একটা শিশু পৃথিবীতে আসে চোখ খুলে নয়, অনুভূতির ভেতর দিয়ে। তার কাছে ভাষা পরে আসে, আগে আসে আবহ, ঘরের বাতাসের চাপ, কণ্ঠের কম্পন, মুখের সূক্ষ্ম পরিবর্তন। সে বোঝে না “কী বলা হলো”, সে বোঝে “কেমন লাগছে”। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান এই অভিজ্ঞতাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলে, মানুষের মস্তিষ্কে এমন এক জৈবিক ব্যবস্থা আছে, mirror neuron system, যা অন্যের আচরণ ও আবেগকে নিজের ভেতরে প্রতিফলিত করে। অর্থাৎ, মা যদি চুপচাপ থেকেও ভেতরে অস্থির থাকেন, সেই অস্থিরতা শব্দের আগেই শিশুর স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে যায়। এই প্রতিফলনের কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেয় লিম্বিক সিস্টেম, বিশেষ করে amygdala, যা ভয়, নিরাপত্তা আর আবেগগত অর্থ তৈরির কাজে নিয়োজিত।
এ কারণেই একটি ঘর কখনোই “নিরপেক্ষ” থাকে না। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও, ভেতরে যদি চাপা টানাপোড়েন থাকে, শিশুর দেহে একধরনের অদৃশ্য সতর্কতা চালু হয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় emotional contagion, আবেগের সংক্রমণ। এটি কেবল রূপক নয়; গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিনের চাপা উত্তেজনা শিশুর শরীরে স্ট্রেস-হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যার প্রভাব পড়ে তার মস্তিষ্কের বিকাশে। অর্থাৎ, যে আবেগ আমরা লুকিয়ে রাখতে চাই, তা হারিয়ে যায় না, তা নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ে, এবং সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল সত্তাটি সেটি গ্রহণ করে।

ছবি: ‘’প্রতিদিনের বাংলাদেশ” এর আর্কাইভ হতে নেয়া।
এই জায়গাতেই এসে অনেক বাবা-মা একটি ভুল ধারণার মধ্যে আটকে যান, শিশুর সামনে সবসময় হাসিখুশি থাকা মানেই তাকে সুরক্ষিত রাখা। কিন্তু শিশুর মস্তিষ্ক “পারফেকশন” খোঁজে না, সে খোঁজে “সামঞ্জস্য”। তার ভেতরের অনুভূতি আর বাইরের দৃশ্যের মধ্যে যদি ফাঁক তৈরি হয়, তখন তার মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হয়। এই বিভ্রান্তিকে ব্যাখ্যা করতে ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজির একটি বড় ধারণা, attachment theory, যার পথপ্রদর্শক John Bowlby, বলছে, শিশুর জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো এমন একটি সম্পর্ক যেখানে যত্নদানকারী ব্যক্তি আবেগে সত্য, প্রতিক্রিয়ায় ধারাবাহিক, এবং উপস্থিতিতে নিরাপদ। যদি বাবা-মা বারবার এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করেন যেখানে বাইরে হাসি, ভেতরে চাপা অস্থিরতা, তাহলে শিশুর ভেতরে একটি নীরব সিদ্ধান্ত জন্ম নেয়, অনুভূতি বিশ্বাসযোগ্য নয়।
কিন্তু এর মানে এই নয় যে শিশুর সামনে সব আবেগ উজাড় করে দিতে হবে। বরং প্রশ্নটা বদলে যায়, আবেগ কীভাবে উপস্থিত হচ্ছে। যখন একজন বাবা বলেন, “আমি এখন একটু রেগে আছি, তাই একটু চুপ থাকব”, তখন তিনি শুধু নিজের অবস্থা জানাচ্ছেন না, তিনি একটি স্নায়ুবৈজ্ঞানিক শিক্ষা দিচ্ছেন। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় emotional regulation, নিজের অনুভূতিকে চিহ্নিত করা, তার জায়গা দেওয়া, এবং তাকে ভেঙে পড়ার বদলে ধারণ করা। এই ছোট বাক্যগুলো শিশুর মস্তিষ্কে নতুন সংযোগ তৈরি করে, অ্যামিগডালার তীব্র প্রতিক্রিয়া আর প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে একটি সেতু গড়ে ওঠে। ফলাফল, সে শিখে ফেলে, রাগ মানেই বিস্ফোরণ নয়, দুঃখ মানেই ভেঙে পড়া নয়।
