একদিন এক তরুণ রোগী ক্লিনিকে এলেন। তেমন কোনো বড় সমস্যা নেই, শুধু মাঝে মাঝে চোখে হালকা হলুদ ভাব আসে। শরীর ঠিক আছে, খাওয়া-দাওয়া ঠিক আছে, ব্যথা নেই, জ্বর নেই। টেস্ট করা হলো। রিপোর্টে দেখা গেল bilirubin একটু বেশি। কিন্তু অন্য সবকিছু প্রায় স্বাভাবিক। পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা ব্যক্তি রিপোর্ট দেখে একটু কনফিউজড হলেন। পরে একটি বিশেষ পরীক্ষা আর শেষে বায়োপসি (tissue sample নেওয়া) করার পর যা দেখা গেল, তা সত্যিই অবাক করার মতো লিভারের রঙ স্বাভাবিক লালচে-বাদামি না, বরং অনেকটা কালচে।
প্রশ্নটা তখনই মাথায় আসে লিভার কালো হয়ে যায় কীভাবে? এটা কি বিপজ্জনক?
এই অদ্ভুত অবস্থাটির নাম Dubin–Johnson syndrome।
গল্পটা বুঝতে হলে আমাদের যেতে হবে bilirubin-এর যাত্রাপথে। প্রতিদিন শরীরে পুরোনো red blood cell (RBC, লোহিত কণিকা) ভেঙে যায়। সেখান থেকে তৈরি হয় bilirubin (হলুদ রঙের বর্জ্য পদার্থ)। প্রথমে এটি থাকে unconjugated bilirubin (পানিতে না মিশা, oil-এর মতো ভাবুন)। এটা albumin (রক্তের প্রোটিন, বহনকারী গাড়ির মতো) ধরে লিভারে আসে। লিভারে এসে bilirubin undergo করে conjugation (পানিতে মেশার মতো পরিবর্তন)। তখন এটি হয়ে যায় conjugated bilirubin (পানিতে মিশতে সক্ষম)। এরপর স্বাভাবিকভাবে এটি bile (পিত্ত) এর সাথে মিশে bile duct (পাতলা নালির পথ) দিয়ে অন্ত্রে চলে যায়।
এখানেই সমস্যা শুরু হয়।
লিভারের ভেতরের কোষগুলোকে বলে hepatocyte (লিভারের কাজ করা মূল কোষ)। এই কোষের ভেতরে একটি transporter থাকে MRP2 (বের করার পাম্পের মতো দরজা)। এটি conjugated bilirubin-কে কোষ থেকে বের করে bile canaliculi (ছোট ছোট নালি) তে পাঠায়। Dubin–Johnson syndrome-এ এই পাম্প ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে conjugated bilirubin লিভারের ভেতরে আটকে যায় এবং ধীরে ধীরে রক্তে ফিরে আসে।
ফলাফল রক্তে bilirubin বেড়ে যায় এবং চোখে হালকা জন্ডিস দেখা যায়।
কিন্তু আসল রহস্য হলো লিভার কালো হয় কেন। এটা bilirubin জমার কারণে না। বরং লিভারের ভেতরে জমে থাকা pigment (রঙিন পদার্থ) এর কারণে, যা melanin (ত্বকের কালো রঙের উপাদান)-এর মতো দেখতে। এটি আসে epinephrine metabolism (হরমোন ভাঙার প্রক্রিয়া) থেকে তৈরি কিছু byproduct থেকে, যা বের হতে না পেরে লিভারে জমে যায়। ধীরে ধীরে লিভার কালচে বা blackish হয়ে যায়।

ছবিঃ Radiopaedia / PathologyOutlines / medical atlas
এখন প্রশ্ন এটা কি বিপজ্জনক? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে না। লিভারের কাজ প্রায় স্বাভাবিকই থাকে। শুধু হালকা জন্ডিস হতে পারে। তাই রোগী অনেক সময় বড় কোনো অসুবিধা ছাড়াই জীবন যাপন করতে পারে।
একটা সহজ উদাহরণ ধরুন। একটা শহরে ময়লা ফেলার ট্রাক মাঝে মাঝে দেরি করছে, ফলে কিছু জায়গায় ময়লা জমে যাচ্ছে। শহরটা একটু নোংরা দেখাচ্ছে, কিন্তু শহরের জীবন থেমে যায়নি। Dubin–Johnson syndrome-এ লিভারের অবস্থাও অনেকটা তেমন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো differential diagnosis (একই লক্ষণ কিন্তু ভিন্ন রোগ)। কারণ conjugated bilirubin বাড়লে সাধারণত obstructive jaundice (পিত্তনালি বন্ধ হয়ে যাওয়া) ভাবা হয়। কিন্তু এখানে কোনো blockage নেই, শুধু transporter সমস্যা।
এই রোগ আমাদের শেখায় শরীরের সব সমস্যা সবসময় ভয়ংকর না। কখনো কখনো ছোট molecular defect (ছোট প্রোটিন বা পাম্পের সমস্যা) পুরো ছবিটা বদলে দেয়, কিন্তু জীবন থেমে যায় না।
আপনি যখন হালকা হলুদ চোখ দেখেন, সেটা সবসময় বিপদের সংকেত না-ও হতে পারে। কখনো সেটা হতে পারে শরীরের এক অদ্ভুত কিন্তু তুলনামূলকভাবে harmless ভিন্নতা।
Dubin–Johnson syndrome মনে করিয়ে দেয় শরীর শুধু রোগের গল্প না, এটা বৈচিত্র্যেরও গল্প। কখনো সেই বৈচিত্র্য চোখে ধরা পড়ে হলুদ রঙে, আবার কখনো লুকিয়ে থাকে এক কালো লিভারের নীরব ভেতরে।
মো. ইফতেখার হোসেন
এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ |
আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Leave a comment