পদার্থবিদ্যামহাকাশ

মহাবিশ্ব প্রসারণ ও ডার্ক এনার্জির রহস্য

Share
Share

ভূমিকা 

কখনো কি গভীর রাতে ছাদে বা খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেছেন?চারপাশে নীরবতা, মাথার ওপর অগণিত তারা,নীরবে জ্বলছে, যেন হাজার হাজার চোখ আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই মুহূর্তে হঠাৎ এক অদ্ভুত প্রশ্ন মাথায় আসে এই তারাগুলো কি সবসময় এখানেই ছিল? আগামীকাল, এক হাজার বছর পরে, এক কোটি বছর পরেও এরা কি ঠিক এই জায়গাতেই থাকবে? আমরা সাধারণত ভাবি, আকাশ মানেই স্থির। পাহাড় যেমন দাঁড়িয়ে থাকে, নদী যেমন বয়ে চলে, আকাশের তারাগুলোও তেমনি চিরস্থায়ী। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলে এই ধারণা ভুল। আকাশ আসলে একটি চলমান গল্প।
একটি বিস্তৃত, নিঃশব্দ, অথচ এর ভেতরে অদ্ভুত বাস্তবতা। আর সেই গল্পের সবচেয়ে বড় বিস্ময়কর অধ্যায় হলো: মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই থামে না। কেন প্রসারিত হচ্ছে? কে বা কী তাকে ঠেলে দিচ্ছে? আর সেই শক্তির নামই বা কেন বহুল আলোচিত “ডার্ক এনার্জি” ?

প্রসারণ মানে কী?

প্রথমেই একটা ভুল ধারণা ভাঙা দরকার মনে করছি। মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে কথাটা শুনে অনেকের মাথায় আসে,
“তাহলে কি পৃথিবী বড় হচ্ছে?”
না। একেবারেই না। এটা বোঝার জন্য একটা খুব সহজ উদাহরণ ধরি। ধরুন, আপনি একটা রাবারের বেলুন নিলেন। তার ওপর কলম দিয়ে কয়েকটা ছোট ছোট দাগ এঁকে দিলেন। এখন বেলুনটা ধীরে ধীরে ফোলান।
আপনি কী দেখবেন?
দাগগুলো নিজের আকারে বড় হচ্ছে না কিন্তু দাগগুলোর মাঝের দূরত্ব বাড়ছে একটা দাগ আরেকটা দাগ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। মহাবিশ্ব ঠিক এভাবেই প্রসারিত হচ্ছে। গ্যালাক্সি, তারা, গ্রহ এগুলো মোটামুটি একই রকম আছে। কিন্তু এগুলোর মাঝের ফাঁকা জায়গা, অর্থাৎ space সেটাই বাড়ছে। এই প্রসারণ কোনোকিছুকে কেন্দ্র করে ঘটছে না। কোনো “মাঝখান” নেই।যেখানেই দাঁড়িয়ে আপনি তাকান, সেখান থেকেই সবকিছু দূরে সরে যাচ্ছে।

একটু ইতিহাস

এই আবিষ্কারটা কিন্তু একদিনে হয়নি। এর পেছনে আছে মানুষের কৌতূহল, ধৈর্য, আর বহু রাত নির্ঘূম হয়ে আকাশ দেখার ইতিহাস। ১৯২০-এর দশকে এক মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী,এডউইন হাবল দূরের গ্যালাক্সিগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি লক্ষ করলেন এক অদ্ভুত বিষয়। প্রায় সব গ্যালাক্সির আলো একটু লালচে। এই ঘটনাকে বলে Redshift। ধরুন, একটা অ্যাম্বুলেন্স আপনার দিকে আসছে, সাইরেনের শব্দ তীক্ষ্ণ। কিন্তু দূরে সরে গেলে শব্দ ভারী হয়ে যায়। আলোর ক্ষেত্রেও ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটে। যদি কোনো নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি আমাদের থেকে দূরে সরে যায়, তার আলো লাল দিকে সরে যায়। হাবল দেখলেন, প্রায় সব গ্যালাক্সিই আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যত দূরের গ্যালাক্সি, তত বেশি গতিতে সরে যাচ্ছে এই আবিষ্কারই প্রমাণ করল, মহাবিশ্ব স্থির নয়; তা ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। হাবলের এই আবিষ্কারই পরবর্তীতে বিগ ব্যাং (Big Bang) তত্ত্বের প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, সব কিছু যদি এখন দূরে সরতে থাকে, তবে অতীতে নিশ্চয়ই সব কিছু এক বিন্দুতে ছিল।

