গল্পে গল্পে বিজ্ঞানছোটদের জন্য বিজ্ঞান

গল্প বলার ধরনেই বদলে যায় মস্তিষ্কের স্মৃতি

Share
Share

আপনি কি জানেন, আমাদের মস্তিষ্ক এক ধরনের আশ্চর্য কম্পিউটার? এটি আমাদের শরীরের সবচেয়ে বুদ্ধিমান অঙ্গ। আমরা যখন দেখি, শুনি, গন্ধ পাই, কিছু ভাবি বা সিদ্ধান্ত নিই— সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করে এই মস্তিষ্ক।

ভাবুন, আপনার মাথার ভেতরে অসংখ্য ছোট ছোট তারের মতো কোষ আছে। এই কোষগুলোর নাম নিউরন। এই নিউরনগুলো একে অপরকে বার্তা পাঠায়, ঠিক যেমন ফোনে মেসেজ পাঠানো হয়। আপনি যখন কিছু শেখেন, তখন এই নিউরনগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি হয়। এই সংযোগের মাধ্যমেই মস্তিষ্ক মনে রাখে কোন কাজ কীভাবে করতে হয়। একে বলে স্মৃতি।

যেমন, আপনি যখন প্রথম সাইকেল চালানো শিখেছিলেন, তখন ভারসাম্য রাখা খুব কঠিন মনে হয়েছিল। কয়েকদিন পরেই দেখলেন, না ভেবেই আপনি সাইকেল চালাতে পারছেন। কারণ আপনার মস্তিষ্ক সেটি মনে রেখেছে এবং সঠিকভাবে নির্দেশ দিচ্ছে।

এখন ভাবুন, আপনার শিক্ষক আপনাকে দুটি গল্প শোনালেন। একটিতে বলা হলো, “রবি নদীর ধারে বসে রোদের উষ্ণতা অনুভব করছিল, তার মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা কত সুন্দর।” আরেকটিতে বলা হলো, “রবি নদীর ধারে লাল বেঞ্চে বসেছিল, নদীর পানি চকচক করছিল, আর হলুদ পাখি উড়ে যাচ্ছিল।”

দুই গল্পেই একই ঘটনা বলা হয়েছে, কিন্তু একটিতে ছিল অনুভূতি আর ভাবনা, অন্যটিতে ছিল চোখে দেখা দৃশ্যের বর্ণনা।

কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী জানতে চেয়েছিলেন, এই দুই ধরনের গল্প শোনার সময় মস্তিষ্কের ভেতরে কী ঘটে। তাঁরা একটি বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করেন, যার নাম fMRI স্ক্যানার। এই স্ক্যানার মস্তিষ্কের কোন জায়গায় বেশি কাজ হচ্ছে তা দেখায়।

গবেষণায় দেখা যায়, যখন গল্পে অনেক অনুভূতি ও চিন্তার বিষয় থাকে, তখন মস্তিষ্কের একটি অংশ, যার নাম হিপোক্যাম্পাস, সক্রিয় হয় আরেকটি অংশের সঙ্গে, যার নাম ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক বা DMN। এই অংশ আমাদের নিজের চিন্তা, অনুভূতি ও গল্পের অর্থ বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু যখন গল্পে অনেক চোখে দেখা বা শোনা জিনিসের বর্ণনা থাকে, তখন হিপোক্যাম্পাস কাজ করে অন্য একটি অংশের সঙ্গে, যার নাম অ্যাঙ্গুলার জাইরাস। এটি আমাদের ইন্দ্রিয়ভিত্তিক স্মৃতি— যেমন রঙ, শব্দ, গন্ধ— মনে রাখতে সাহায্য করে।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, দুটি ধরনের গল্পই মানুষ প্রায় সমানভাবে মনে রাখতে পারে। তবে যেসব গল্পে অনুভূতি বেশি থাকে, সেগুলো মানুষ সাধারণত বেশি ভালোভাবে মনে রাখে। কারণ আমরা শুধু কী দেখেছি তা নয়, বরং কীভাবে অনুভব করেছি, সেটিও মস্তিষ্ক গভীরভাবে ধরে রাখে। যেমন, আপনি হয়তো মনে রাখেন, “গল্পটা শুনে আমার খুব ভালো লেগেছিল,” কিন্তু গল্পের পাখিটা নীল না হলুদ ছিল— তা হয়তো ভুলে যান।

আরও একটি বিষয় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গল্প মনে রাখার ধরনও বদলে যায়। ছোট বয়সে আমরা সব কিছু নতুনভাবে দেখি, তাই রঙ, শব্দ, গন্ধের মতো ছোট ছোট বিশদ বেশি মনে রাখি। কিন্তু বড় হলে আমরা গল্পের মূল কথা বা সারাংশ বেশি মনে রাখি, বিস্তারিত নয়। বড়রা সাধারণত মনে রাখেন “গল্পটা ছিল বন্ধুত্ব নিয়ে,” কিন্তু শিশুরা মনে রাখে “গল্পে একটা লাল টুপি পরা মেয়ে ছিল।”

বিজ্ঞানীরা বলছেন, গল্প মনে রাখাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার ভেতরের বিশদ ও অনুভূতি। আপনি যদি চান কেউ আপনার গল্প মনে রাখুক, তাহলে গল্পে মজা, আবেগ এবং অনন্য বর্ণনা যোগ করুন। যেমন “রবি হাঁটছিল” বললে গল্প ফিকে মনে হয়, কিন্তু “রবি রোদের মধ্যে হাঁটছিল, তার গালে রোদের আলো পড়েছিল, আর হালকা বাতাসে তার চুল উড়ছিল”— এমনভাবে বললে গল্পটি জীবন্ত হয়ে ওঠে।

যত বেশি বিশেষ তথ্য থাকবে, মস্তিষ্ক গল্পটি তত ভালোভাবে মনে রাখতে পারবে। বিজ্ঞানীরা বলেন, এই বিশেষ তথ্যগুলো যেন ছোট ছোট পেরেকের মতো, যেগুলো গল্পকে মস্তিষ্কের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখে।

আমাদের মস্তিষ্ক শুধু তথ্য ধরে রাখে না, অনুভূতিও বোঝে। আপনি যেভাবে গল্প বলেন, সেটিই নির্ধারণ করে কেউ কীভাবে সেটি মনে রাখবে। তাই গল্প বলার সময় শুধু ঘটনাই নয়, তার অনুভূতিও বলুন— কারণ মস্তিষ্ক সবচেয়ে ভালো মনে রাখে সেই গল্প, যা হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান, অ্যালিসন পারশাল, “Brains Remember Stories Differently Based on How They Were Told,” ২০ অক্টোবর ২০২৫।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org