ড. জুবায়ের শামীমের এই বক্তব্যটি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের একটি মৌলিক বাস্তবতা তুলে ধরে। আজকের যুগে জ্ঞান আর গবেষণা কোনো একক সীমানায় আটকে নেই। বরং একটি ক্ষেত্রের গভীর দক্ষতা অন্য বহু ক্ষেত্রে নতুন সমাধানের পথ খুলে দেয়। এই বহুমাত্রিক প্রয়োগের ধারণাটিই বর্তমান গবেষণা জগতের অন্যতম বড় শক্তি।
বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, একবার কোনো বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলে সেই বিষয়েই আজীবন সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। ফলে আগ্রহ বদলালে বা নতুন কোনো ক্ষেত্র আকর্ষণীয় মনে হলে দ্বিধায় পড়েন—“আমি তো এই বিষয়ে পড়েছি, এখন অন্যদিকে গেলে কি পিছিয়ে পড়ব?” ড. জুবায়ের শামীমের অভিজ্ঞতা এই দ্বিধার একটি বাস্তবসম্মত উত্তর দেয়। তিনি নিজে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স করেও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করেছেন। কিন্তু বিষয় পরিবর্তন হলেও তাঁর মূল দক্ষতা—তাপগতিবিদ্যা, হিট ট্রান্সফার ও ফ্লুইড মেকানিক্স—অপরিবর্তিত থেকেছে। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই তিনি ভিন্ন ভিন্ন ডোমেইনে কাজ করতে পেরেছেন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “গভীরতা”। কোনো বিষয়ের ওপর উপরিতলের ধারণা থাকলে সেটিকে অন্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা কঠিন। কিন্তু যখন একজন শিক্ষার্থী একটি বিষয়ের গভীরে যায়—তত্ত্ব, গণিত, প্রোগ্রামিং বা পরীক্ষণ পদ্ধতি ভালোভাবে আয়ত্ত করে—তখন সেই দক্ষতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় গণিত বা পরিসংখ্যান। যে শিক্ষার্থী গণিতে দক্ষ, সে কেবল গণিতবিদ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তার দক্ষতা ডেটা সায়েন্স, অর্থনীতি, জীববিজ্ঞান বা এমনকি সমাজবিজ্ঞানের গবেষণাতেও প্রয়োগ করা সম্ভব। একইভাবে, প্রোগ্রামিং জানা থাকলে তা মেডিকেল ইমেজিং, জলবায়ু মডেলিং বা ইঞ্জিনিয়ারিং সিমুলেশন—সবখানেই কাজে লাগে।
ড. জুবায়ের শামীম তরুণদের উদ্দেশে আরেকটি বাস্তব পরামর্শ দেন—দক্ষতা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। আজকের দিনে দ্রুত ফল পাওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। কয়েক মাসের কোর্স করেই অনেকেই নিজেকে বিশেষজ্ঞ ভাবতে শুরু করেন। কিন্তু গবেষণার ক্ষেত্রে গভীর দক্ষতা তৈরি করতে বছর লেগে যায়। কোনো একটি টপিক নিয়ে একটানা এক–দুই বছর কাজ করার পরই একজন শিক্ষার্থী বলতে পারে—সে এখন সেই বিষয়ে অর্থপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। এই দীর্ঘ সময়ের ধৈর্যই ভবিষ্যতে বহুমুখী প্রয়োগের ভিত্তি তৈরি করে।
এখানেই আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—ফোকাস। বারবার বিষয় বদলালে গভীর দক্ষতা তৈরি হয় না। আজ এক বিষয়ে আগ্রহ, কাল আরেক বিষয়ে—এই প্রবণতায় দক্ষতা খণ্ডিত থেকে যায়। ড. জুবায়ের শামীম বলেন, আগে একটি বিষয় বেছে নিয়ে সেটির গভীরে যান। সেই বিষয়ের প্রফেসররা কী নিয়ে কাজ করছেন, কী ধরনের সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যার স্কিল দরকার—এসব বুঝে ধাপে ধাপে নিজেকে তৈরি করুন। একবার শক্ত ভিত্তি তৈরি হলে, সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নতুন ক্ষেত্র অন্বেষণ করা তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এই বার্তাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক সময় বিষয়ভিত্তিক সীমানা কঠোর মনে হয়। কিন্তু বৈশ্বিক গবেষণার জগতে এই সীমানা অনেকটাই নমনীয়। প্রয়োজন হলো একটি শক্ত স্কিলসেট তৈরি করা—যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করা যাবে।
ড. জুবায়ের শামীমের উক্তিটি তাই কেবল গবেষণার সৌন্দর্যের কথা বলে না; এটি তরুণদের জন্য একটি কৌশলগত দিকনির্দেশনাও দেয়। গভীরে যান, দক্ষতা তৈরি করুন—তারপর দেখবেন, সেই দক্ষতার আলোয় নতুন নতুন পথ নিজে থেকেই খুলে যাচ্ছে।
🔗 মূল সাক্ষাৎকার পড়ুন:

Leave a comment