ডায়রিয়া ও কলেরা বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের এক দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। প্রতিবছর অসংখ্য শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। সাধারণভাবে সবাই জানে—এই রোগে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো শরীরের পানি ও লবণের দ্রুত ক্ষয়। তাই চিকিৎসার মূল ভিত্তি হিসেবে ফ্লুইড দেওয়া হয়। কিন্তু ড. আবু খালেদের মতে, শুধু ফ্লুইড দিলেই সমস্যা মেটে না; কতটা ফ্লুইড, কখন এবং কীভাবে দেওয়া হচ্ছে—এই প্রশ্নগুলোর ভুল উত্তর জীবনঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁর কথায়, “ডায়রিয়া বা কলেরায় ভুলভাবে ফ্লুইড দিলে জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।”
ডিহাইড্রেশন হলে শরীরের ভেতরের পানি ও ইলেকট্রোলাইট দ্রুত কমে যায়। এই ঘাটতি পূরণে ওআরএস বা শিরায় তরল দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে পানিশূন্যতার মাত্রা এক রকম নয়। কারও ক্ষেত্রে ঘাটতি খুব বেশি, কারও ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম। চোখে দেখে অনেক সময় এই পার্থক্য নির্ভুলভাবে বোঝা যায় না। ফলে কোনো কোনো রোগী প্রয়োজনের তুলনায় কম ফ্লুইড পায়—তাতে শক বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। আবার কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফ্লুইড দেওয়া হলে ফুসফুসে পানি জমে শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। দুই ক্ষেত্রেই বিপদ সমানভাবে মারাত্মক।
ড. আবু খালেদের গবেষণা দেখিয়েছে, এই সমস্যার সমাধান হতে পারে বৈজ্ঞানিকভাবে ডিহাইড্রেশন পরিমাপের মাধ্যমে। Bioelectrical Impedance Analysis (BIA) পদ্ধতি ব্যবহার করে শরীরের ভেতরের পানির পরিমাণ দ্রুত জানা সম্ভব। খুব কম সময়ের মধ্যেই বোঝা যায় রোগী মৃদু, মধ্যম না গুরুতর ডিহাইড্রেশনে ভুগছে। ফলে চিকিৎসকরা আন্দাজের ওপর নির্ভর না করে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এটি বিশেষ করে শিশু ও প্রিম্যাচিউর নবজাতকের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের শরীরে ফ্লুইডের ভারসাম্য সামান্য এদিক-ওদিক হলেই ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আইসিডিডিআরবি-তে কাজ করার সময় ড. খালেদ ও তাঁর সহকর্মীরা প্রথমবারের মতো দেখিয়েছেন—কলেরায় আক্রান্ত রোগীদের ফ্লুইড থেরাপির আগে ও পরে শরীরের ভেতরের পানির পরিবর্তন কীভাবে ঘটে। এই তথ্য শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান বাড়ায়নি; চিকিৎসার প্রোটোকল আরও নিখুঁত করতে সাহায্য করেছে। ডিহাইড্রেশনের ডিগ্রি অনুযায়ী ফ্লুইড দেওয়ার মাধ্যমে রোগীর সুস্থ হওয়ার হার বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে ড. আবু খালেদের একটি বড় শিক্ষা হলো—ডেটা ছাড়া চিকিৎসা মানেই ঝুঁকি। উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞানে আজকাল প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে পরিমাপযোগ্য তথ্য থাকা জরুরি বলে ধরা হয়। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে রোগীর চাপ বেশি এবং সময় কম, সেখানে দ্রুত ও সহজে ডিহাইড্রেশন মাপার প্রযুক্তি থাকলে চিকিৎসার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
ড. আবু খালেদের দৃষ্টিতে, ভবিষ্যতের লক্ষ্য হলো এই ধরনের প্রযুক্তিকে আরও সস্তা ও সহজলভ্য করা। যদি গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও রোগীর পানিশূন্যতার মাত্রা নির্ণয় করা যায়, তাহলে অনেক মৃত্যুই প্রতিরোধ করা সম্ভব। ডায়রিয়া বা কলেরায় মৃত্যু মানে কেবল একটি রোগের পরিণতি নয়—এটি অনেক ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারার ফল। বিজ্ঞানভিত্তিক পরিমাপ এই সিদ্ধান্তকে আরও নির্ভুল করে তুলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ড. আবু খালেদের কথাটি কেবল একটি সতর্কবাণী নয়; এটি চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি একটি স্পষ্ট আহ্বান। ফ্লুইড থেরাপিকে আমরা যতটা সহজ মনে করি, বাস্তবে তা ততটাই সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। সঠিক পরিমাপ ছাড়া এই চিকিৎসা জীবন বাঁচানোর বদলে কখনো কখনো উল্টো ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এই সত্যটি মেনে নিয়েই আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এগোতে হবে।
ড. খালেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment