টরন্টোর শীতল এক সন্ধ্যা। বাইরে তুষারপাত, আর ভেতরে এক অভিবাসী চিকিৎসকের মন ভাঙা দীর্ঘশ্বাস। দেশে তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ মেডিকেল অফিসার, প্রতিদিন শত শত রোগী দেখতেন। কিন্তু কানাডায় এসে তিনি হঠাৎই হয়ে গেলেন “অযোগ্য”, “ওভারকোয়ালিফায়েড”, আবার একইসাথে “আন্ডারএমপ্লয়ড”। দিনের পর দিন রিজিউম পাঠিয়েও কোনো উত্তর নেই, ক্লিনিকে কাজ করা তো দূরের কথা, হাসপাতালে প্রবেশাধিকারও পাওয়া যায় না। লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া এত ধীর, ব্যয়বহুল এবং প্রতিযোগিতামূলক যে বেশিরভাগই হাল ছেড়ে দেন।
এই গল্প এক ব্যক্তির নয়। কানাডায় আসা ৯৫ থেকে ৯৭ শতাংশ বিদেশি চিকিৎসকের একই অভিজ্ঞতা। মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ লাইসেন্স পেয়ে চিকিৎসাপেশায় ফিরতে পারেন। বাকিরা? ট্যাক্সি চালান, দোকানে কাজ করেন, গুদামে মাল টানেন, কিংবা লড়াই করেন বিষণ্নতার সাথে।
এই অন্ধকার বাস্তবতার মাঝেই জন্ম নেয় আশা, ITMD Program, যার প্রতিষ্ঠাতা একজন বাংলাদেশি চিকিৎসক ও বিশ্বস্বাস্থ্য বিজ্ঞানী, ড. শফি ভূঁইয়া।
অভিবাসী চিকিৎসকদের জন্য এক নতুন সূর্যোদয়: ITMD এর জন্ম
২০১0 সালে কানাডায় এসে ড. ভূঁইয়া নিজেও firsthand অনুভব করেছিলেন নতুন দেশে চিকিৎসকদের বাধা, প্রত্যাখ্যান এবং অদৃশ্য বৈষম্য। তিনি বুঝলেন যে সমস্যা শুধু লাইসেন্সের ঘাটতি নয়, বরং একটি সিস্টেমিক শূন্যতা। বিদেশি চিকিৎসকরা শুধু লাইসেন্স ছাড়া ডাক্তারই নন, তারা দক্ষ গবেষক, প্রজেক্ট ম্যানেজার, স্বাস্থ্যনীতি বিশ্লেষক, ডেটা বিশেষজ্ঞ, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীও। তাদের দক্ষতা থেকে কানাডার স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিশালভাবে উপকৃত হতে পারে, শুধু প্রয়োজন সঠিক প্ল্যাটফর্মের।
এই প্রেক্ষাপটেই তিনি তৈরি করেন Internationally Trained Medical Doctors (ITMD) Bridging Program, যা প্রথম চালু হয় Ryerson University (বর্তমানে TMU)-এ ২০১৫ সালে।
এই প্রোগ্রাম প্রথমবারের মতো অভিবাসী ডাক্তারদের জন্য একটি বিকল্প পেশাগত জীবনপথ তৈরি করে।

ITMD প্রোগ্রাম: তিন মাসের প্রশিক্ষণ, আজীবনের পরিবর্তন
মোট ১৩ সপ্তাহের ইন-ক্লাস লেকচার এবং ৬ থেকে ৮ সপ্তাহের প্র্যাকটিকাম প্লেসমেন্ট নিয়ে সাজানো এই প্রোগ্রাম বিদেশি চিকিৎসকদের এমন সব দক্ষতা শেখায় যা কানাডার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন:
- স্বাস্থ্য গবেষণা ও ডেটা বিশ্লেষণ
- প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট
- কানাডিয়ান স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামো
- স্বাস্থ্যনীতি বিশ্লেষণ
- রিপোর্ট রাইটিং এবং বৈজ্ঞানিক যোগাযোগ
- নেতৃত্ব, দল ব্যবস্থাপনা এবং পেশাগত নেটওয়ার্কিং
প্রশিক্ষণের পর শিক্ষার্থীরা প্র্যাকটিকাম করেন হাসপাতাল, জনস্বাস্থ্য সংস্থা, গবেষণা ল্যাব, পলিসি ইনস্টিটিউটসহ ২৫টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানে।
এই পুরো প্রক্রিয়া একজন অভিবাসী চিকিৎসকের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে।
কেউ ফিরে যান গবেষণায়, কেউ স্বাস্থ্য প্রশাসনে, কেউ data analyst, project coordinator বা policy researcher হিসেবে নিজেদের নতুন পরিচয় খুঁজে পান।
বাস্তব ফলাফল: ৮৫ শতাংশের বেশি কর্মসংস্থান
ITMD প্রোগ্রাম প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত শত শত অভিবাসী চিকিৎসকের ভাগ্য বদলে গেছে।
- ৩৬টি দেশ থেকে আসা চিকিৎসক অংশ নিয়েছেন
- ৮৫ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী স্বাস্থ্যসেক্টরে চাকরি পেয়েছেন
- অনেকেই আজ কানাডার শীর্ষ হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন
- অনেকে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, পিএইচডি শুরু করেছেন, স্বাস্থ্যনীতি তৈরি করছেন
অনেক শিক্ষার্থী বলেন,
“ITMD না থাকলে হয়তো আমি কানাডা ছেড়ে চলে যেতাম, অথবা চিকিৎসক পরিচয় ভুলে কোনো ভিন্ন পেশায় জীবন কাটাতাম।”
এই প্রোগ্রাম তাই শুধু একটি একাডেমিক উদ্যোগ নয়, বরং একটি মানবিক হস্তক্ষেপ, একটি মানসিক পুনর্জন্ম।
কেন ITMD এত গুরুত্বপূর্ণ?
