একজন বিজ্ঞানীর ক্যারিয়ার মানেই কি একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সারা জীবন আটকে থাকা? অনেক শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকের মনে এমন ধারণাই কাজ করে—একবার যে বিষয় বেছে নেওয়া হলো, সেটাই শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে। কিন্তু ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের দীর্ঘ গবেষণা-জীবনের দিকে তাকালে এই ধারণাটি ভেঙে যায়। তাঁর জীবনপথ দেখায়, বিষয় বদলানো মানেই পথ হারানো নয়; বরং সময়, প্রয়োজন ও সুযোগ অনুযায়ী বিষয় পরিবর্তন করা অনেক সময় একজন গবেষককে আরও পরিপূর্ণ করে তোলে।
ড. করিমের একাডেমিক যাত্রা শুরু হয়েছিল পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর তিনি প্রথমে ফিজিক্সে পড়াশোনা করেন। সেই সময় তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল বায়োফিজিক্স—বিশেষ করে কার্সিনোজেনিক ক্রিস্টাল নিয়ে কাজ, যা মূলত ঘনীভূত পদার্থবিজ্ঞানের একটি অংশ। এখানে তিনি পদার্থের গঠন ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে মৌলিক গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গবেষণার প্রয়োজন ও সুযোগের দিক বিবেচনা করে তিনি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চলে যান।
ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এসে তাঁর গবেষণার বিষয় আবারও বদলাতে থাকে। শুরুতে তিনি ইমেজ প্রসেসিং ও ইনফরমেশন প্রসেসিং নিয়ে কাজ করেন—যেখানে ডিজিটাল ছবি ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা হয়। পরে সময়ের প্রেক্ষাপটে এবং প্রযুক্তিগত চাহিদার কারণে তাঁর গবেষণার দৃষ্টি ঘুরে যায় অপটিক্যাল কম্পিউটিংয়ের দিকে। তিনি আলোকে ব্যবহার করে দ্রুতগতির সমান্তরাল কম্পিউটেশন করার ধারণায় কাজ শুরু করেন। এই পরিবর্তনের পেছনে ছিল বড় আকারের কম্পিউটিং সমস্যার সমাধানের প্রয়োজন, যা তখনকার ইলেকট্রনিক প্রসেসর দিয়ে কার্যকরভাবে করা যাচ্ছিল না।
ড. করিম নিজেই বলেছেন, তিনি তাঁর গবেষণার বিষয় পরিবর্তন করেছেন প্রয়োজন ও ফান্ডিংয়ের বাস্তবতা অনুযায়ী। অর্থাৎ বিষয় পরিবর্তনের পেছনে কোনো দ্বিধা বা অস্থিরতা নয়, বরং সময়ের দাবি ও গবেষণার বাস্তব চাহিদাই কাজ করেছে। তাঁর এই অভিযাত্রা দেখায়, একজন গবেষকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমস্যার দিকে তাকানো—বিষয় বা শাখার নাম নয়। সমস্যার ধরন বদলালে গবেষণার পথও বদলাতে পারে, এবং সেটাই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য এই বার্তাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন, একবার যে বিষয়ে ভর্তি হয়েছেন বা যে বিষয়ে ডিগ্রি নিচ্ছেন, সেটাই চূড়ান্ত পথ। ফলে নতুন সুযোগ বা আগ্রহের জায়গা এলেও তাঁরা বিষয় বদলাতে ভয় পান। ড. করিমের অভিজ্ঞতা শেখায়, বিষয় পরিবর্তন মানেই ব্যর্থতা নয়; বরং নতুন ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়া একজন গবেষককে আরও বহুমাত্রিক ও অভিযোজ্য করে তোলে।
শেষ পর্যন্ত ড. আতাউল করিমের জীবনপথ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিজ্ঞান একটি গতিশীল ক্ষেত্র। এখানে পথ বদল মানেই লক্ষ্যচ্যুতি নয়; বরং কখনো কখনো নতুন পথই প্রকৃত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যায়।
ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment