আধুনিক বীজগণিতের জন্ম: খারেজমির ‘আল-জবর আল-মুকাবিলা’ ও সংখ্যার নতুন ভাষা
আজ আমরা যে অ্যালজেব্রা বা বীজগণিত ব্যবহার করি—সমীকরণ সমাধান, অজানা রাশি বের করা, বাস্তব সমস্যাকে গণিতের ভাষায় প্রকাশ করা—এই পুরো পদ্ধতির ভিত্তি গড়ে উঠেছিল প্রায় বারোশো বছর আগে। সেই ঐতিহাসিক ভিত্তিগ্রন্থটির নাম মুহাম্মদ ইবনে মূসা আল-খারেজমি রচিত ‘আল-কিতাব আল-মুখতাসার ফি হিসাব আল-জবর ওয়াল-মুকাবিলা’—সংক্ষেপে পরিচিত ‘আল-জবর আল-মুকাবিলা’। এই বইটির নাম থেকেই এসেছে আজকের বহুল ব্যবহৃত শব্দ “Algebra”।
নবম শতকের শুরুতে বাগদাদের “বাইতুল হিকমা” বা জ্ঞানকেন্দ্রে কাজ করার সময় খারেজমি এই গ্রন্থটি রচনা করেন। সে সময় আব্বাসীয় খেলাফতের পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রিক, ভারতীয় ও পারস্য জ্ঞানভাণ্ডার অনুবাদ ও সংকলনের মাধ্যমে এক নতুন বৈজ্ঞানিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ‘আল-জবর আল-মুকাবিলা’ সেই পরিবেশেরই ফল—যেখানে গণিতকে কেবল তাত্ত্বিক চর্চা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার সমাধানের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়েছে।
এই গ্রন্থের মূল অবদান হলো সমীকরণ সমাধানের একটি পদ্ধতিগত কাঠামো তৈরি করা। খারেজমি প্রথমবারের মতো সমীকরণকে শ্রেণিবদ্ধ করেন এবং ধাপে ধাপে সমাধানের নিয়ম দেখান। ‘আল-জবর’ বলতে বোঝানো হয়েছে সমীকরণের এক পাশ থেকে ঋণাত্মক পদ সরিয়ে ধনাত্মক করা, আর ‘আল-মুকাবিলা’ মানে সমীকরণের দুই পাশে সমজাতীয় পদ সমান করে ফেলা। আজকের ভাষায় এগুলোই হলো সমীকরণ “সরলীকরণ” ও “সমতুল্যকরণ”-এর প্রাথমিক রূপ। যদিও আধুনিক অ্যালজেব্রার মতো প্রতীকী নোটেশন তখনো ব্যবহৃত হয়নি, তবু শব্দের মাধ্যমে সমীকরণ সমাধানের যে পদ্ধতি তিনি দাঁড় করান, সেটিই পরবর্তীতে প্রতীকী বীজগণিতের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
খারেজমির গণিত কেবল শ্রেণিকক্ষের জন্য লেখা ছিল না। তাঁর বইতে উত্তরাধিকার বণ্টন, জমির পরিমাপ, ব্যবসায়িক হিসাব, সুদ গণনা—এমন বাস্তব জীবনের সমস্যার উদাহরণ দিয়ে দেখানো হয়েছে কীভাবে অ্যালজেব্রা কাজে লাগে। এতে বোঝা যায়, গণিতকে তিনি একটি ব্যবহারিক বিজ্ঞান হিসেবে দেখেছিলেন, যা সমাজের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও কার্যকর করতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক প্রয়োগমূলক গণিতের ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।
পরবর্তীকালে ‘আল-জবর আল-মুকাবিলা’ ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়ে ইউরোপে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই গ্রন্থটি গণিত শিক্ষার মূল পাঠ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শুধু “অ্যালজেব্রা” শব্দটিই নয়, খারেজমির নাম থেকে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ—Algorithm (অ্যালগরিদম), যা আজকের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিত্তি। এভাবে প্রাচীন ইসলামি জ্ঞানচর্চা আধুনিক ডিজিটাল যুগের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তিতেও ছাপ রেখে গেছে।
আজকের দিনে অ্যালজেব্রা মানে জটিল সমীকরণ, ম্যাট্রিক্স বা বিমূর্ত গাণিতিক কাঠামো। কিন্তু সেই দীর্ঘ যাত্রার শুরুটা হয়েছিল খারেজমির মতো চিন্তাবিদদের হাত ধরে। ‘আল-জবর আল-মুকাবিলা’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সংখ্যার ভাষা কেবল গণিতবিদদের খেলাঘর নয়; বরং মানবসভ্যতার প্রশাসন, বাণিজ্য ও বিজ্ঞানের অগ্রগতির এক মৌলিক হাতিয়ার। এই গ্রন্থের মাধ্যমে খারেজমি যে বীজ বপন করেছিলেন, তার ফল আজও আমাদের প্রতিদিনের প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে।

Leave a comment