কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাতথ্যপ্রযুক্তিতথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক খবর

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রঙিন বেলুন: ফাটতে চলেছে কি?

Share
Share

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI নিয়ে একটি লেকচার শেষ হয়েছে। একজন নামকরা প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও সায়েন্স ফিকশন লেখক মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন। এমন সময় দর্শকদের মধ্য থেকে এক আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্র ভয়ে ভয়ে একটি প্রশ্ন করলো:

“তাহলে আপনি বলছেন, শেয়ার বাজারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মাত্র সাতটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল, যাদের লাভজনক হওয়ার কোনো পথই নেই? আর এটা এমন এক বুদবুদ (Bubble) যা যেকোনো মুহূর্তে ফেটে গিয়ে পুরো অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেবে?”

লেখক শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, ঠিক তাই।”

ছাত্রটি আবার জিজ্ঞেস করলো, “তাহলে আমরা এ নিয়ে কী করতে পারি?”

এই কথোপকথনটি কোনো কাল্পনিক গল্প নয়। এটি ঘটেছে বিখ্যাত লেখক ও প্রযুক্তি সমালোচক করি ডক্টরো (Cory Doctorow)-এর সাথে। আর তার উত্তরটি আমাদের এক ভয়ংকর ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রঙিন মোড়কের আড়ালে তৈরি হচ্ছে।

কে এই করি ডক্টরো? করি ডক্টরো কেবল একজন কল্পবিজ্ঞান লেখকই নন, তিনি একজন দূরদর্শী প্রযুক্তি সাংবাদিক। প্রযুক্তি দুনিয়ার বড় বড় কর্পোরেশন আর আমাদের সমাজের ওপর তার প্রভাব নিয়ে তিনি যেভাবে বিশ্লেষণ করেন, তা প্রায়শই নির্ভুল প্রমাণিত হয়। প্রযুক্তির নামে বড়লোকদের আধিপত্য কিংবা “এনশিটিফিকেশন” (Enshittification – অর্থাৎ, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যেভাবে ধীরে ধীরে তাদের সেবার মান কমিয়ে ব্যবহারকারীদের জন্য প্ল্যাটফর্মকে অসহ্য করে তোলে) নিয়ে তার লেখাগুলো প্রযুক্তি বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তাই যখন তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্প নিয়ে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করেন, তখন তা উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।

অর্থনৈতিক বুদবুদ বা ‘বাবল’ জিনিসটা কী? ডক্টরো যে ‘বাবল’ বা বুদবুদের কথা বলছেন, সেটি অর্থনীতির একটি পরিচিত বিপদ। ভাবুন তো, একটি সাবানের বুদবুদ দেখতে কত সুন্দর আর বড় মনে হয়, কিন্তু ভেতরে আসলে ফাঁপা। সামান্য আঘাতেই ফেটে মিলিয়ে যায়।

অর্থনীতিতেও ঠিক এমনটাই ঘটে। যখন কোনো একটি সম্পদ বা প্রযুক্তির দাম তার আসল মূল্যের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায় শুধু প্রচার, জল্পনা আর মানুষের অতি-আগ্রহের কারণে, তখন তাকে ‘বাবল’ বলে। একটা সময় এই বুদবুদ ফেটে যায়, এবং যারা এতে বিনিয়োগ করেছিল, তারা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। ডক্টরোর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন ঠিক এমনই এক বিশাল বুদবুদে পরিণত হয়েছে।

কেন এই ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণী? ডক্টরোর বিশ্লেষণ খুবই পরিষ্কার। তিনি বলছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাতটি প্রযুক্তি কোম্পানি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এর পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। এই কোম্পানিগুলোর বিকাশ এক প্রকার থেমে গিয়েছিল, তাই বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করার জন্য তাদের নতুন কোনো ‘জাদুর কাঠি’র দরকার ছিল। সেই জাদুর কাঠিই হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

তারা বিনিয়োগকারীদের একটি গল্প শোনাচ্ছে: “আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আপনার সব কর্মীদের কাজ একাই করে দেবে। তাই কর্মী ছাঁটাই করে আমাদের প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করুন!”

