পরিবেশ ও পৃথিবীবিজ্ঞানীদের জীবনীসাধারণ বিজ্ঞান

“প্রকৃতিকে না বুঝে বিজ্ঞানী হওয়া যায় না”—ড. আবেদ চৌধুরী

Share
Share

আজকের দিনে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মানেই অনেকের চোখে ল্যাবরেটরি, কম্পিউটার স্ক্রিন আর বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছবি। কিন্তু উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী মনে করিয়ে দেন, বিজ্ঞানের শিকড় প্রকৃতির ভেতরেই প্রোথিত। তাঁর কথায়, “প্রকৃতিকে না বুঝে বিজ্ঞানী হওয়া যায় না।” এই বক্তব্য শুধু একটি অনুপ্রেরণামূলক উক্তি নয়; এটি বিজ্ঞানচর্চার একটি গভীর দর্শন।

প্রকৃতির কাছ থেকে শেখা: বিজ্ঞানের প্রথম পাঠশালা

ড. আবেদ চৌধুরীর মতে, প্রকৃতি হলো বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় পাঠশালা। গাছের বেড়ে ওঠা, বীজের অঙ্কুরোদ্গম, নদীর গতিপথ বা মৌসুমি পরিবর্তন—এসব পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়েই বিজ্ঞানের মৌলিক প্রশ্নগুলোর জন্ম হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রকৃতির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় গ্রামে। মাঠে ফসল ফলতে দেখা, কৃষকের পরিশ্রমের গল্প শোনা, বন্যা বা খরার প্রভাব চোখে দেখা—এসব অভিজ্ঞতা বইয়ের পাতার বাইরের শিক্ষা দেয়।

তিনি মনে করেন, যারা কেবল পাঠ্যবই বা ল্যাবরেটরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে বিজ্ঞান শিখতে চায়, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকলে বিজ্ঞানী হিসেবে প্রশ্ন করার ক্ষমতা বাড়ে, সমস্যাকে বাস্তব প্রেক্ষাপটে দেখার অভ্যাস তৈরি হয়।

শহরের শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রামে যাওয়ার আহ্বান

ড. আবেদ চৌধুরী বিশেষভাবে শহরের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, গ্রামে গিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর কথা। শহরের শিক্ষিত পরিবারের সন্তানদের অনেকেরই গ্রামের জীবনের সঙ্গে সরাসরি পরিচয় নেই। ফলে দেশের কৃষি ও পরিবেশগত বাস্তবতা তাদের কাছে বিমূর্ত ধারণা হিসেবেই থেকে যায়।

তিনি তরুণদের উৎসাহ দেন গ্রামের স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে, তাদের জীবনের গল্প শুনতে। এতে শুধু সামাজিক সংবেদনশীলতা বাড়ে না, দেশের বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয়। এই সচেতনতা ভবিষ্যতে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী বা নীতিনির্ধারক হিসেবে দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মানবিক বিজ্ঞানচর্চার প্রয়োজনীয়তা

ড. আবেদ চৌধুরীর মতে, বিজ্ঞান মানে শুধু প্রযুক্তি বা উদ্ভাবন নয়; বিজ্ঞান মানে মানুষের জীবনকে ভালো করা। যদি বিজ্ঞানচর্চা মানুষের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সংযুক্ত না থাকে, তবে তা অনেক সময় সমাজের জন্য অর্থবহ হয়ে ওঠে না। বাংলাদেশের মতো দেশে কৃষি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির মতো মৌলিক সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞানীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি মনে করেন, তরুণদের বিজ্ঞানচর্চায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করা জরুরি। গবেষণার বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে ফলাফল প্রয়োগ—সব পর্যায়ে মানুষের কল্যাণের কথা ভাবলে বিজ্ঞান আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

বড় স্বপ্ন, শিকড়ের টান

ড. আবেদ চৌধুরী তরুণদের বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহ দেন। বিদেশে পড়াশোনা, আন্তর্জাতিক গবেষণায় যুক্ত হওয়া—এসব সুযোগ গ্রহণ করতে তিনি নিরুৎসাহিত করেন না। বরং তিনি মনে করেন, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা একজন বিজ্ঞানীর দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও বিস্তৃত করে। তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, নিজের শিকড়ের কথা ভুলে না যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা। দেশের প্রকৃতি, মানুষ ও বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সংযোগ থাকলে বিজ্ঞানচর্চা আরও অর্থবহ ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে।

শেষকথা

ড. আবেদ চৌধুরীর এই বার্তা আমাদের তরুণদের জন্য এক ধরনের দিকনির্দেশনা—বিজ্ঞান শেখা মানে শুধু পরীক্ষার নম্বর বা ডিগ্রি অর্জন নয়; এটি প্রকৃতিকে বোঝা, মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং সমাজের সমস্যার সমাধানে নিজেকে প্রস্তুত করা। প্রকৃতির কাছ থেকে শেখার এই দর্শন যদি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশে বিজ্ঞানচর্চা আরও মানবিক ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।


ড. আবেদ চৌধুরীর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org