গত দুয়েকদিন আগের ঘটনা। আমি রাতের খাবারের সময় ভাতের সাথে দেওয়া তরকারি ঠিকভাবে খেতে পারিনি। পরিবেশনও ভালো ছিল না। পরে আর কোনো পার্সেল আসবে না ভেবে আমি না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ি।
ঘটনাটা তখন খুব সাধারণই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরের দিন সকালে হঠাৎ আমার মায়ের একটি অস্বাভাবিক সময়ে কল আসে। সাধারণত তিনি এমন সময়ে ফোন করেন না। তিনি একটু চিন্তিত গলায় জানতে চান, আমি রাতে খেয়েছি কি না। আমি স্বাভাবিকভাবে বলি, “হ্যাঁ মা, খেয়েছি।” কিন্তু ভেতরে কোথাও আমি কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করি, কারণ বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। এরপর তিনি এমন একটি কথা বলেন, যা পুরো ঘটনাটাকে আরও অদ্ভুত করে তোলে। তিনি বলেন, তিনি স্বপ্নে দেখেছেন আমি রাতে ঠিকভাবে খেতে পারিনি।
এই ঘটনাটি ঘটেছে শ্রীমঙ্গল থেকে কক্সবাজারের মধ্যে, যার দূরত্ব প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার। শুধু ভৌগোলিক দূরত্ব নয়, যোগাযোগের দিক থেকেও এটি একটি বড় ব্যবধান। তবুও এই দূরত্বের মধ্যেই কীভাবে একজন মা তার সন্তানের একটি বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে এমন স্বপ্ন দেখতে পারেন এই প্রশ্নই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ দেয়নি যে মানুষের মস্তিষ্ক সরাসরি দূরে থাকা অন্য মানুষের মস্তিষ্কে তথ্য পাঠাতে পারে। অর্থাৎ “মন থেকে মন” সরাসরি তথ্য আদান-প্রদান এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
নিউরোসায়েন্সের মূল ব্যাখ্যা হলো, চিন্তা, অনুভূতি এবং স্মৃতি সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত স্নায়বিক প্রক্রিয়ার ফল, যা মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এটি বোঝার জন্য মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, তা একটু সহজভাবে দেখা দরকার।
প্রথমত, মস্তিষ্ক সবসময় শুধু তথ্য গ্রহণ করে না, বরং ভবিষ্যৎ অনুমানও করে। Cognitive neuroscience-এ এই ধারণাকে বলা হয় predictive processing। মস্তিষ্ক আগের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান ইঙ্গিত থেকে সম্ভাব্য পরিস্থিতি তৈরি করতে থাকে।
দ্বিতীয়ত, মা–সন্তানের সম্পর্ক একটি অত্যন্ত গভীর আবেগীয় সম্পর্ক। দীর্ঘদিনের অভ্যাস, চিন্তা এবং যত্নের কারণে সন্তানের একটি মানসিক ছবি মায়ের মস্তিষ্কে সবসময় সক্রিয় থাকে। আবেগীয় স্মৃতি সাধারণ স্মৃতির তুলনায় বেশি শক্তিশালীভাবে সংরক্ষিত হয়, যেখানে amygdala এবং hippocampus গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তৃতীয়ত, ঘুমের সময় বিশেষ করে REM sleep পর্যায়ে মস্তিষ্ক দিনের তথ্য, আবেগ এবং স্মৃতি পুনর্গঠন করে। এই সময় বাইরের বাস্তব তথ্য সরাসরি কাজ করে না, বরং ভেতরের স্মৃতি ও অনুভূতি মিলিয়ে একটি মানসিক দৃশ্য তৈরি হয়।
ঘুমের সময় মস্তিষ্ক একটি ধরনের “simulation” তৈরি করে। এটি বাস্তবতা, স্মৃতি এবং অনুভূতিকে একসাথে মিশিয়ে একটি গল্পের মতো অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
আমার মায়ের ক্ষেত্রে, আমার প্রতি তার স্বাভাবিক চিন্তা এবং উদ্বেগ, বিশেষ করে আমি দূরে থাকায় খাওয়া-দাওয়া ঠিক হচ্ছে কি না, এই ধরনের ভাবনা ঘুমের সময় স্বপ্নের রূপ নিতে পারে। এটি কোনো অদৃশ্য যোগাযোগ নয়, বরং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক emotion-driven processing।
আমার ঘটনার সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো, সেদিন আমি সত্যিই ঠিকভাবে খেতে পারিনি। এমন পরিস্থিতি একজন অভিভাবকের মনে আগে থেকেই থাকা চিন্তাকে আরও সক্রিয় করে তুলতে পারে। মানসিকভাবে মা সবসময় সন্তানের প্রতি সংবেদনশীল থাকেন। তাই ছোট কোনো ইঙ্গিত, আগের অভিজ্ঞতা বা সাধারণ উদ্বেগ মিলিয়ে মস্তিষ্ক একটি সম্ভাব্য দৃশ্য তৈরি করতে পারে, যা পরে স্বপ্নে প্রকাশ পায়। এটি কোনো রহস্যময় সংযোগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের আবেগ, স্মৃতি এবং ঘুমের সময় মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজের সমন্বয়।
Neuroscience অনুযায়ী মস্তিষ্ক একটি “meaning-making system”। এটি সবসময় বিভিন্ন তথ্য, অনুভূতি এবং স্মৃতিকে মিলিয়ে একটি অর্থপূর্ণ গল্প তৈরি করতে চেষ্টা করে। স্বপ্ন সেই প্রক্রিয়ারই একটি অংশ, যেখানে বাস্তব ঘটনা, আবেগ এবং স্মৃতি একসাথে মিশে যায়। তাই কখনো কখনো স্বপ্ন বাস্তব ঘটনার সাথে মিলে যেতে পারে, কিন্তু সেটি দূর থেকে তথ্য আদান-প্রদানের প্রমাণ নয়। ঘুম এবং স্বপ্ন নিয়ে আধুনিক গবেষণার বড় অংশ REM sleep, memory consolidation এবং emotional processing-এর উপর ভিত্তি করে। Matthew Walker সহ অনেক গবেষক দেখিয়েছেন, ঘুম শুধু বিশ্রাম নয়, বরং আবেগ এবং স্মৃতি প্রক্রিয়াকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা দূর থেকে স্বপ্নে তথ্য পাওয়ার মতো কোনো টেলিপ্যাথিক যোগাযোগকে প্রমাণ করতে পারেনি।
আমার এই অভিজ্ঞতা আমাকে একটা বিষয় নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। আমরা যেটাকে কখনো কখনো “অদ্ভুত মিল” বলে মনে করি, অনেক সময় সেটার পেছনে মস্তিষ্কের খুব সাধারণ কিন্তু গভীর কাজ লুকিয়ে থাকে। দূরত্ব তাই শুধু কিলোমিটারের হিসাব নয়, বরং আবেগ, স্মৃতি এবং মস্তিষ্কের জটিল কাজের একটি মিলিত গল্প।
মো. ইফতেখার হোসেন
এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ |
আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Leave a comment