এই শেখার আরেকটি স্তর আছে, যাকে বলা হয় co-regulation। জীবনের শুরুতে শিশু নিজে নিজের আবেগ সামলাতে পারে না, সে অন্যের স্নায়ুতন্ত্র ধার নেয়। যখন মা শান্ত কণ্ঠে বলে, “আজ আমার মনটা একটু খারাপ, আমি একটু বিশ্রাম নেব”, তখন শিশুর শরীরও ধীরে ধীরে শান্ত হয়। এই ধার নেওয়া নিয়ন্ত্রণই একসময় তার নিজের হয়ে যায়। ঠিক এখানেই তৈরি হয় “emotional labeling”, আবেগকে নাম দিয়ে চেনা, যা ভবিষ্যতের আবেগ-জ্ঞান বা emotional intelligence-এর ভিত্তি।
অন্যদিকে, যখন বারবার আবেগ চেপে রাখা হয়, তখন তৈরি হয় এক ধরনের অভ্যন্তরীণ চাপ, যাকে বলা হয় emotional suppression। গবেষণা বলছে, এই দমন করা আবেগ শরীরের অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসে, কখনো অকারণ উদ্বেগ হিসেবে, কখনো অদ্ভুত শারীরিক উপসর্গ হিসেবে, কখনো সম্পর্কের মধ্যে অকারণ দূরত্ব হিসেবে। কারণ আবেগ কোনো শত্রু নয়, যাকে দমন করলে হারিয়ে যাবে; এটি একধরনের সংকেত, যাকে না শুনলে তা আরও জোরে ফিরে আসে।
শিশু শেখে পর্যবেক্ষণ করে, এই সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করেছে Albert Bandura-এর social learning theory। আপনি কী বললেন, তা নয়; আপনি কীভাবে বাঁচলেন, সেটাই তার পাঠ্যপুস্তক। আপনি যদি দেখান যে রাগকে চেপে রাখতে হয় এবং পরে বিস্ফোরিত হতে হয়, সে সেটাকেই স্বাভাবিক মনে করবে। আপনি যদি দেখান যে দুঃখকে অস্বীকার করতে হয়, সে নিজের দুঃখকেও অস্বীকার করবে। আর আপনি যদি দেখান যে আবেগ আছে, কিন্তু তার ভেতরেও স্থির থাকা যায়, সে সেটাকেই জীবনধারা হিসেবে গ্রহণ করবে।
সবকিছু মিলিয়ে প্রশ্নটা “দেখাবো কি দেখাবো না” এই জায়গায় থেমে থাকে না। প্রশ্নটা রূপ নেয় “কীভাবে দেখাবো, কতটা সত্য হবো, কতটা ধারণ করতে পারবো”। কারণ একটি শিশু তার পরিবেশের কপি নয়, সে তার পরিবেশের ব্যাখ্যা হয়ে ওঠে। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, বিশেষ করে longitudinal attachment ও emotion development স্টাডিগুলো দেখায় যে যেসব শিশু এমন পরিবেশে বড় হয় যেখানে আবেগকে স্বীকার করা হয় কিন্তু নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রকাশ করা হয়, তাদের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স ও লিম্বিক সিস্টেমের মধ্যে সংযোগ আরও দক্ষভাবে গড়ে ওঠে, তারা পরবর্তীতে সম্পর্ক, সিদ্ধান্ত এবং মানসিক স্থিতিতে বেশি সুসংগঠিত হয়। অন্যদিকে, যেখানে আবেগ লুকানো বা অস্বীকার করা হয়, সেখানে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, উদ্বেগ এবং আবেগগত অস্পষ্টতা বেশি দেখা যায়। তাই একটি শিশু কেবল পরিবেশের প্রতিফলন নয়, সে সেই পরিবেশের স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ফলাফলও বহন করে, আর সেই ফলাফল নির্ধারিত হয় আমরা তাকে কেমন আবেগের ভাষা শিখিয়েছি তার উপর।
মো. ইফতেখার হোসেন
এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ |
আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Leave a comment