“যে কাজ জানে, যে শিখতে চায়, যে হাতে-কলমে দক্ষ হতে চায়—গবেষণার জগতে শেষ পর্যন্ত তারই মূল্য সবচেয়ে বেশি।”
শিক্ষাজীবনে অনেক সময় আমরা ডিগ্রি, ফলাফল, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বা পদবিকে বেশি গুরুত্ব দিই। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গবেষণার জগতে শেষ পর্যন্ত যে বিষয়টি সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তা হলো দক্ষতা—আপনি কী পারেন, কীভাবে ভাবেন, কীভাবে সমস্যা সমাধান করেন, এবং নতুন কিছু শেখার জন্য কতটা প্রস্তুত।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের সাক্ষাৎকারে এই বিষয়টি খুব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, জাপানের গবেষণাগারে গিয়ে অনেক যন্ত্রপাতি ও পদ্ধতি তাঁর কাছে নতুন ছিল। তখন তিনি চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও মেশিনের ব্যবহার শিখেছেন। কারণ গবেষণায় অহংকারের জায়গা নেই। যে কাজ জানে, তার কাছ থেকেই শিখতে হয়।
এই কথাটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের সমাজে অনেক সময় “কে বড়” বা “কে ছোট”—এই ধারণা শেখার পথে বাধা তৈরি করে। কেউ মনে করে, জুনিয়রের কাছ থেকে শেখা মানে নিজের মর্যাদা কমে যাওয়া। কেউ আবার ভাবতে পারে, শিক্ষক বা গবেষক হলে সবকিছু জানতেই হবে। কিন্তু বিজ্ঞান এমন কোনো জায়গা নয়, যেখানে একজন মানুষ সব জানে। বিজ্ঞান হলো সারাজীবন শেখার প্রক্রিয়া।
একটি গবেষণাগারে কাজ করতে গেলে শুধু বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়। রাসায়নিক মাপা, দ্রবণ তৈরি করা, যন্ত্র চালানো, ডাটা সংগ্রহ করা, গ্রাফ আঁকা, ফলাফল ব্যাখ্যা করা, গবেষণাপত্র লেখা—এসবই হাতে-কলমে শেখার বিষয়। কেউ যদি শুধু তত্ত্ব জানে কিন্তু পরীক্ষাগারে কাজ করতে না পারে, তবে সে পূর্ণ গবেষক হয়ে উঠতে পারে না।
ড. হাফিজুর রহমানের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, দক্ষতা অর্জনের জন্য বিনয় দরকার। জাপানে গিয়ে তিনি দেখেছেন, গবেষণার সংস্কৃতি অনেক বেশি পদ্ধতিগত। সেখানে সময়নিষ্ঠা, যন্ত্রের সঠিক ব্যবহার, ল্যাব নিরাপত্তা, ডাটা সংরক্ষণ—সবকিছুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই নতুন পরিবেশে টিকে থাকতে হলে তাঁকে শিখতে হয়েছে, মানিয়ে নিতে হয়েছে, প্রশ্ন করতে হয়েছে।
এখানেই একজন সত্যিকারের গবেষকের মানসিকতা দেখা যায়।
তিনি ভাবেননি, “আমি তো বিদেশে পিএইচডি করতে এসেছি, আমি কেন একজন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীর কাছ থেকে শিখব?” বরং তিনি বুঝেছিলেন, যে যন্ত্রটি ভালো চালাতে পারে, যে পদ্ধতিটি জানে, সেই মুহূর্তে সেই মানুষটিই তাঁর শিক্ষক। গবেষণায় এই দৃষ্টিভঙ্গি খুব জরুরি।
বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এই শিক্ষা বিশেষভাবে প্রয়োজন। আমরা অনেক সময় সার্টিফিকেট অর্জন করি, কিন্তু দক্ষতা অর্জনে যথেষ্ট সময় দিই না। ভালো ফলাফল করার পরও কেউ কেউ গবেষণাপত্র পড়তে পারে না, ডাটা বিশ্লেষণ করতে পারে না, একটি বৈজ্ঞানিক গ্রাফ তৈরি করতে পারে না, অথবা নিজের কাজ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে না। অথচ আন্তর্জাতিক গবেষণার জগতে এসবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।
একজন শিক্ষার্থী যদি গবেষণায় এগোতে চায়, তবে তাকে কয়েকটি প্রশ্ন নিজেকে নিয়মিত করতে হবে—
আমি কি গবেষণাপত্র বুঝে পড়তে পারি?
আমি কি ডাটা সাজাতে পারি?
আমি কি গ্রাফ তৈরি করতে পারি?
আমি কি কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার শিখছি?
আমি কি নিজের গবেষণা অন্যকে বোঝাতে পারি?
আমি কি ভুল হলে আবার চেষ্টা করি?
গবেষণার জগতে “আমি জানি না” বলা দুর্বলতা নয়; বরং শেখার শুরু। দুর্বলতা হলো না জেনে জানার ভান করা। যে শিক্ষার্থী বলতে পারে, “আমি জানি না, আমাকে শিখিয়ে দিন”—সে-ই একদিন দক্ষ হয়ে ওঠে।
ড. হাফিজুর রহমান তরুণদের বারবার শিখতে বলেছেন। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেক সময় একটি অভ্যাস দেখা যায়—তারা কাজটি নিজে শেখার বদলে চায় শিক্ষক করে দিন। কিন্তু তিনি চান শিক্ষার্থীরা নিজেরা কাজ শিখুক। কারণ গবেষণায় ভবিষ্যৎ তৈরি হয় নিজের হাতে দক্ষতা গড়ে তোলার মাধ্যমে।
আজকের পৃথিবীতে জ্ঞান দ্রুত বদলাচ্ছে। নতুন নতুন সফটওয়্যার আসছে, নতুন গবেষণা-পদ্ধতি তৈরি হচ্ছে, নতুন যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণার পদ্ধতিকেও বদলে দিচ্ছে। এই সময়ে শুধু ডিগ্রি নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। যে নিয়মিত শিখতে পারে, নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারে, কাজের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করতে পারে—তারই মূল্য বাড়ে।
এটি শুধু গবেষণার ক্ষেত্রেই নয়, জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই সত্য।
চাকরি, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি উন্নয়ন—সব জায়গায় এখন হাতে-কলমে দক্ষ মানুষ প্রয়োজন। কেউ যদি শুধু তত্ত্ব জানে কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগ করতে না পারে, তবে তার সীমাবদ্ধতা থেকে যায়। আবার কেউ যদি শুরুতে খুব বড় ডিগ্রিধারী না-ও হয়, কিন্তু কাজ জানে, শিখতে চায়, সমস্যা সমাধান করতে পারে—তবে সে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে।
ড. হাফিজুর রহমানের জীবনগল্প তাই আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—গবেষণায় বড় হতে হলে নিজেকে বড় ভাবার আগে নিজেকে শিক্ষার্থী ভাবতে হবে। কারণ সত্যিকারের বিজ্ঞানী কখনো শেখা বন্ধ করেন না।
যে হাতে-কলমে কাজ শেখে, সে আত্মবিশ্বাসী হয়।
যে ভুল থেকে শেখে, সে পরিণত হয়।
যে অন্যের কাছ থেকে শিখতে লজ্জা পায় না, সে দ্রুত এগিয়ে যায়।
আর যে কাজ জানে, গবেষণার জগতে শেষ পর্যন্ত তারই মূল্য থাকে।
বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য এই বার্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শুধু ভালো নম্বর নয়, শুধু সার্টিফিকেট নয়—নিজেকে দক্ষ করে তুলতে হবে। ল্যাবে কাজ শেখা, গবেষণাপত্র পড়া, ডাটা বিশ্লেষণ, বিজ্ঞানকে সহজ ভাষায় বোঝানো—এসব দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে ধীরে ধীরে।
কারণ ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী তৈরি হয় আজকের শেখার অভ্যাস থেকে।
তাঁর জীবন, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ জানতে পড়ুন মূল সাক্ষাৎকার

Leave a comment