চিকিৎসা বিদ্যাসাধারণ বিজ্ঞানস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

“লবণ আর চিনি—এই দুইটা ধীরে ধীরে আমাদের শরীর ধ্বংস করছে” – ড. আবু খালেদ

Share
Share

বাংলাদেশের প্রতিদিনের খাবারের দিকে তাকালেই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ভাত, ভাজা খাবার, ঝাল-ঝোলের সাথে অতিরিক্ত লবণ; আর চা, মিষ্টান্ন, কোমল পানীয় বা মিষ্টি জাতীয় খাবারের মাধ্যমে বাড়তি চিনি। ড. আবু খালেদ এই দুই উপাদানকে একসঙ্গে উল্লেখ করে বলেন, “লবণ আর চিনি—এই দুইটা ধীরে ধীরে আমাদের শরীর ধ্বংস করছে।” তাঁর এই সতর্কবার্তা নিছক খাদ্যাভ্যাসের সমালোচনা নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগের প্রকাশ।

লবণ ও চিনি—এই দুইটি উপাদানই শরীরের জন্য সীমিত পরিমাণে প্রয়োজনীয়। লবণ ছাড়া শরীরের সোডিয়াম-পটাশিয়ামের ভারসাম্য বজায় থাকে না, স্নায়ুর সংকেত আদান-প্রদান ব্যাহত হয়। আবার চিনি শরীরের শক্তির উৎস। কিন্তু সমস্যাটি শুরু হয় যখন প্রয়োজনের তুলনায় এগুলোর গ্রহণমাত্রা বেড়ে যায়। ড. খালেদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসে লবণের পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের তুলনায় অনেক বেশি। অতিরিক্ত লবণ সরাসরি উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়, যা থেকে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি হয়।

চিনির ক্ষেত্রেও চিত্রটি ভিন্ন নয়। চিনি ও সহজ কার্বোহাইড্রেট দ্রুত রক্তে গ্লুকোজ বাড়ায়। নিয়মিতভাবে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ করলে শরীরের ইনসুলিন কাজ করতে গিয়ে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে—এটিই ডায়াবেটিসের পথ তৈরি করে। ড. আবু খালেদ বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, আমাদের ভাত-কেন্দ্রিক খাদ্যাভ্যাসের কারণে দৈনন্দিন কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ এমনিতেই বেশি থাকে। তার ওপর অতিরিক্ত চিনি যুক্ত হলে শরীরের বিপাকীয় ভারসাম্য আরও বিঘ্নিত হয়।

এই খাদ্যাভ্যাসের আরেকটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি ধীরে ধীরে ক্ষতি করে। হঠাৎ করে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে না। বছরের পর বছর অতিরিক্ত লবণ ও চিনি গ্রহণের ফলে শরীরে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি সমস্যা ও হৃদরোগের ঝুঁকি জমতে থাকে। অনেকেই প্রথম দিকে কোনো উপসর্গ না থাকায় বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু যখন সমস্যা ধরা পড়ে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তা দীর্ঘমেয়াদি ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে ওঠে।

ড. আবু খালেদ মনে করেন, এই সংকটের মূল কারণ শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ নয়—সামাজিক অভ্যাস ও সচেতনতার অভাব। খাবারে বাড়তি লবণ দেওয়া অনেকের কাছে স্বাদের অংশ, আবার অতিথি আপ্যায়নে অতিরিক্ত মিষ্টি পরিবেশন সামাজিক সৌজন্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। শহুরে জীবনে প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্টফুড ও সফট ড্রিঙ্কসের সহজলভ্যতাও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে শিশু-কিশোরদের মধ্যেও অল্প বয়সেই অতিরিক্ত চিনি ও লবণের অভ্যাস তৈরি হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ড. আবু খালেদের পরামর্শ খুবই বাস্তবমুখী—ধীরে ধীরে অভ্যাস বদলানো। হঠাৎ করে লবণ বা চিনি পুরো বাদ দেওয়া কঠিন, কিন্তু রান্নায় লবণের পরিমাণ ধাপে ধাপে কমানো, চায়ে চিনি কম নেওয়া, প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে ঘরে রান্না করা খাবার বেছে নেওয়া—এই ছোট ছোট পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি স্কুলপর্যায় থেকে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যশিক্ষা জোরদার করার কথাও তিনি গুরুত্ব দিয়ে বলেন, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম আরও সচেতন হয়ে ওঠে।

ড. আবু খালেদের কথায়, “রোগ হলে চিকিৎসা করা দরকার, কিন্তু তার চেয়েও বড় কাজ হলো রোগের আগেই অভ্যাস বদলানো।” বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের হার দ্রুত বাড়ছে, সেখানে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে এই সতর্কতা সময়োপযোগী। লবণ ও চিনির নিয়ন্ত্রণ শুধু ব্যক্তিগত সুস্থতার বিষয় নয়—এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন।

ড. খালেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:


Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org