অন্তর্দৃষ্টি আলাপনকৃষিপরিবেশ ও পৃথিবী

“গ্রামে থাকা আমাদের কাছে গৌরবের বিষয় নয়—এই মনোভাবই কৃষিকে দুর্বল করেছে”—ড. আবেদ চৌধুরী

Share
Share

বাংলাদেশের কৃষি সংকট নিয়ে আমরা সাধারণত কথা বলি প্রযুক্তি, বিনিয়োগ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে। কিন্তু এই সংকটের গভীরে রয়েছে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রশ্ন—কৃষক হওয়া কি আমাদের সমাজে গৌরবের বিষয়? উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরীর মতে, “গ্রামে থাকা আমাদের কাছে গৌরবের বিষয় নয়—এই মনোভাবই কৃষিকে দুর্বল করেছে।” এই কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের কৃষির দীর্ঘদিনের অবমূল্যায়নের গল্প।

কৃষক পরিচয়ের সামাজিক মর্যাদা

একসময় কৃষক পরিচয় ছিল জীবনের স্বাভাবিক অংশ। দেশের বেশিরভাগ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন ও চাকরির ধারণা সমাজে ‘সফলতা’র নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে। আজকের বাস্তবতায় কৃষক হওয়াকে অনেক সময় দারিদ্র্য বা অশিক্ষার সঙ্গে এক করে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি কৃষকদের আত্মমর্যাদায় আঘাত করে এবং তরুণ প্রজন্মকে কৃষি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

ড. আবেদ চৌধুরী মনে করেন, এই সামাজিক অবমূল্যায়নের ফলে কৃষিতে দক্ষ ও মেধাবী মানুষের আগমন কমে গেছে। কৃষিকে আধুনিকীকরণ করতে হলে যেমন প্রযুক্তি দরকার, তেমনি দরকার মর্যাদার পুনর্গঠন। কৃষককে সম্মান না দিলে কৃষির প্রতি সম্মান তৈরি হয় না।

তরুণদের কৃষিমুখী হওয়ার অনীহা

বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের বড় একটি অংশ শহরমুখী। শিক্ষার উদ্দেশ্য অনেক সময় হয়ে ওঠে—কীভাবে গ্রাম ছেড়ে শহরে স্থায়ী হওয়া যায়। কৃষিকে ক্যারিয়ার হিসেবে ভাবা খুব কম তরুণের মধ্যেই দেখা যায়। ড. আবেদ চৌধুরীর মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য বিপজ্জনক। কারণ কৃষি একটি প্রযুক্তিনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক খাতে রূপ নিচ্ছে, যেখানে তরুণদের নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনী শক্তি জরুরি।

মর্যাদা পুনর্গঠনে শিক্ষা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা

কৃষকের সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে শিক্ষা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যবইয়ে কৃষিকে শুধু ঐতিহ্য হিসেবে নয়, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরতে হবে। গণমাধ্যমে কৃষকদের গল্প তুলে ধরা দরকার—যেখানে তাঁরা শুধু দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ নন, বরং উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী উদ্যোক্তা হিসেবেও উপস্থাপিত হন।

ড. আবেদ চৌধুরীর মতে, কৃষিকে সম্মানের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হলে শহরের মানুষকে গ্রাম ও কৃষির বাস্তবতার সঙ্গে নতুনভাবে পরিচিত করাতে হবে। কৃষককে কেবল সাহায্যের পাত্র হিসেবে না দেখে জ্ঞানের অংশীদার হিসেবে দেখলে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সম্ভব।

শেষকথা

“গ্রামে থাকা আমাদের কাছে গৌরবের বিষয় নয়”—এই উপলব্ধি শুধু কৃষির দুর্বলতার কথা বলে না, এটি আমাদের সামাজিক মানসিকতার একটি আয়না। কৃষিকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে হলে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের পাশাপাশি কৃষকের সামাজিক মর্যাদা পুনর্গঠন করা জরুরি। কৃষককে সম্মান মানেই কৃষিকে সম্মান, আর কৃষিকে সম্মান মানেই দেশের ভবিষ্যৎকে সম্মান করা।

ড. আবেদ চৌধুরীর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