বিগ ব্যাং

যদি মহাবিশ্ব আজ প্রসারিত হয়, তাহলে সময়কে উল্টো দিকে নিয়ে গেলে কী হবে? ঠিক যেমন ফোলা বেলুন থেকে বাতাস বের করলে সেটা ছোট হয়,তেমনি সময়কে পেছনে নিলে মহাবিশ্ব আরও ঘন অার আরও ছোট হতে থাকবে। এই ধারণা থেকেই জন্ম নেয় (The Big Bang Theory)। বিগ ব্যাং মানে কোনো বিশাল বিস্ফোরণ নয়। এটা কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় ঘটেনি। বরং, সমস্ত জায়গা-সময় একসাথে প্রসারিত হতে শুরু করেছিল। 

শুরুতে মহাবিশ্ব ছিল অত্যন্ত গরম, ঘন, আর শক্তিতে ভরপুর। তারপর, কণা তৈরি হলো। পরমাণু গঠিত হলো। নক্ষত্র জন্ম নিল। গ্যালাক্সি গড়ে উঠল। এক কোণে ছোট্ট নীল গ্রহে জন্ম নিল মানুষ নামক এক বিস্ময়কর জাতি।

কতটা প্রসারণ হচ্ছে?

স্বাভাবিক যুক্তি আমাদের বলে যে, বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্ব একবার প্রচণ্ড গতিতে প্রসারিত হতে শুরু করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রসারণের গতি ধীরে ধীরে কমে আসার কথা। কারণ মহাবিশ্বে তো মহাকর্ষ আছে। নক্ষত্র, গ্যালাক্সিসহ সবই একে অপরকে আকর্ষণ করছে। সেই টান একসময় প্রসারণকে থামিয়ে দেবে সরল মনে এমনটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বিজ্ঞান পুরোই ভিন্ন কথা বলে!

দৈনন্দিন জীবনের একটা পরিচিত উদাহরণ ধরি।ধরুন, আপনি একটা বল সোজা উপরের দিকে ছুড়ে দিলেন। শুরুতে বলটা খুব দ্রুত ওপরে উঠে যায়। কিন্তু ধীরে ধীরে তার গতি কমে আসে। কারণ পৃথিবীর মহাকর্ষ তাকে টানছে। একসময় বলটা থেমে যায়, তারপর আবার নিচে পড়ে। বিজ্ঞানীরাও অনেক দিন ধরে ঠিক এইভাবেই মহাবিশ্বকে কল্পনা করেন।

তাদের ধারণা ছিল যে বিগ ব্যাং হলো সেই ছুঁড়ে দেওয়া বলের মতো। প্রথমে প্রচণ্ড শক্তিতে প্রসারণ, তারপর ধীরে ধীরে গতি কমে আসবে। হয়তো একদিন পুরোপুরি থেমেও যাবে। এমনকি কেউ কেউ ভাবছিলেন, একসময় মহাবিশ্ব আবার সংকুচিত হতে শুরু করবে।

এই ধারণাটা এতটাই যৌক্তিক ছিল যে, প্রায় পুরো বিংশ শতাব্দী ধরেই বিজ্ঞানীরা এটাকেই সত্য ধরে নিয়ে গবেষণা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে ঘটে গেল এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। যা পুরো চিন্তাধারাটাই উল্টে দিল।

সেই সময় বিজ্ঞানীরা দূরবর্তী গ্যালাক্সিতে ঘটে যাওয়া কিছু বিশেষ নক্ষত্র বিস্ফোরণ, যাদের বলা হয় “Type Ia Supernova” পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এই সুপারনোভাগুলো জ্যোতির্বিজ্ঞানে খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এদের উজ্জ্বলতা প্রায় একই রকম হয়। তাই এগুলোকে ব্যবহার করে মহাবিশ্বের দূরত্ব ও প্রসারণের হার মাপা যায়।

বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, এই পর্যবেক্ষণ থেকে তারা প্রমাণ পারবেন যে মহাবিশ্বের প্রসারণ ধীরে হচ্ছে। কিন্তু ফলাফল দেখে তারা হতবাক হয়ে গেলেন। পরিমাপ বলছে, মহাবিশ্বের প্রসারণ ধীরে হচ্ছে না। বরং সময় যত যাচ্ছে, প্রসারণের গতি আরও বেড়ে যাচ্ছে। এটা এমন যেন আপনি বল ছুঁড়ে দিলেম, আর সেটা থামার বদলে নিজে থেকেই আরও জোরে ওপরে উঠে যেতে লাগল।

