অতিথি লেখক:
প্রফেসর ড. মোহা: ইয়ামিন হোসেন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ, বড় বড় স্থাপনা বা অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের উপর নির্ভর করে না। একটি জাতির প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার মানুষের উপর। মানুষ যদি শিক্ষিত, দক্ষ, সৃজনশীল এবং নৈতিক হয়, তবে সেই জাতি অগ্রগতির পথে দ্রুত এগিয়ে যায়। কিন্তু যে জাতি শিক্ষাকে অবহেলা করে এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব দেয় না, সেই জাতির ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ইতিহাস ও বাস্তবতা উভয়ই এই সত্যকে প্রমাণ করে।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব:
শিক্ষা একটি জাতির উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। শিক্ষা মানুষকে শুধু জ্ঞান দেয় না, বরং চিন্তা করার ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং সৃজনশীলতা তৈরি করে। একটি শিক্ষিত জনগোষ্ঠী নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারে, নতুন শিল্প গড়ে তুলতে পারে এবং সমাজকে উন্নয়নের পথে পরিচালিত করতে পারে।
মানবসম্পদ উন্নয়ন বলতে বোঝায় মানুষের দক্ষতা, জ্ঞান, স্বাস্থ্য, নৈতিকতা এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করা। একটি রাষ্ট্র যদি তার মানুষের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করে, তবে সেই মানুষই দেশের অর্থনীতি, শিল্প, বিজ্ঞান এবং প্রশাসনকে শক্তিশালী করে তোলে।
শিক্ষা অবহেলার পরিণতি:
যে সমাজে শিক্ষা গুরুত্ব পায় না, সেখানে অজ্ঞতা, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। শিক্ষার অভাব মানুষের চিন্তার পরিসর সংকুচিত করে এবং সমাজে কুসংস্কার ও অপরাধের প্রবণতা বাড়ায়।
এছাড়া শিক্ষার অভাবে একটি দেশের কর্মশক্তি দক্ষ হয়ে উঠতে পারে না। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সেই দেশ পিছিয়ে পড়ে। শিল্প, প্রযুক্তি এবং গবেষণার ক্ষেত্রে অগ্রগতি ধীর হয়ে যায়।
উন্নত দেশগুলোর উদাহরণ:
বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ তাদের উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে গ্রহণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, Japan দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।
একইভাবে South Korea শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির উপর জোর দিয়ে কয়েক দশকের মধ্যেই দরিদ্র দেশ থেকে উন্নত শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হয়েছে।
এই দেশগুলো বুঝেছিল যে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে মানুষের মেধা ও দক্ষতা অনেক বড় সম্পদ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। এখানে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে, যা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে দেশের জন্য বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে। কিন্তু যদি শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু ডিগ্রি উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং দক্ষতা উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তাহলে এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশে গবেষণা, প্রযুক্তি শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষাকে বাস্তবমুখী করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় পাস করার জন্য নয়, বরং বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
করণীয়:
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন—
১. শিক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
২. কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া।
৩. গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ তৈরি করা।
৪. শিক্ষাকে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত করা।
৫. তরুণদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা।
উপসংহার:
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সেই জাতি তার মানুষকে কতটা গুরুত্ব দেয় তার উপর। শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে অবহেলা করলে কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে উন্নতির পথে টিকে থাকতে পারে না। তাই একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়তে হলে শিক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার খনিজ, নদী বা স্থাপনা নয়—তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো শিক্ষিত, দক্ষ ও সৎ মানুষ।
বিদ্র: ফেসবুক থেকে সংগ্রহীত: https://www.facebook.com/share/p/18NX8vKDN5/

Leave a comment