বিজ্ঞানী অর্গ এর আয়োজনে “বিজ্ঞানী হওয়ার গল্প” শিরোনামের ঘরোয়া আলোচনায় বসেছিলেন একজন গবেষক, শিক্ষক ও স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষ – কিং আবদুলআজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে কর্মরত প্রফেসর আবদুল হামিদ। স্ক্রিনের একপাশে বাংলাদেশি তরুণদের মুখ, অন্য পাশে জেদ্দার এক কক্ষে বসে থাকা একজন শিক্ষক, যার কণ্ঠে বারবার ফিরে আসছিল দুইটি শব্দ – দায়িত্ব ও কৃতজ্ঞতা। প্রবাসের উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের ভেতরেও তিনি যেন কখনও ভুলে যাননি, তাঁর শুরুটা কোথা থেকে। সেই শুরু গ্রামবাংলার নদীতীরের এক স্কুল থেকে, আর পথের গন্তব্য আজ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সমৃদ্ধ গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়।
গ্রাম থেকে গ্লোবাল ল্যাব: প্রফেসর আব্দুল হামিদের গল্পে বাংলাদেশি বিজ্ঞানের আরেক অধ্যায়
বাংলাদেশের গ্রাম থেকে বিশ্বের গবেষণাগার—এই যাত্রাটি যতটা রোমান্টিক শোনায়, বাস্তবে ঠিক ততটাই রূঢ় ও কঠিন। শিক্ষার অনিশ্চয়তা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, পরিকাঠামোর অভাব, আর সর্বোপরি আত্মবিশ্বাসের সংকট—সবকিছুর ভেতর দিয়েই গড়ে ওঠে একজন গবেষকের জীবনপথ। সৌদি আরবের জেদ্দায় কিং আব্দুলআজিজ ইউনিভার্সিটির তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর আব্দুল হামিদের সাম্প্রতিক এক আলোচনায় এই বাস্তবতাগুলো যেন নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—বিজ্ঞানী হওয়া কোনো একক প্রতিভার গল্প নয়, এ এক দীর্ঘ আর নিরবিচ্ছিন্ন সাধনার ইতিহাস।
পুবনার সাঁথিয়া থেকে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ—এক কিশোরের ভেতর জন্ম নেওয়া স্বপ্ন
পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার সোনাতলা গ্রামে নদীর ধারে বেড়ে ওঠা এক কিশোরের কাছে বিজ্ঞান তখন কোনো বড় ধারণা ছিল না। কৈশোরের স্বপ্ন মানে ছিল মাঠে খেলা, মাছ ধরা আর মুক্ত গ্রামীণ শৈশব। কিন্তু হঠাৎ করেই ভাগ্য তাকে এনে দাঁড় করায় রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের মতো কঠোর শৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠানে। নিজের ভাষায়, “ক্যাডেট কলেজে ঢুকে তিনি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন—বাংলাদেশে “ভালো ছাত্র” হওয়ার শেষ নেই।” তার চারপাশে ছিল এসএসসিতে বাংলাদেশ-ফার্স্ট, ভবিষ্যতের চিকিৎসক, প্রকৌশলী আর শিক্ষাবিদদের সারি। সেখানেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে একটি বোধ—এই দেশ আমার চেয়ে অনেক এগিয়ে, আমাকেও এগোতে হবে।
এই বোধই পরে তাকে ঠেলে দেয় আন্তর্জাতিক ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়ার পথে। সেখানে অনার্স শেষ করে দেশে ফিরে কয়েক বছর শিক্ষকতা, তারপর আবার কোরিয়ায় মাস্টার্স ও পিএইচডি।এরপরের পথচলা একান্তই “যাওয়ার মধ্যে থাকা”র ইতিহাস। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কয়েক বছর, তারপর মদিনার তাইবা বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে চাকরি, আবার বাংলাদেশে ফেরা, এবং একে একে কাজ করা গ্রীন বিশ্ববিদ্যালয়, এআইইউবি, আর শেষ পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে প্রয়াত অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে। এখানেই তাঁর জীবনে যুক্ত হন আরেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ – ড. ফিরোজ মৃধা। দু’জনে মিলে শুরু করেন বাংলাভাষা নিয়ে কম্পিউটিং-ভিত্তিক গবেষণার পরিকল্পনা। কারণ, তখন তাঁরা বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন – বিশ্বজুড়ে যখন মাতৃভাষাভিত্তিক কম্পিউটিংয়ে জোরালো অগ্রগতি, বাংলার ক্ষেত্রে তখনও গবেষণা ছিল বিচ্ছিন্ন, পরিমাণে কম, আর প্রযুক্তি-ইকোসিস্টেমে প্রায় অদৃশ্য। ২০০৯ সালে পিএইচডি শেষ করেই দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কয়েক বছর, তারপর মদিনার তাইবা বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে চাকরি, আবার বাংলাদেশে ফেরা, এবং একে একে কাজ করা গ্রীন বিশ্ববিদ্যালয়, এআইইউবি, আর শেষ পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে প্রয়াত অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে। এখানেই তাঁর জীবনে যুক্ত হন আরেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ – ড. ফিরোজ মৃধা। দু’জনে মিলে শুরু করেন বাংলাভাষা নিয়ে কম্পিউটিং-ভিত্তিক গবেষণার পরিকল্পনা। কারণ, তখন তাঁরা বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন – বিশ্বজুড়ে যখন মাতৃভাষাভিত্তিক কম্পিউটিংয়ে জোরালো অগ্রগতি, বাংলার ক্ষেত্রে তখনও গবেষণা ছিল বিচ্ছিন্ন, পরিমাণে কম, আর প্রযুক্তি-ইকোসিস্টেমে প্রায় অদৃশ্য। তাঁর ভাষায়, “দেশ আর প্রবাস—এই দুয়ের মধ্যেই আমার জীবনটা কেটে যাচ্ছে।”
বাংলা কম্পিউটিং: প্রযুক্তির ভাষায় মাতৃভাষাকে চিনিয়ে দেওয়ার লড়াই
প্রফেসর আব্দুল হামিদের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাজের একটি ক্ষেত্র বাংলা কম্পিউটিং। সহজ ভাষায় বললে, এটি এমন একটি গবেষণা-ক্ষেত্র যেখানে প্রযুক্তিকে শেখানো হয় আমাদের ভাষা বুঝতে—পড়তে, শুনে লিখতে, এমনকি ভুল ধরতেও। কিন্তু এই ‘সহজ’ কথাটার পেছনে লুকিয়ে আছে জটিল ভাষাবৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক সমস্যা।
বাংলা ইংরেজির মতো নয়। ইংরেজিতে বাক্য গঠনের ধারা একরকম, বাংলায় আরেকরকম। ইংরেজিতে “I eat rice”, বাংলায় তা হয় “আমি ভাত খাই।” শব্দের অবস্থান বদলায়, একই উচ্চারণে ভিন্ন অর্থ তৈরি হয়—“অন্য” আর “অন্ন”—শুনতে কাছাকাছি, অর্থে আকাশ-পাতাল তফাৎ। এই অস্পষ্টতা কম্পিউটারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণেই প্রফেসর আব্দুল হামিদের দল কাজ করছে স্পিচ-টু-টেক্সট, টেক্সট রিট্রিভাল, বানান সংশোধন এবং প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণের (NLP) মতো জটিল ক্ষেত্রে।
তাঁদের উদ্যোগে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অ্যাডভান্সড মেশিন লার্নিং ল্যাব। এই ল্যাব কেবল গবেষণার কেন্দ্রই নয়, বরং এক প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীকে প্রযুক্তির সঙ্গে বাংলা ভাষাকে যুক্ত করার প্রশিক্ষণও দিচ্ছে। তাঁর মতে, “আমরা শুধু বাংলা টাইপিং শিখছি না, আমরা চাই—কম্পিউটার যেন বাংলা বোঝে।”
কোভিড থেকে ক্যান্সার: গবেষণার পথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা মেশিন লার্নিংয়ের আলোচনায় প্রফেসর আব্দুল হামিদ চলে যান বাস্তব উদাহরণে। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ যখন পুরো পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে, তখন তাঁর দল বসে ভাবছিল—লকডাউন কতটা হলে অর্থনীতি বাঁচবে, আর কতটা হলে মানবজীবন? বাস্তব জগতে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রাজনীতি, স্বাস্থ্যনীতি ও অর্থনীতির ঘোর অন্ধকারে ঠোক্কর খেয়েছে বহু সরকার। ডেটা সংগ্রহ কঠিন, গোপনীয়তার জটিলতা আলাদা; ফলে সরাসরি রিয়্যাল-ওয়ার্ল্ড ডেটা দিয়ে গবেষণা করা সহজ নয়। তাই প্রফেসর হামিদরা যা করলেন, তা হলো একটি কাল্পনিক দেশ বানিয়ে ফেলা – ধরা যাক ১০,০০০ মানুষের একটি জনসংখ্যা, যেখানে সংক্রমণ, মৃত্যু, সুস্থ হয়ে ওঠা এবং লকডাউনের ধরন বদলানো – সবকিছুই সিমুলেশন।
এই “কাল্পনিক দেশ”কে সামনে রেখে তাঁরা রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং পদ্ধতি ব্যবহার করে কম্পিউটারকে শেখালেন, কেমন ধরনের লকডাউন সাইকেল দিলে মৃত্যু কম থাকে, রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে থাকে, আবার অর্থনীতিও পুরোপুরি ধস নামে না। দুই সপ্তাহ পর পর লকডাউন বনাম এক মাস পর, ৪৫ দিন পর কিংবা ৬০ দিন পর লকডাউন – প্রতিটি পরিস্থিতি মডেল করে দেখা হয়েছে। ফলাফলটি পরে প্রকাশিত হয় নেচার পাবলিশার্সের সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে। গবেষণাটি দেখিয়েছে, নিখুঁত “সম্পূর্ণ খোলা” বা “সম্পূর্ণ বন্ধ” – কোনোটা নয়; বরং সুনির্দিষ্ট ব্যবধানে ‘সাইক্লিক লকডাউন’ বাস্তবায়ন করলে অনেক ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য দুয়েরই তুলনামূলক ভাল ভারসাম্য রাখা সম্ভব।
এর ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক জার্নালে। দেখা গেছে, একটানা কঠোর লকডাউন যেমন অর্থনীতিকে ভেঙে ফেলে, তেমনি ঢিলেঢালা নিয়ন্ত্রণ মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে। সবচেয়ে কার্যকর হলো পর্যায়ক্রমিক, চক্রাকারে লকডাউন—যেখানে সংক্রমণও নিয়ন্ত্রণে থাকে, অর্থনীতিও সচল থাকে।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর দল কাজ শুরু করেছে কৃষি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিকে। প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার—পাতার রং দেখে রোগ শনাক্ত করা, ফসলের ধরন চেনা, ফলের মান নির্ধারণ—সব কিছুই এখন মেশিন লার্নিংয়ের সাহায্যে সম্ভব। পাশাপাশি ব্রেস্ট ক্যান্সারের মতো রোগের ক্ষেত্রে ইমেজ প্রসেসিং ব্যবহার করে দ্রুত শনাক্তকরণ—এমন গবেষণায়ও জড়িত তাঁর দল। উদ্দেশ্য একটাই: প্রযুক্তিকে মানুষের জীবন বাঁচানোর হাতিয়ার করা।
তরুণদের উদ্দেশে সরল বার্তা: গণিতকে বন্ধু বানাও
একজন কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীর প্রশ্নের উত্তরে প্রফেসর আব্দুল হামিদ যেন পুরো প্রজন্মের জন্য কথাটা বলে দিলেন—“মেশিন লার্নিং শিখতে চাইলে আগে গণিতকে আঁকড়ে ধরো।” ইউটিউব থেকে শেখা ভালো, কোডিং শেখা ভালো—কিন্তু তার ভেতরের গণিত বোঝা না গেলে সবই অগভীর থেকে যাবে। ক্যালকুলাস, সম্ভাবনা, বীজগণিত—এই বিষয়গুলোই ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আসল মেরুদণ্ড।
তিনি তরুণদের বলেন, প্রযুক্তিকে কেবল চাকরির মাধ্যম ভাবলে চলবে না—এটি হতে পারে সমাজ বদলের অস্ত্র। পাসপোর্ট অফিস থেকে হাসপাতাল, কৃষিখেত থেকে শ্রেণিকক্ষ—যেখানে সমস্যা আছে, সেখানেই প্রযুক্তির প্রয়োগ সম্ভব।
দান, দারিদ্র্য ও গণিত: এক মানবিক স্বপ্নের রূপরেখা
এই সব “টেকনিক্যাল” আলোচনার মাঝখানেও প্রফেসর হামিদের চিন্তার আরেকটি দিক খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে – দারিদ্র্য ও বৈষম্য নিয়ে তাঁর অস্থিরতা। তিনি স্বীকার করেন, পৃথিবীতে সম্পদের পরিমাণ বাড়ছে, কিন্তু চরম দারিদ্র্য আজও নির্মূল হয়নি; বরং বহু দেশে বৈষম্য ক্রমে বাড়ছে। তাঁর সাম্প্রতিক এক কনফারেন্স পেপারে তিনি কল্পনা করেছেন এক ধরনের “গণিতভিত্তিক কল্যাণ মডেল” – যেখানে দান-খয়রাত এককালীন সহানুভূতির জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে পরিকল্পিত বিনিয়োগে পরিণত হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি ধরেছেন একটি নুডলস ফ্যাক্টরি। একটি অঞ্চলের চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে একটি ছোট কারখানা গড়ে তোলা হলে, সেখানে নিরক্ষর বা কম শিক্ষিত মানুষও শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে পারে। নুডলস পরিবহনের জন্য চালক, সরবরাহের জন্য রিটেইল শপ – একেকটি ধাপ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে। দানের অর্থকে এভাবে বিনিয়োগে রূপান্তর করে, গণিত দিয়ে হিসাব করে, কত দিনে কত পরিবার খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে – এমনই একটি মডেল তৈরির চেষ্টা চলছে তাঁর গবেষণায়।