১. কানাডার স্বাস্থ্যব্যবস্থা অভিবাসীদের ওপর নির্ভরশীল
উত্তরোত্তর বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ছে, ডাক্তার–নার্সের ঘাটতি তীব্র। যে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন, বিদেশি চিকিৎসকদের মধ্যেই তা পূর্ণমাত্রায় আছে।
২. ব্রেইন ওয়েস্ট থেকে ব্রেইন গেইন
যে ডাক্তার তার দেশে ১০–১৫ বছর অভিজ্ঞ, তাকে কানাডায় “শুরু থেকে” ডাক্তারি শিখতে বলা বাস্তবসম্মত নয়। ITMD সেই দক্ষতাই কাজে লাগায়।
৩. মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা
অভিবাসীদের হতাশা, পরিচয়ের সংকট, সমাজে অবমূল্যায়নের মতো বিষয়গুলো বড় আকারের মানসিক চাপ তৈরি করে। প্রোগ্রামটি তাদের মর্যাদা, পেশাগত পরিচয় এবং মানবিক আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে দেয়।
৪. অর্থনৈতিক সুফল
একজন অভিবাসী চিকিৎসক যখন data analyst হিসেবে কাজ করেন, health project coordinator হন বা epidemiology research assistant হন, তখন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাও সমৃদ্ধ হয়।
ড. শফি ভূঁইয়া: নেপথ্যের স্থপতি
ড. ভূঁইয়া নিজে পাঁচটি দেশে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও গবেষণায় কাজ করেছেন, জাপান থেকে পিএইচডি, থাইল্যান্ড থেকে MPH, কানাডা থেকে MBA করেছেন, এবং University of Toronto ও TMU–তে অধ্যাপনা করছেন। তার অভিজ্ঞতা একটি প্রশ্নের ভিত্তিতে দাঁড়ায়:
“কেন একজন দক্ষ চিকিৎসককে আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে, যখন তার জ্ঞান ও দক্ষতা কানাডার স্বাস্থ্যব্যবস্থাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন?”
এই প্রশ্ন থেকেই তৈরি হয় ITMD, যা আজ কানাডায় অভিবাসী স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের অন্যতম সফল মডেল হিসেবে স্বীকৃত।
যে ৯৭ শতাংশ অন্ধকারে ছিলেন, ITMD তাদের আলো দেখিয়েছে
কানাডায় আসা প্রতিটি বিদেশি চিকিৎসকের জীবনই একেকটি সংগ্রামের গল্প। অনেকেই মনে করতেন তাদের পেশাগত জীবন এখানেই শেষ। কিন্তু ITMD প্রোগ্রাম প্রমাণ করেছে, সঠিক পথনির্দেশনা, প্রশিক্ষণ, এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ও প্রথম অধ্যায়ের মতোই উজ্জ্বল হতে পারে।
ড. ভূঁইয়ার নেতৃত্বে তৈরি এই মডেল আজ শুধু কানাডায় নয়, বিশ্বব্যাপী অভিবাসী চিকিৎসকদের পেশাগত পুনর্গঠনের জন্য একটি অনুকরণীয় কাঠামো হয়ে উঠছে।
শেষ কথা
স্বাস্থ্যসেবা কেবল হাসপাতালের ভেতরকার একটি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি সামাজিক প্রতিশ্রুতি। ITMD প্রোগ্রাম সেই প্রতিশ্রুতিরই মূর্ত প্রতীক, যা বলে দেয় যে দক্ষতা কখনও নষ্ট হয় না, শুধু সঠিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ পেলে তা নতুন আলো ছড়াতে পারে।
ড. শফি ভূঁইয়ার মতো নেতারা দেখিয়ে দিয়েছেন, জনস্বাস্থ্যে পরিবর্তন আনতে সবসময় বড় নীতি দরকার হয় না, কখনও কখনও একটি সেতু তৈরি করাই যথেষ্ট। এই সেতুই আজ শত শত অভিবাসী চিকিৎসকের জীবনকে নতুন করে গড়ে তুলছে।

Leave a comment