উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগবিজ্ঞান লেখক

“আমাদের গবেষণাকে দেশের প্রয়োজনের সাথে মিলিয়ে ভাবতে হবে” — ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদ

Share
Share

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে গবেষণার গুরুত্ব নিয়ে কথা উঠলেই প্রায়শই দুটি প্রশ্ন সামনে আসে—আমাদের কি এত বড় পরিসরের গবেষণায় বিনিয়োগ করা সম্ভব, আর গবেষণার ফল আদৌ কি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে? ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য এই দুই প্রশ্নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাস্তবতার কথা বলে: “আমাদের গবেষণাকে দেশের প্রয়োজনের সাথে মিলিয়ে ভাবতে হবে।” এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দেশের গবেষণা-দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।

অনেক সময় গবেষণার বিষয় নির্ধারণ করা হয় আন্তর্জাতিক প্রবণতা দেখে—কোন বিষয়টি এখন বিশ্বব্যাপী আলোচনায়, কোন জার্নালে কোন ধরনের গবেষণা বেশি প্রকাশিত হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া সহজ হতে পারে, কিন্তু দেশের বাস্তব সমস্যাগুলো পেছনে পড়ে যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো এখনো খাদ্য নিরাপত্তা, বিশুদ্ধ পানির সংকট, পরিবেশ দূষণ, জনস্বাস্থ্য এবং নগরায়নের চাপ। এসব সমস্যার সমাধানে বৈজ্ঞানিক গবেষণা সরাসরি অবদান রাখতে পারে। ড. আশরাফউদ্দিন মনে করেন, গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণে এসব বাস্তব সমস্যাকে কেন্দ্রে রাখতে হবে।

এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গবেষণার ফলাফল কীভাবে সমাজে প্রয়োগ করা যাবে। গবেষণাগারে তৈরি কোনো নতুন প্রযুক্তি যদি মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে তার সামাজিক প্রভাব সীমিত হয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়—কৃষিতে নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবন বা সাশ্রয়ী মূল্যের পানিশোধন পদ্ধতি। গবেষণা যদি কেবল প্রবন্ধে সীমাবদ্ধ থাকে, আর মাঠে তার প্রয়োগ না হয়, তাহলে গবেষণার প্রকৃত লক্ষ্য পূরণ হয় না। ড. আশরাফউদ্দিনের মতে, গবেষণার সঙ্গে প্রয়োগের সেতুবন্ধন তৈরি করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এখানে নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা তহবিল বণ্টনের সময় কেবল আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং বা উচ্চ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের দিকে তাকালে স্থানীয় সমস্যা উপেক্ষিত হয়। বরং গবেষণা নীতিতে এমন প্রণোদনা থাকা প্রয়োজন, যা গবেষকদের দেশের জরুরি সমস্যাগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কৃষি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতের বাস্তব কাজের সংযোগ তৈরি হলে গবেষণার ফল দ্রুত সমাজে পৌঁছাতে পারে।

ড. আশরাফউদ্দিনের বক্তব্য তরুণ গবেষকদের জন্যও একটি দিকনির্দেশনা। অনেক শিক্ষার্থী গবেষণার বিষয় বাছাইয়ের সময় কেবল “ট্রেন্ডিং” বিষয়কে গুরুত্ব দেয়, কারণ সেগুলোতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া সহজ হয়। কিন্তু দেশের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত গবেষণা শুধু সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়; দীর্ঘমেয়াদে এটিই একটি দেশের বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা গড়ে তোলে। স্থানীয় সমস্যার সমাধানে কাজ করতে গিয়ে গবেষকরা নতুন নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হন, যা আবার বৈশ্বিক গবেষণাকেও সমৃদ্ধ করে।

সবশেষে বলা যায়, গবেষণাকে দেশের প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে ভাবা মানে গবেষণার মান কমানো নয়; বরং গবেষণাকে আরও অর্থবহ করা। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের অভিজ্ঞতা দেখায়—বিশ্বের সেরা গবেষণাগারে কাজ করেও দেশের বাস্তব সমস্যার কথা মাথায় রেখে গবেষণার দর্শন গড়ে তোলা সম্ভব। এই দৃষ্টিভঙ্গিই বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য টেকসই বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির পথ দেখাতে পারে।

ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org