একটি প্রশ্ন আজ বিশ্ব কৃষির সামনে দাঁড়িয়ে-
আমরা কি ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবো?
বাড়ছে জনসংখ্যা, আর অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন কৃষিকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে-খরা, লবণাক্ততা, বন্যা, জলোচ্ছাস, নতুন রোগ ও পোকামাকড় সব মিলিয়ে কৃষিজ উৎপাদন হয়ে উঠছে অনিশ্চিত। ঠিক কৃষির এই ক্রান্তিকালে বিজ্ঞান নিয়ে এসেছে এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি- CRISPR-Cas9, যাকে বলা হয় “মলিকিউলার কাঁচি”, কারণ এটি জীবনের নকশা, ডিএনএ এর ভেতর ঢুকে নির্দিষ্ট জায়গায় সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনতে পারে।
এই প্রযুক্তি জিনের ভেতরে নির্দিষ্ট পরিবর্তন এনে এমন সব ফসল তৈরি করতে পারে, যা প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে সক্ষম। তাই প্রশ্নটি এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ-CRISPR-Cas9 কি বদলে দিতে পারে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ?
১. CRISPR-Cas9আসলে কী?
সহজ করে বললে, CRISPR-Cas9 হলো এমন এক জিন-সম্পাদনা প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে জীবের ডিএনএ এর নির্দিষ্ট অংশ শনাক্ত করে সেখানে পরিবর্তন আনা যায় (চিত্র-১)। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিষয়টি অনেকটা কম্পিউটারে লেখা একটি লেখার ভুল সংশোধনের মতো।
ধরুন, একটি বড় লেখার মধ্যে একটি শব্দ ভুল আছে। আপনি প্রথমে ভুল অংশটি খুঁজে বের করেন, তারপর সেটি মুছে দেন, এবং প্রয়োজন হলে সঠিক অংশ বসিয়ে দেন। CRISPR-Cas9 ডিএনএ এর ক্ষেত্রেও প্রায় একই কাজ করে। উদ্ভিদের জিনগত নির্দেশনায় কোথাও যদি এমন কিছু থাকে যা তাকে খরা, লবণাক্ততা বা রোগের সামনে দুর্বল করে দেয়, তবে বিজ্ঞানীরা সেই জায়গায় লক্ষ্যভিত্তিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করতে পারেন।
২. এটি কীভাবে কাজ করে?
এই প্রযুক্তির দুটি প্রধান অংশ আছে।
- প্রথমটি হলো গাইড আরএনএ (gRNA)। এটি অনেকটা জিপিএসের মতো কাজ করে। ডিএনএ এর বিশাল ভাণ্ডারের মধ্যে এটি সঠিক স্থানটি শনাক্ত করে, যেখানে পরিবর্তন দরকার।
- দ্বিতীয়টি হলো Cas9 এনজাইম। এটি সেই নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে ডিএনএ-তে সূক্ষ্ম কাট তৈরি করে। এরপর কোষ তার স্বাভাবিক মেরামত প্রক্রিয়ায় সেই অংশটি জোড়া লাগায়। এই মেরামতের সময়ই কাঙ্ক্ষিত জিনগত পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হয়।
শুনতে জটিল লাগলেও মূল ধারণা খুব পরিষ্কার: নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করা, কাটা, এবং জিনগত ফলাফল বদলে দেওয়া।
৩. খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
খাদ্য নিরাপত্তা শুধু পেট ভরার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত আছে পর্যাপ্ত, নিরাপদ, পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী খাবারের প্রাপ্যতা। CRISPR-Cas9 এই চার ক্ষেত্রেই ভূমিকা রাখতে পারে।
- প্রথমত, এটি পুষ্টিমান বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। ফসলে ভিটামিন, খনিজ বা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মাত্রা বাড়ানোর গবেষণা বিশ্বজুড়ে চলছে। ভবিষ্যতে এমন ধান, গম বা সবজি তৈরি হতে পারে যা শুধু বেশি ফলনই দেবে না, বরং বেশি পুষ্টিও সরবরাহ করবে।
- দ্বিতীয়ত, এটি সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি কমাতে সহায়ক হতে পারে। এমন ফল বা সবজি উদ্ভাবন করা সম্ভব, যা দ্রুত নষ্ট হবে না, কালচে হবে না, বা বেশি দিন সংরক্ষণ করা যাবে। বাংলাদেশে যেখানে উৎপাদনের পর বড় অংশ অপচয় হয়, সেখানে এটি একটি বড় সুবিধা।
- তৃতীয়ত, CRISPR রোগ প্রতিরোধী ফসল তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। উদ্ভিদের নিজেদের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে দিলে রাসায়নিক বালাইনাশকের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।
৪. জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষিতে এর সম্ভাবনা
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। উপকূলে লবণাক্ততা বাড়ছে, উত্তরাঞ্চলে খরার তীব্রতা দেখা যায়, আবার হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা কৃষিকে বারবার বাধাঁগ্রস্ত করে। এই বাস্তবতায় এমন ফসল দরকার, যা প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে।
এখানেই CRISPR-Cas9 এর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। গবেষকেরা এমন জিন শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন, যেগুলো উদ্ভিদের লবণাক্ততা সহনশীলতা, খরা সহ্যক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ, কিংবা জৈব ও অজৈব চাপের মধ্যে ফলন ধরে রাখার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। ঐসব জিনে লক্ষ্যভিত্তিক সম্পাদনার মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত দ্রুত নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
চিরাচরিত প্রজনন পদ্ধতিতে একটি নতুন জাত উন্নয়নে সাধারণত দীর্ঘ সময় (প্রায় ১০-১২ বছর) লাগে। জিন-সম্পাদনা প্রযুক্তি সেই সময় কমিয়ে (২-৩ বছর) গবেষণাকে আরও লক্ষ্যনির্ভর করতে পারে। যদিও গবেষণা থেকে মাঠপর্যায়ে যাওয়ার পথ এখনো সহজ নয়, তবু সম্ভাবনাটি নিঃসন্দেহে বড়।
৫. এটি কি GMO (Genetically Modified Food)?
