গবেষণায় হাতে খড়ি

টেবিল আর গ্রাফ দিয়ে বোঝা যায় দেশ, রোগ আর ভবিষ্যৎ

Share
Share

একজন গবেষক কাগজের ওপর সারি সারি সংখ্যা লেখেন। পাশে বসা আরেকজন তা দেখে হাই তোলে। প্রথমজন বলেন, “এগুলোতেই তো সত্য লুকিয়ে আছে।” কিন্তু প্রশ্ন হলো—কার জন্য লুকিয়ে? আধুনিক গবেষণার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা আজ ডেটার অভাব নয়, বরং ডেটার ভাষা না জানা। টেবিল আর গ্রাফ কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়; এগুলো বাস্তবতা অনুবাদের যন্ত্র। একটি ভালো ভিজ্যুয়ালাইজেশন হাজার শব্দের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে।

ভাবুন, একজন চিকিৎসককে বললেন—ডেঙ্গুর রোগী বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। তিনি মাথা নাড়ালেন। কিন্তু যখন একই তথ্য একটি লাল রঙের ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফে দেখালেন, তখন তার কপালে ভাঁজ পড়ল। কারণ গ্রাফ শুধু তথ্য দেয় না, তা অনুভূতি তৈরি করে। মানুষের সিদ্ধান্ত সংখ্যা দিয়ে নয়, দৃশ্য দিয়ে বদলায়। এটাই ভিজ্যুয়ালাইজেশনের সত্যিকারের শক্তি।

বিশ্ব এখন ডেটার সাগরে ডুবে আছে। Statista-এর সবশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গড়ে প্রতিদিন বিশ্বে ৩২৮ মিলিয়ন টেরাবাইট ডেটা তৈরি হয়। অথচ মানুষের মস্তিষ্ক একসঙ্গে গড়ে সাতটির বেশি সংখ্যাকে সচেতনভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে না, বলছে কগনিটিভ সায়েন্স। অর্থাৎ ডেটা যত বেড়েছে, বোঝার ক্ষমতা তত বাড়েনি। এই ব্যবধান পূরণ করে গ্রাফ, চার্ট আর ড্যাশবোর্ড। যেখানে মানুষের চোখ যেভাবে পরিবর্তন বোঝে, মস্তিষ্ক সেই পথেই সিদ্ধান্ত নেয়।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে ডেটা উপস্থাপনা ভিজ্যুয়ালি পরিষ্কার, সেই গবেষণা অন্য গবেষণার তুলনায় তিন গুণ বেশি উদ্ধৃত হয়। অর্থাৎ ভালো ভিজ্যুয়ালাইজেশন মানে শুধু সৌন্দর্য নয়, এটি গবেষণার গ্রহণযোগ্যতার মুদ্রা। ন্যাচার, সায়েন্স বা দ্য ল্যানসেট খুলে দেখুন—প্রতিটি উল্লেখযোগ্য পেপারের প্রাণ লুকিয়ে আছে তার গ্রাফে। অনেক সময় একটি চার্ট পড়ে পাঠক সিদ্ধান্ত নেয়, পুরো পেপার পড়বে কি না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আরও তীক্ষ্ণ। আমাদের সরকারি প্রতিবেদন সংখ্যা দিয়ে ভরা, কিন্তু বোঝার মতো ভিজ্যুয়াল কম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বছরে শত শত রিপোর্ট প্রকাশ করে। কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগই টেবিলভিত্তিক, বিশ্লেষণহীন। অর্থনীতিবিদরা জানেন, নীতিনির্ধারকেরা সংখ্যা পড়ে সিদ্ধান্ত নেন না, তারা ট্রেন্ড দেখে সিদ্ধান্ত নেন। আর ট্রেন্ড বোঝায় লাইন চার্ট, রং কোড, হিটম্যাপ।

এখানেই ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন একটি নৈতিক বিষয় হয়ে ওঠে। ভুল গ্রাফ মানে ভুল সিদ্ধান্ত। একটি স্কেল ভুল হলে একটি দেশের বাজেট বদলে যেতে পারে। একটি বার চার্টে রঙ বাছাই ভুল হলে একটি রোগের গুরুতরত্ব হালকা মনে হতে পারে। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের CDC স্বীকার করেছিল, প্রাথমিক করোনা ড্যাশবোর্ডে রঙ ব্যবহারের বিভ্রান্তিতে অনেক রাজ্য ঝুঁকি কম ভেবেছিল। রঙ বদলানোর পরই জনসচেতনতা বেড়েছে।