কিন্তু বাস্তবতা কী? ডক্টরো একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন যা চমকে দেওয়ার মতো। প্রায় ৯৫ শতাংশ কোম্পানি, যারা কর্মী ছাঁটাই করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে, তারা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসলে মানুষের মতো সূক্ষ্ম ও সৃজনশীল কাজ করতে পারে না।

ডক্টরো একটি বিখ্যাত উক্তি করেছেন:

“কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আপনার চাকরিটা কেড়ে নিতে পারবে না, কিন্তু একজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেলসম্যান আপনার বসকে এটা বিশ্বাস করাতে পারবে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আপনার কাজটি করতে সক্ষম। এরপর আপনার বস আপনাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বসাবে যা আসলে আপনার কাজটি করতেই পারে না।”

ফলাফল? যখন এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বুদবুদ ফেটে যাবে, তখন কোম্পানিগুলো দেখবে তাদের কোটি কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। তারা হয়তো তখন খরুচে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলো বন্ধ করে দেবে। কিন্তু ততদিনে আপনি চাকরি হারিয়ে ফেলেছেন, আপনার কাজটি করার জন্য আর কেউ থাকবে না এবং সমাজ ও অর্থনীতি দুটোই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ডক্টরো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-কে তুলনা করেছেন অ্যাসবেস্টসের (Asbestos) সাথে। অ্যাসবেস্টস একসময় ঘরবাড়ি বানানোর জন্য জাদুর মতো একটি উপাদান হিসেবে পরিচিত ছিল। এটি আগুনরোধী এবং খুব সস্তা ছিল। সবাই নিজেদের বাড়ির দেয়ালে এটি ব্যবহার করতে শুরু করে। কিন্তু বহু বছর পর জানা গেল, অ্যাসবেস্টসের কণা নিঃশ্বাসের সাথে ফুসফুসে গেলে ভয়ংকর ক্যান্সার সৃষ্টি করে। এখন সেই দেয়াল থেকে অ্যাসবেস্টস সরাতে পৃথিবীর সব দেশকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হচ্ছে।

ডক্টরো বলছেন:

“কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো সেই অ্যাসবেস্টস যা আমরা আজ আমাদের সমাজের দেয়ালে গেঁথে দিচ্ছি। আর আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই দেয়াল খুঁড়ে তা পরিষ্কার করতে হবে।”

তাহলে সমাধান কী? ডক্টরোর মতে, এই বিপর্যয় থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো যত দ্রুত সম্ভব এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বুদবুদ ফাটিয়ে দেওয়া। আর তা করার সেরা উপায় হলো সত্যটা সবার সামনে তুলে ধরা। আমাদের সবাইকে বুঝতে এবং বোঝাতে হবে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চাকরির বিকল্প নয়। এটি কিছু কাজে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু মানুষের সৃজনশীলতা, বুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প হতে পারে না।

পরিশেষে বলবো, সায়েন্স ফিকশন সিনেমায় আমরা দেখি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একদিন নিজে থেকে সচেতন হয়ে উঠবে, পৃথিবী দখল করবে আর মানুষকে কাগজের ক্লিপে পরিণত করবে। কিন্তু করি ডক্টরো আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, আসল বিপদটা অত কাল্পনিক নয়। আসল বিপদ হলো কিছু অতি-ধনী বিনিয়োগকারী আর প্রযুক্তি কোম্পানির লোভ, যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এর নামে একটি মিথ্যা গল্প বিক্রি করে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের ধ্বংস করতে আসবে না, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া এই অর্থনৈতিক উন্মাদনা আমাদের অনেককেই হয়তো আরও গরিব বানিয়ে ছাড়বে। তাই এখন থেকেই প্রযুক্তিকে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে, এর পেছনের সত্যটা জানা আমাদের সবার জন্য জরুরি।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org