এখানেই সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি দেখা যায়। অনেকেই ভাবেন, CRISPR মানেই GMO। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়।
প্রচলিত GMO তে অনেক সময় অন্য কোনো জীবের জিন একটি ফসলে প্রবেশ করানো হয়। অন্যদিকে CRISPR এর বহু প্রয়োগে বাইরের জিন প্রবেশ করানো ছাড়াই উদ্ভিদের নিজস্ব জিনে ছোট ও নির্দিষ্ট পরিবর্তন আনা হয়। তাই অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, এর কিছু প্রয়োগকে প্রচলিত GMO এর সঙ্গে এক কাতারে ফেলা ঠিক হবে না।
তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, প্রযুক্তির ধরন, প্রয়োগের উদ্দেশ্য, এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এর মূল্যায়ন করতে হবে। বিজ্ঞান যেমন সম্ভাবনা তৈরি করে, তেমনি সঠিক নীতিমালা ও ঝুঁকি মূল্যায়নও জরুরি।
৬. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে ধান শুধু একটি ফসল নয়, এটি খাদ্য নিরাপত্তার মেরুদণ্ড। এর সঙ্গে আছে গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি এবং অর্থকরী ফসল। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু বেশি উৎপাদন নয়, স্থিতিশীল উৎপাদন দরকার।
এই জায়গায় CRISPR-Cas9 ভবিষ্যতে কয়েকটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে:
- লবণাক্ত এলাকায় সহনশীল ধান উদ্ভাবন,
- খরা-প্রবণ অঞ্চলের জন্য সহনশীল জাত তৈরি,
- রোগপ্রতিরোধী ফসল উন্নয়ন,
- পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত তৈরি,
- কৃষি ইনপুটের ব্যবহার কমিয়ে অধিক টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা।
যদি বাংলাদেশে গবেষণা অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং জনসচেতনতা একসঙ্গে এগোয়, তবে এই প্রযুক্তি কৃষি উদ্ভাবনের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
৭. কী কী চ্যালেঞ্জ আছে?
সম্ভাবনা যত বড়, চ্যালেঞ্জও তত বাস্তব।
- প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো গবেষণা সক্ষমতা। জিন-সম্পাদনা প্রযুক্তির জন্য উন্নত ল্যাব, নির্ভুল পরীক্ষণ, বায়োসেফটি ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বিনিয়োগ দরকার।
- দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো নীতিগত কাঠামো। কোন ফসলকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, কীভাবে নিরাপত্তা যাচাই হবে, মাঠপর্যায়ে ছাড়পত্র কীভাবে দেওয়া হবে, এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশিকা প্রয়োজন।
- তৃতীয়ত, রয়েছে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। জিন, বায়োটেকনোলজি, GMO এসব শব্দ সাধারণ মানুষের কাছে প্রায়ই ভয়ের বিষয় হয়ে ওঠে। ফলে সহজ ভাষায় বিজ্ঞান যোগাযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
- চতুর্থত, রয়েছে সমতা ও ন্যায্যতার প্রশ্ন। প্রযুক্তির সুবিধা যাতে শুধু বড় কোম্পানি বা সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে আটকে না থাকে, বরং ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরাও যাতে উপকৃত হন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
৮. বাংলাদেশের জন্য করণীয় কী?
বাংলাদেশে CRISPR-Cas9 এর মতো প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হলে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
- প্রথমত, উদ্ভিদ জিন-সম্পাদনা বিষয়ে স্বচ্ছ ও বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিমালা প্রয়োজন।
- দ্বিতীয়ত, জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
- তৃতীয়ত, জনসচেতনতা ও বিজ্ঞানভিত্তিক যোগাযোগ শক্তিশালী করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তির বদলে তথ্যভিত্তিক ধারণা পান।
- চতুর্থত, প্রযুক্তির প্রয়োগে ক্ষুদ্র কৃষকের স্বার্থকে কেন্দ্রে রাখতে হবে।

চিত্র-১: CRISPR-Cas9-জিন সম্পাদনার মাধ্যমে জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার কাল্পনিক রূপরেখা
৯. উপসংহার
শুরুতে যে প্রশ্নটি উঠেছিল-আমরা কি ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবো? তার উত্তর এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, কিন্তু সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে CRISPR-Cas9।
এটি কোনো জাদুর কাঠি নয়, তবে এমন একটি প্রযুক্তি, যা কৃষিকে আরও দ্রুত, নির্ভুল এবং লক্ষ্যভিত্তিক পথে এগিয়ে নিতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন, পুষ্টি ঘাটতি এবং খাদ্য উৎপাদন একে অন্যের সঙ্গে জড়িত, সেখানে এটি হতে পারে এক শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার।
তবে ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু প্রযুক্তির ওপর নয়।
প্রয়োজন দূরদর্শী নীতি, মজবুত গবেষণা অবকাঠামো, এবং সবচেয়ে বড় কথা-মানুষের আস্থা।
এই তিনটি যদি একসাথে গড়ে ওঠে, তাহলে হয়তো খুব শিগগিরই সেই প্রশ্নের উত্তর আমরা নিজেরাই লিখতে পারবো-
খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ শুধু কল্পনায় নয়, বাস্তবেও গড়ে উঠছে।
লেখক:
ড. রিপন সিকদার,
ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর (বীজ), পার্টনার প্রকল্প, বিএডিসি, ঢাকা

Leave a comment