বাংলাদেশের তরুণ সমাজ নিয়ে প্রায়ই দুই ধরনের কথা শোনা যায়—একদল হতাশার সুরে সম্ভাবনার ঘাটতির কথা বলেন, আরেক দল বিশ্বাস করেন তরুণদের হাতেই দেশের ভবিষ্যৎ। দীর্ঘদিন প্রবাসে গবেষণা ও একাডেমিক নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করা বিজ্ঞানী ডক্টর মোহাম্মদ আতাউল করিম দ্বিতীয় দলের মানুষ। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, “সঠিক পরিবেশ তৈরি হলে আমাদের তরুণরাই বড় কাজ করতে পারে।” এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশে নিয়মিত সম্পৃক্ত থাকার বাস্তব উপলব্ধি।
ডক্টর করিম যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন কীভাবে একটি সহায়ক পরিবেশ একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে অসাধারণ গবেষকে রূপান্তরিত করতে পারে। সেখানে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পরামর্শদাতা, তহবিল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ থাকে। এই সমন্বিত পরিবেশে তরুণরা ঝুঁকি নিতে শেখে, নতুন ধারণা পরীক্ষা করতে সাহস পায়। তাঁর মতে, মেধা সব দেশে প্রায় সমানভাবেই ছড়িয়ে আছে; পার্থক্য তৈরি করে সেই মেধাকে বিকশিত করার সুযোগ ও পরিবেশ।
বাংলাদেশের তরুণদের ক্ষেত্রেও তিনি একই সম্ভাবনা দেখেন। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দেশের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করছে, প্রবাসে উচ্চশিক্ষা নিয়ে গবেষণায় অবদান রাখছে। এসব উদাহরণ দেখিয়ে ডক্টর করিম বলেন, সমস্যা মূলত সক্ষমতার নয়; সমস্যা পরিবেশের। পর্যাপ্ত গবেষণাগার, আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত মেন্টর এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকলে অনেক মেধাই অপচয় হয়ে যায়। সঠিক পরিবেশ বলতে তিনি বোঝান এমন একটি কাঠামো, যেখানে প্রশ্ন করা উৎসাহিত হয়, ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে দেখা হয় এবং নতুন ধারণাকে সমর্থন দেওয়া হয়।
এই পরিবেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা জোরদার করা, শিল্পখাতের সঙ্গে গবেষণার সংযোগ তৈরি করা এবং তরুণদের জন্য বাস্তব প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করা—এসবই সঠিক পরিবেশ তৈরির অংশ। ডক্টর করিমের অভিজ্ঞতায়, যখন তরুণরা বাস্তব সমস্যার সঙ্গে গবেষণাকে যুক্ত করতে পারে, তখন তাদের কাজের প্রতি আগ্রহ ও দায়বদ্ধতা দুটোই বাড়ে।
তিনি আরও মনে করেন, তরুণদের বড় কাজ করার সুযোগ দিতে হলে নেতৃত্বের জায়গায় থাকা মানুষদের মানসিকতাও বদলাতে হবে। তরুণদের ওপর আস্থা রাখা, তাদের উদ্যোগকে সম্মান করা এবং ভুল করার সুযোগ দেওয়া—এই বিষয়গুলো ছাড়া উদ্ভাবনী পরিবেশ গড়ে ওঠে না। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন, অনেক সময় শিক্ষার্থীদের একটি ছোট সুযোগই ভবিষ্যতের বড় গবেষণা প্রকল্পের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
শেষ পর্যন্ত “সঠিক পরিবেশ তৈরি হলে আমাদের তরুণরাই বড় কাজ করতে পারে”—এই কথাটি শুধু আশাবাদের বাণী নয়; এটি একটি নীতিগত আহ্বান। যদি বাংলাদেশে গবেষণা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার জন্য সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা যায়, তবে দেশের তরুণরাই ভবিষ্যতের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সমাজ উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন: https://biggani.org/dr_ataul_karim/
ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment