ড. জুবায়ের শামীমের এই কথাটি শুনতে সহজ মনে হলেও বাস্তবে এর গভীরতা অনেক। কারণ অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজটাই হলো—নিজের প্রকৃত আগ্রহটি চিহ্নিত করা। পরীক্ষার নম্বর, সমাজের প্রত্যাশা কিংবা বন্ধুদের অনুসরণে অনেক সময় পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে ধীরে ধীরে একজন তরুণ বুঝতে পারে—সে হয়তো এমন এক পথে হাঁটছে, যা তার ভেতরের আগ্রহের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
ড. জুবায়ের শামীমের জীবনকাহিনি এই জায়গায় ভিন্ন এক বার্তা দেয়। তাঁর পথচলায় দেখা যায়, তিনি কোনো একক সরল রাস্তায় এগোননি। বুয়েট থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, এরপর কোরিয়ায় নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স, আবার জাপানে ফিরে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি—এই যাত্রা বাইরে থেকে দেখলে হয়তো এলোমেলো মনে হতে পারে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটি সুতো স্পষ্ট: তাপগতিবিদ্যা, হিট ট্রান্সফার ও ফ্লুইড মেকানিক্সের প্রতি তাঁর আগ্রহ। বিষয় বদলালেও আগ্রহের কেন্দ্র বদলায়নি। ফলে প্রতিটি ধাপেই তিনি নিজের দক্ষতাকে আগের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছেন।
বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, একবার কোনো বিষয়ে ভর্তি হলে সেই বিষয়েই আজীবন আটকে থাকতে হবে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের বাস্তবতায় বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গণিত জানলে তা মেডিকেল ইমেজিংয়েও কাজে লাগে, কম্পিউটিং জানলে তা জীববিজ্ঞানের ডেটা বিশ্লেষণেও প্রযোজ্য হয়। ড. জুবায়ের শামীমের অভিজ্ঞতা দেখায়, আসল বিষয় হলো—নিজের আগ্রহের “কোর” বা কেন্দ্রটি খুঁজে পাওয়া। সেই কেন্দ্রকে শক্ত করে ধরতে পারলে, তার প্রয়োগক্ষেত্র বদলানো যায়।
এই উপলব্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—আগ্রহ খুঁজে পাওয়ার পর সেটিকে গভীরভাবে অন্বেষণ করা। অনেক সময় আমরা আগ্রহের কথা বলি, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও শ্রম দিতে রাজি থাকি না। গবেষণা বা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিষয়টির গভীরে যেতে হলে ধৈর্য ধরে দক্ষতা গড়ে তুলতে হয়—কখনও কোড শেখা, কখনও গণিত বা তত্ত্বের কঠিন অংশ আয়ত্ত করা, কখনও ল্যাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো। এই দীর্ঘ প্রস্তুতিই একজন শিক্ষার্থীকে “ঠিক জায়গায় পৌঁছাতে” সাহায্য করে।
ড. জুবায়ের শামীমের কথায়, জীবন অনেক সময় আমাদের সামনে একাধিক পথ খুলে দেয়। কোন পথে যাব—সেটা নির্ধারণ করে আমরা কী চাই, কোন বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে সময়ের হিসাব ভুলে যাই। তিনি নিজে শিল্পখাতে চাকরি করার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছেন—যেখানে আগ্রহ নেই, সেখানে স্থায়িত্ব পাওয়া কঠিন। আবার গবেষণার অনিশ্চিত পথেও তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন, কারণ সেখানে তাঁর কৌতূহল ও আগ্রহ কাজ করে।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এই বার্তাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আজকের প্রতিযোগিতামূলক সময়ে ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় চারপাশের চাপ অনেক। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সন্তুষ্টি আসে তখনই, যখন মানুষ নিজের আগ্রহের জায়গাটি খুঁজে পায় এবং সেটিকে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য ধাপে ধাপে প্রস্তুতি নেয়। এই প্রস্তুতির পথ কখনও সরল নয়—ভুল হবে, দেরি হবে, হতাশাও আসবে। কিন্তু আগ্রহের প্রতি বিশ্বস্ত থাকলে সেই ভুলগুলোই একসময় শেখার পুঁজি হয়ে ওঠে।
ড. জুবায়ের শামীমের উক্তিটি তাই কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সারকথা নয়; এটি তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা। নিজের আগ্রহকে চিহ্নিত করুন, তাকে গভীরভাবে জানুন, আর সেই আগ্রহকে ভিত্তি করে নিজের দক্ষতার কাঠামো গড়ে তুলুন। তখন “ঠিক জায়গায় পৌঁছানো” আর কেবল স্বপ্ন থাকবে না—তা ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নেবে।
🔗 মূল সাক্ষাৎকার পড়ুন:

Leave a comment