এটা শুধু নকশার প্রশ্ন নয়, এটি নৈতিকতার প্রশ্ন।

বাংলাদেশে আজ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মানচিত্র আর নদীভাঙনের ডেটা গ্রাফিক্সে রূপ না পেলে, মানুষ বিপদ বোঝে না। একটি গ্রামে বন্যার ক্ষতির সংখ্যার চেয়ে একটি টাইমলাইন বেশি শক্তিশালী। একটি শিশুর অপুষ্টির হারের চেয়ে একটি তাপচিত্র বেশি কার্যকর। ডেটা যদি গল্প না বলে, সমাজ নড়বে না।

তবু আমরা গ্রাফ তৈরি করি যেমন-তেমন। ভুল স্কেল, থ্রিডি পাই চার্ট, অযথা ডিজাইন। যেন সত্য ঢেকে দেওয়ার প্রতিযোগিতা। অথচ একজন ভালো গবেষক জানেন, ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন মানে সত্যকে দৃশ্যমান করা। এখানে নান্দনিকতার চেয়ে সত্য বড়।

Harvard Business Review-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, সিদ্ধান্তগ্রহণে গ্রাফ-নির্ভর দলগুলো অন্যদের চেয়ে ২৮ শতাংশ বেশি সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়। McKinsey-এর রিপোর্ট বলছে, ডেটা ভালোভাবে ভিজ্যুয়ালাইজ করা হলে প্রতিষ্ঠানের কর্মক্ষমতা গড়ে ২০ শতাংশ বাড়ে। অর্থাৎ টেবিল আর গ্রাফ মানে শিল্প নয়, এটি উৎপাদনশীলতা।

বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এই বদল আসছে। bKash-এর ড্যাশবোর্ড এখন কেবল টাকা নয়, মানুষের লেনদেনের মানচিত্র। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ড্যাশবোর্ড এখন শুধু সংখ্যা বলে না, বলে রোগের বিস্তার। সমস্যা হলো, এই কাজগুলোর অধিকাংশই বিদেশি কনসালট্যান্টরা করে। কারণ আমাদের তরুণেরা গ্রাফ আঁকে, কিন্তু ভিজ্যুয়াল ভাষা বোঝে না।

ভিজ্যুয়াল ভাষা মানে কী? মানে আপনি জানেন কোন গ্রাফ বিশ্বাসযোগ্য, কোনটা বিভ্রান্তিকর। মানে আপনি বোঝেন কেন একটি বারের উচ্চতা মানুষকে মানসিকভাবে প্রতিক্রিয়ায় ফেলে। মানে আপনি বোঝেন কেন লাল রঙ বিপদ বোঝায়। এটি মনোবিজ্ঞান, নকশা আর গণিতের মিলিত জায়গা।

একজন গবেষক যদি এই জায়গাটায় দাঁড়াতে পারেন, তিনি কেবল গবেষণা করেন না, তিনি জনমত তৈরি করেন।

আজ যে গবেষক গ্রাফ বুঝে, সে আগামীকালের নীতিনির্ধারককে বোঝায়।

এখানে প্রশ্ন উঠে—আমরা কি কেবল ফলাফল ছাপব, না বাস্তবতা দেখাব? আমরা কি সংখ্যা জমাব, না অর্থ তৈরি করব? গবেষণা যদি মানুষকে না নাড়িয়ে, তবে তা কাগুজে বিদ্যা হয়ে থাকে।

বিশ্ব এগিয়ে গেছে “visual thinking”-এ। আমরা এখনও আটকে আছি “visual decoration”-এ।

এর ফল আমরা পাই বাজেট আলোচনায়, পাবলিক হেলথ পলিসিতে, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে। বিজ্ঞান যেখানে দৃশ্যমান নয়, সেখানে সমাজ উদাসীন। কারণ মানুষ আগে দেখে, পরে বোঝে।

সুতরাং যারা গবেষণায় ঢুকছেন, তাদের উদ্দেশে একটিই অনুরোধ—গ্রাফ আঁকবেন না, গ্রাফ ভাববেন। টেবিল বানাবেন না, টেবিল বলবেন। ডেটা সাজাবেন না, ডেটা প্রকাশ করবেন।

ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী কেবল সংখ্যার হিসাব করেন না, তিনি মানুষের চেতনায় চিহ্ন আঁকেন।

আর সেই চিহ্ন লেখা হয় টেবিল, গ্রাফ আর ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশনের ভাষায়।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org