বিজ্ঞান ও একাডেমিক নেতৃত্বে অনেক সময় একজন ব্যক্তির জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকেই সাফল্যের মূল ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু দীর্ঘ গবেষণা-জীবন ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে ডক্টর মোহাম্মদ আতাউল করিম এক ভিন্ন বাস্তবতায় পৌঁছেছেন। তাঁর স্পষ্ট উপলব্ধি—“আমি সব জানি না—দলগত অভিজ্ঞতার ওপরই নির্ভর করি।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি আধুনিক নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিকে তুলে ধরেন: নম্রতা ও সমষ্টিগত জ্ঞানের প্রতি আস্থা।
ডক্টর করিমের গবেষণাক্ষেত্র ছিল বহুমাত্রিক—অপটিক্স, ইলেকট্রনিক্স, অপটিক্যাল কম্পিউটিং, নাইট ভিশন ডিসপ্লে ইত্যাদি। এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে গভীর প্রযুক্তিগত জটিলতা। একজন মানুষের পক্ষে সব বিষয়ে সমান দক্ষ হওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর অভিজ্ঞতায়, বড় গবেষণা প্রকল্পে প্রকৌশলী, পদার্থবিজ্ঞানী, কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং প্রয়োজনে ব্যবসা ও আইনি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয় প্রয়োজন হয়। তাই তিনি নিজেকে সর্বজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেননি; বরং সঠিক মানুষদের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে নিজের সীমাবদ্ধতাকে শক্তিতে রূপান্তর করেছেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। একাডেমিক প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকে গবেষণা তহবিল বণ্টন, নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠা, শিক্ষক নিয়োগসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে তিনি দলগত আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বিভিন্ন বিভাগের অভিজ্ঞ মানুষের মতামত শোনা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ করা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিয়ে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে ভাবা—এই পদ্ধতিই তাঁর নেতৃত্বের মূলনীতি ছিল। এর ফলে সিদ্ধান্তগুলো ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি যৌথ বোধের প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
বাংলাদেশের তরুণ গবেষক ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বস্থানীয়দের জন্য এই দর্শনের তাৎপর্য গভীর। অনেক সময় আমরা মনে করি একজন ভালো নেতা বা বিজ্ঞানী মানে সব প্রশ্নের উত্তর জানা ব্যক্তি। এই ধারণা তরুণদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করে এবং ভুল করার ভয় বাড়ায়। ডক্টর করিমের বক্তব্য আমাদের শেখায়, না জানাটাই স্বাভাবিক; গুরুত্বপূর্ণ হলো শেখার মানসিকতা ও অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হওয়ার ইচ্ছা। যখন একজন নেতা নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেন, তখন দলসদস্যরাও নিজেদের মতামত প্রকাশে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এতে করে একটি উন্মুক্ত ও সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি হয়।
এই দর্শন গবেষণার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো গবেষণা সমস্যার সমাধানে দলগত আলোচনা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দেয়। এক জনের চোখে যে বিষয়টি ধরা পড়ে না, অন্য জনের অভিজ্ঞতায় তা স্পষ্ট হতে পারে। ডক্টর করিমের মতে, এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাই আধুনিক গবেষণার শক্তি।
শেষ পর্যন্ত “আমি সব জানি না—দলগত অভিজ্ঞতার ওপরই নির্ভর করি”—এই উক্তি নেতৃত্বের এক মানবিক রূপ তুলে ধরে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জ্ঞান কোনো ব্যক্তির একক সম্পদ নয়; বরং সমষ্টিগত প্রয়াসেই জ্ঞান পূর্ণতা পায়।
ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment