অনেক সময় শিক্ষার্থীরা ভাবেন, কোনো একটি পর্যায়ের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ যদি সরাসরি বর্তমান কাজের সঙ্গে মিলে না যায়, তবে সেটি বোধহয় অপ্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের গবেষণাজীবনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। তাঁর ভাষায়, “যা শিখেছি—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান, NIH—সবই পরে কাজে লেগেছে।” এই বক্তব্য শেখার ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োকেমিস্ট্রির শিক্ষক হিসেবে কাজ করার সময় তিনি মৌলিক বিজ্ঞানচর্চার ভিত তৈরি করেন। সেখানে প্রোটিন, এনজাইম, বিপাকক্রিয়া—এসব বিষয়ের তাত্ত্বিক ভিত্তি তাঁর কাছে শুধু পরীক্ষার বিষয় ছিল না; এগুলো হয়ে ওঠে ভবিষ্যৎ গবেষণার ভাষা। পরবর্তীতে জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গবেষণায় গিয়ে তিনি শিখেছিলেন কঠোর পরীক্ষানিরীক্ষার শৃঙ্খলা, নিখুঁতভাবে ডেটা সংগ্রহের কৌশল এবং ল্যাবের কাজের সূক্ষ্মতা। এই সময়ের প্রশিক্ষণ তাঁকে ধৈর্যশীল ও পদ্ধতিগত গবেষক হিসেবে গড়ে তোলে।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের NIH-এ কাজ করতে গিয়ে তাঁর সামনে খুলে যায় আধুনিক গবেষণার বিস্তৃত জগৎ। সেখানে তিনি শুধু নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হননি; গবেষণাকে কীভাবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হয়, সেটিও হাতে-কলমে শিখেছেন। এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি, মলিকুলার বায়োলজি, স্ট্রাকচারাল বায়োলজি—এই সব প্রযুক্তিগত দক্ষতা এক দিনে শেখা হয়নি। বরং পূর্বের শিক্ষার ওপর দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে তাঁর গবেষণা সক্ষমতা।
ড. আশরাফউদ্দিনের অভিজ্ঞতা দেখায়, শেখা কখনোই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একজন গবেষকের জীবনে প্রতিটি ধাপ পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি হয়ে ওঠে। অনেক সময় মনে হতে পারে, আগের শেখা বিষয় বর্তমান সমস্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। কিন্তু গবেষণায় প্রায়ই দেখা যায়—কোনো পুরোনো ধারণা বা দক্ষতা হঠাৎ নতুন প্রেক্ষাপটে অপ্রত্যাশিতভাবে কাজে লেগে যায়। যেমন, মৌলিক এনজাইম রসায়নের জ্ঞান তাঁকে পরে সংক্রামক রোগের টক্সিন-নিরোধক ওষুধের গবেষণায় সাহায্য করেছে।
এই অভিজ্ঞতা তরুণদের জন্য একটি বাস্তব শিক্ষা দেয়—শিক্ষাজীবনের কোনো অংশই অপ্রয়োজনীয় নয়। শুধু তাৎক্ষণিক ফলের কথা ভেবে শেখাকে সীমাবদ্ধ করলে দীর্ঘমেয়াদে নিজের সম্ভাবনাকেই সংকুচিত করা হয়। ড. আশরাফউদ্দিনের পথচলা দেখায়, ভিন্ন ভিন্ন দেশের শিক্ষা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা একজন গবেষককে কেবল প্রযুক্তিগতভাবে নয়, মানসিকভাবেও পরিপক্ব করে তোলে। বিভিন্ন সংস্কৃতির গবেষণা পরিবেশে কাজ করার ফলে তিনি শিখেছেন সহযোগিতা, ভিন্নমতকে সম্মান করা এবং জ্ঞানের বিনিময়ের মূল্য।
সবশেষে, এই বক্তব্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জ্ঞান কখনো নষ্ট হয় না। হয়তো আজ যা শিখছি, তার তাৎক্ষণিক ব্যবহার নেই; কিন্তু আগামীকাল অন্য কোনো সমস্যার সমাধানে সেটিই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। গবেষণাজীবনের এই দীর্ঘ প্রস্তুতির দর্শন তরুণদের ধৈর্য ধরে শেখার পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।
ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment