানের জার্নালে, তারপর একদিন উচ্চমানের জার্নালে। এই ধাপে ধাপে এগোনোর পথকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটিই গবেষণার বাস্তব পথ।

তরুণদের অনেকেই শুরুতেই কিউওয়ান জার্নালে প্রকাশ করতে চায়। উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভালো, কিন্তু তার সঙ্গে ধৈর্য দরকার। কিউওয়ান জার্নাল সাধারণত কোনো গবেষণা ক্ষেত্রের শীর্ষমানের জার্নাল হিসেবে বিবেচিত হয়। সেখানে প্রকাশ পেতে হলে গবেষণার প্রশ্ন, পদ্ধতি, ডাটা, বিশ্লেষণ ও লেখার মান—সবকিছু শক্তিশালী হতে হয়। তাই প্রত্যাখ্যান এলে বুঝতে হবে, আরও উন্নতির জায়গা আছে।

এখানে সবচেয়ে জরুরি হলো মানসিকতা। কেউ প্রত্যাখ্যানকে ব্যক্তিগত অপমান মনে করলে সে থেমে যায়। কিন্তু কেউ যদি প্রত্যাখ্যানকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখে, সে এগিয়ে যায়। একজন ভালো গবেষক নিজেকে প্রশ্ন করেন—

আমার গবেষণার দুর্বল জায়গা কোথায়?

পদ্ধতি আরও শক্তিশালী করা যায় কি?

ডাটা আরও ভালোভাবে উপস্থাপন করা যায় কি?

ভাষা কি স্পষ্ট?

চিত্র, টেবিল, গ্রাফ কি গবেষণার যুক্তি পরিষ্কার করছে?

এই জার্নালটি কি সত্যিই আমার গবেষণার জন্য উপযুক্ত ছিল?

এই প্রশ্নগুলোই পরবর্তী সংস্করণকে ভালো করে।

বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের জন্য এই শিক্ষা আরও জরুরি। কারণ এখানে গবেষণার অবকাঠামো অনেক সময় সীমিত। প্রয়োজনীয় রাসায়নিক, আধুনিক যন্ত্রপাতি, বড় ফান্ড, প্রকাশনা ব্যয়—সবকিছু সহজলভ্য নয়। ফলে আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গেলে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু ড. হাফিজুর রহমানের জীবন দেখায়—সীমাবদ্ধতা থাকলেও উন্নতি সম্ভব, যদি ধারাবাহিকতা থাকে।

তিনি নিজেই বলেছেন, ১০-১২ বছর আগের তুলনায় বাংলাদেশে গবেষণার মান অনেক উন্নত হয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান থেকেও এখন কিউওয়ান জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে, গবেষণার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা শিখছেন, লিখছেন, আন্তর্জাতিক মানের দিকে এগোচ্ছেন।

তাই যারা আজ প্রথম গবেষণাপত্র লিখছে, তাদের প্রত্যাখ্যানকে ভয় পাওয়া চলবে না। বরং প্রত্যাখ্যানকে গবেষণার প্রশিক্ষণ হিসেবে দেখতে হবে। একটি রিজেকশন আপনাকে শেখাতে পারে কীভাবে ভালো অ্যাবস্ট্রাক্ট লিখতে হয়, কীভাবে গবেষণার ফাঁক বা “রিসার্চ গ্যাপ” স্পষ্ট করতে হয়, কীভাবে ফলাফলকে শক্ত যুক্তির সঙ্গে উপস্থাপন করতে হয়, কীভাবে রিভিউয়ারের মন্তব্য থেকে নিজের কাজ উন্নত করতে হয়।

প্রত্যাখ্যানের পর সবচেয়ে খারাপ কাজ হলো চুপ করে বসে থাকা।

সবচেয়ে ভালো কাজ হলো আবার পড়া, আবার লেখা, আবার সংশোধন করা, আবার জমা দেওয়া।

গবেষণার জগতে সফলতা অনেক সময় তাদের কাছেই যায়, যারা প্রথম ব্যর্থতার পরও থাকে। যারা ধৈর্য ধরে। যারা নিজের কাজের মান বাড়াতে প্রস্তুত। যারা অহংকার না করে শেখে। যারা জানে—আজ ফিরিয়ে দেওয়া প্রবন্ধও আগামীকাল উন্নত হয়ে ভালো জার্নালে প্রকাশিত হতে পারে।

ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের গবেষণাজীবন তাই শিক্ষার্থীদের মনে সাহস জাগায়। তিনি সীমিত সুবিধা, বারবার প্রত্যাখ্যান, দীর্ঘ সময়ের কাজ, কম ফান্ড—সবকিছুর মধ্য দিয়েও থেমে যাননি। তাঁর অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, প্রত্যাখ্যান গবেষকের পরিচয় মুছে দেয় না; বরং গবেষকের ধৈর্য পরীক্ষা করে।

তাই তরুণ গবেষকদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—

রিজেকশন পেলে হতাশ হবেন না।

রিভিউয়ারের মন্তব্য পড়ুন।

দুর্বলতা খুঁজুন।

সংশোধন করুন।

আরও ভালোভাবে লিখুন।

আবার চেষ্টা করুন।

কারণ প্রত্যাখ্যান মানেই গবেষণার শেষ নয়। অনেক সময় প্রত্যাখ্যানই গবেষণাকে বিশ্বমানের পথে এগিয়ে দেয়।

তাঁর জীবন, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ জানতে পড়ুন মূল সাক্ষাৎকার :

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org