এই ভাবনার পেছনে কাজ করছে একটি বড় নৈতিক প্রশ্ন – আমরা কি সত্যিই আমাদের অতিরিক্ত সম্পদ দিয়ে মানবতার পক্ষে দাঁড়াতে প্রস্তুত? নাকি কেবল সুদের হার আর মুনাফার গ্রাফ দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে চাই? প্রফেসর হামিদের স্বপ্ন, ভবিষ্যতের কোনো এক বিশ্বে অর্থনীতির কেন্দ্রে থাকবে মানবতা, যেখানে বিত্তবানদের ডোনেশন কেবল “ভালো কাজ করেছি” বলে ছবি তোলার উপাদান হবে না; বরং সুসংগঠিত পরিকল্পনার মাধ্যমে দারিদ্র্য থেকে মানুষকে টেনে তোলার কার্যকর হাতিয়ার হবে।
তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে এক নতুন ভাবনা—ডোনেশনকে কেবল দান না করে বিনিয়োগ হিসেবে ভাবা। কোনো অঞ্চলে যদি কৃষিভিত্তিক প্রকল্প, ছোট শিল্প বা খাদ্য উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা যায়, তবে ওই এলাকার মানুষ শুধু সাহায্য পাবে না—পাবে কাজ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ। দানের অর্থ গণিতের মডেল দিয়ে বণ্টন হলে কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই একটি কমিউনিটি স্বাবলম্বী হতে পারে—এটাই তাঁর বিশ্বাস।
ব্যক্তিগত দর্শন
অবশেষে, ব্যক্তিগত জীবনদর্শন প্রসঙ্গে তিনি যখন বলেন, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া মানুষের পরিণত উপলব্ধি। ছোটবেলায় তিনি হয়তো শুধু বেশি পড়াশোনা করতে চাইতেন, শিক্ষক হতে চাইতেন, ছাত্রদের সঙ্গে থাকতে চাইতেন। আজও সেই স্বপ্নের মূল সুর বদলায়নি। এখনও তিনি নিজেকে সবচেয়ে বেশি স্বচ্ছন্দে খুঁজে পান ক্লাসরুমে, ল্যাবে, ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনায়। শুধু যোগ হয়েছে আরেকটি স্তর – দায়িত্বের বোধ। দায়িত্ব, শুধু নিজের ক্যারিয়ার নয়; দায়িত্ব, বাংলাদেশের তরুণদের জন্য কিছু করে যাওয়ার; দায়িত্ব, বাংলাভাষাকে প্রযুক্তির মূলধারায় তোলার; দায়িত্ব, বিজ্ঞান ও গণিত দিয়ে দারিদ্র্যমুক্ত এক মানবিক পৃথিবীর কল্পনাকে একটু হলেও বাস্তবের কাছাকাছি আনার।
উপসংহার: বিজ্ঞান মানেই মানবতার খোঁজ
প্রযুক্তির যুগে বিজ্ঞানীর গল্প মানে শুধু ল্যাবের কাহিনি নয়, বরং মানুষের গল্প। প্রফেসর আবদুল হামিদের গল্প সেই অর্থে আমাদের সময়ের এক প্রতিনিধিত্বশীল বয়ান। সেই বয়ান তরুণদের উদ্দেশে একটুকু নির্ভীক আহ্বানও রেখে যায় – নিজেকে প্রস্তুত করো, শিখে যাও, ভাবতে শিখো, আর ভুলে যেয়ো না, তোমার জ্ঞান কেবল তোমার জন্য নয়; সমগ্র সমাজের জন্য একটি দায়, একটি প্রতিশ্রুতি।
প্রফেসর আব্দুল হামিদের গল্প কেবল একজন শিক্ষকের ক্যারিয়ার নয়—এ এক দর্শন। গ্রাম থেকে গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়, কোড থেকে সমাজনীতি, গবেষণা থেকে মানবিকতা—এই পথে হাঁটা মানুষটির জীবনে বিজ্ঞান কখনো আলাদা কিছু নয়। তাঁর কাছে বিজ্ঞানের মানে হলো মানুষকে বোঝা, মানুষের জন্য কাজ করা।
বাংলাদেশের তরুণরা যদি এই দৃষ্টিভঙ্গিটুকু ধারণ করতে পারে—তবে কোনো ল্যাবের যন্ত্র না থাকলেও দেশে বিজ্ঞান থেমে থাকবে না। কারণ বিজ্ঞান তখন থাকবে মানুষের ভেতরেই।
প্রফেসর আব্দুল হামিদের সাক্ষাৎকারের ভিডিওটি ইউটিউবে নিম্নের লিংক এ দেখুন: 👇👇👇

Leave a comment