এই ফলাফল এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে, প্রথমে অনেকেই বিশ্বাসই করতে চাননি। বারবার হিসাব করা হলো, যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা হলো, ভিন্ন ভিন্ন দল আলাদা আলাদা ভাবে একই পর্যবেক্ষণ চালাল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত একটাই দাঁড়াল, মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিতই হচ্ছে না, মহাবিশ্ব ত্বরান্বিত গতিতে প্রসারিত হচ্ছে। আর এই অদ্ভুত ত্বরণের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো অজানা শক্তি কাজ করছে, এই ভাবনা থেকেই জন্ম নিল এক নতুন, রহস্যময় ধারণা। তার নাম “ডার্ক এনার্জি”

ডার্ক এনার্জি: অদেখা চালিকাশক্তি

এই অপ্রত্যাশিত ত্বরণের পেছনে যে শক্তি কাজ করছে, বিজ্ঞানীরা তার নাম দিলেন “ডার্ক এনার্জি”। ডার্ক মানে অন্ধকার, কারণ এটা:

  • আলো শোষণ করে না
  • আলো বিকিরণ করে না
  • সরাসরি ধরা যায় না

কিন্তু এর প্রভাব ভয়ংকর রকম বাস্তব।

আজকের হিসাব অনুযায়ীঃ

উপাদানসাধারণ পদার্থডার্ক ম্যাটারডার্ক এনার্জি
শতাংশ~৫%~২৭%~৬৮%

মানে, আমরা যা দেখি, ছুই, অনুভব করি, সেটা মহাবিশ্বের খুব ছোট অংশ।

ডার্ক এনার্জি আসলে কী?

এখানেই আসে সবচেয়ে বাস্তব সম্মত উত্তর, আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না। কিছু সম্ভাবনা আছে। যেমনঃ

  • খালি জায়গার শক্তি:

কোয়ান্টাম ফিজিক্স বলছে, একেবারে ফাঁকা জায়গাও পুরোপুরি ফাঁকা নয়। সেখানে শক্তি থাকতে পারে। এই শক্তিই হয়তো মহাবিশ্বকে ভেতর থেকে ঠেলে দিচ্ছে।

  •  আইনস্টাইনের Cosmological Constant:

আইনস্টাইন একসময় তার সমীকরণে একটি ধ্রুবক যোগ করেছিলেন, পরে সেটাকে “ভুল” বলে বাদ দেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে হয়তো সেটাই ডার্ক এনার্জির গাণিতিক রূপ।

  •  মহাকর্ষের ভুল বোঝাপড়া:

কিছু বিজ্ঞানী বলেন, হয়তো আমাদের মহাকর্ষের ধারণাই অসম্পূর্ণ।

ডার্ক এনার্জি কি বিপজ্জনক?

প্রশ্নটা কিছুটা অদ্ভুত হলেও যুক্তিসঙ্গত। যদি এই শক্তি আরও শক্তিশালী হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কী হবে?

  •  Big Freeze

সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি। গ্যালাক্সিগুলো দূরে সরে যাবে এবং নতুন নক্ষত্র জন্ম বন্ধ হবে। মহাবিশ্ব ঠান্ডা ও অন্ধকার হয়ে যাবে।

  •  Big Rip

আরও ভয়ংকর সম্ভাবনা। প্রসারণ এত দ্রুত হবে যে গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহসহ সব ধ্বংস হয়ে যাবে। একদিন পরমাণুও টিকে থাকবে না

শেষ ভাবনা: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?

আজ মানুষ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন সে বুঝতে শুরু করেছে যে মহাবিশ্ব স্থির নয়, বরং এক চলমান, প্রসারিত বাস্তবতা। আমরা যা দেখি, তা মহাবিশ্বের খুব সামান্য অংশ। বাকি বিশাল অংশ অদৃশ্য, রহস্যময়।

এডউইন হাবল আমাদের দেখালেন মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে। আলবার্ট আইনস্টাইন-এর পুরোনো ধারণাও আজ নতুন অর্থ পাচ্ছে। তবু সত্যটা হলো, ডার্ক এনার্জি সম্পর্কে আমরা এখনো নিশ্চিত নই। আমরা জানি এটি আছে, কারণ এর প্রভাব আছে। কিন্তু এটি কী, তা এখনো অজানা।

হয়তো ভবিষ্যতে নতুন কোনো আবিষ্কার এই রহস্য উন্মোচন করবে। হয়তো আমদেরই কেউ বলবে, “আমি জানি মহাবিশ্ব কেন এভাবে প্রসারিত হচ্ছে।”

মহাবিশ্ব যত বড়ই হোক, মানুষের প্রশ্ন করার ক্ষমতা তার চেয়েও বড়। আর সেই প্রশ্নই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে অজানার দিকে।


তাহসিনুর রাইয়ান,
নবম শ্রেণির ছাত্র,
বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ে বিশেষ আগ্রহী।
প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইয়ান’স রিডারস কর্নার।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org