উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগগবেষণায় হাতে খড়ি

তোমার কল্পনাই এখন সবচেয়ে শক্তিশালী যন্ত্র

Share
Share

ঢাকার কোনো এক কলেজের ছাদে দাঁড়িয়ে এক ছাত্র আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। নিচে যানজটের শব্দ, উপরে মেঘের ভেলা। তার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরে ফিরছে, “এই শহরে যদি বৃষ্টি দ্বিগুণ হয়, কী হবে?” সে জানে না, এই ‘যদি’-এর নামই একদিন বিজ্ঞানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হবে—সিমুলেশন। কারণ বাস্তবে কিছু করার আগে মানুষ প্রথমে কল্পনায় পরীক্ষা চালায়। কিছু ভাঙা লাগে না, কিছু পোড়াতে হয় না, কেবল একটা স্ক্রিন জ্বালিয়ে পুরো পৃথিবী চালানো যায়।

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে সিদ্ধান্ত আগে কম্পিউটারে হয়, তারপর বাস্তবে। যুদ্ধের কৌশল, শহরের নকশা, ওষুধের ডোজ, স্টকের দাম, এমনকি মানুষের আচরণ—সবকিছুই আজ আগে ‘চালিয়ে দেখা’ হয়। এই চালিয়ে দেখার ভাষার নাম মডেলিং। আর সেই মডেল যখন প্রাণ পায়, তখন তাকে বলে সিমুলেশন। বাস্তব জগতে নামার আগে নিরাপদ আঙিনায় পরীক্ষা চালানোর এই ক্ষমতাই আজ আধুনিক বিজ্ঞানকে অলিম্পিকে নামিয়েছে, যেখানে জয় করতে হলে কল্পনাকে হিসাবের ছকে বাঁধতে হয়।

বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে সিমুলেশন শুনলে অনেকের কাছে এটা বিলাসিতা মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে এটা বাঁচার টুল। ঘূর্ণিঝড় আসার আগে উপকূলে কাকে সরাতে হবে, কত ঘণ্টা আগে সতর্ক করতে হবে—এই সিদ্ধান্তগুলো এখন আর অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এগুলো দাঁড়িয়ে আছে মডেলের ওপর। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত চার দশকে আগাম সতর্কবার্তা ও মডেলিং উন্নয়নের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যুহার প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশের মতো দেশে এই সংখ্যা আরও বেশি অর্থবহ, কারণ এখানে প্রতিটি সঠিক পূর্বাভাস মানে কয়েক হাজার প্রাণ।

কোভিডের দিনগুলো মনে আছে? লকডাউন কবে হবে, স্কুল খুলবে কি না, ভ্যাকসিনের ডোজ কতটা নিরাপদ—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল রাজনীতিবিদরা দেননি, কম্পিউটার দিয়েছে। লাখ লাখ কল্পিত মানুষকে কম্পিউটারের ভেতরে অসুখ করানো হয়েছে, সুস্থ করা হয়েছে, ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে, যাতে বাস্তব মানুষ বাঁচে। এই নিষ্ঠুর শোনানো কল্পনাই বাস্তবে মানবিক সিদ্ধান্তের জন্ম দিয়েছে। সিমুলেশন না থাকলে আমরা অন্ধের মতো হাঁটতাম।

শিল্পের ভাষায় সিমুলেশন মানে খরচ বাঁচানো, ভুল কমানো, ভবিষ্যৎ আগাম দেখা। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসাব বলছে, ডিজিটাল টুইন ও ভার্চুয়াল মডেলিং ব্যবহার করে উৎপাদনশিল্পে বছরে প্রায় কয়েকশ’ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। জার্মানির কারখানায় আজ নতুন মেশিন বসে না, আগে বসে তার ভার্চুয়াল ছায়া। তাতে বোঝা যায়, কোথায় তাপ বাড়বে, কোথায় স্ক্রু আলগা হবে, কোথায় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বাস্তবে নামার আগেই মেরামত হয়ে যায় ভবিষ্যৎ।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই কল্পনার শক্তি যেন জীবনের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। হৃদযন্ত্রে অস্ত্রোপচারের আগে এখন ডাক্তাররা রোগীর ডিজিটাল হৃদয় চালিয়ে দেখেন। কোন কাটে রক্ত কম পড়বে, কোন পথে গেলে ঝুঁকি বেশি—এই সব হিসাব আগে হয়ে যায় কম্পিউটারে। গবেষণা বলছে, সার্জারির আগে ভার্চুয়াল সিমুলেশন চললে জটিলতার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমে। এই কমে যাওয়ার পেছনে কোনো যাদু নেই, আছে কল্পনাকে বিজ্ঞান বানানোর ক্ষমতা।

বাংলাদেশে আমরা যখন বলি, “এত উন্নত জিনিস আমাদের জন্য না”, তখনই আমরা সবচেয়ে বড় ভুলটা করি। কারণ সিমুলেশন সবচেয়ে দরকার আমাদেরই। এখানে ভুলের দাম বেশি, বাজেট কম, সময় কম। সুতরাং আগে না দেখে ঝাঁপ দেওয়া মানেই বিপদ ডাকা। নদীর বাঁধ চওড়া হবে কি না, মেট্রোরেল কেমন চাপ নেবে, নতুন হাসপাতাল কত রোগী ধরবে—এসবই নকশার খাতায় নয়, এখন স্ক্রিনে লেখা হয়। সমস্যা যেখানে বড়, সেখানে ভার্চুয়াল ভুলের মূল্য বাস্তব ভুলের চেয়ে অনেক কম।

কিন্তু এই প্রযুক্তি কেবল ইঞ্জিনিয়ারদের খেলনা না। একজন অর্থনীতিবিদ দেশের বাজেটের মডেল বানান, একজন সমাজবিজ্ঞানী মানুষের অভিবাসনের পথ আঁকেন, একজন পরিবেশবিদ বনভূমির ভবিষ্যৎ কল্পনা করেন। সবাই একসঙ্গে একই খেলায় আছে—ভবিষ্যৎ দেখার খেলায়।

আইনস্টাইন বলেছিলেন, কল্পনা জ্ঞানের চেয়ে বড়। আজ তার প্রমাণ দাঁড়িয়ে আছে সার্ভারের ঘরে, কোডের লাইনে, গ্রাফের বাঁকে। ডারউইন যদি আজ বেঁচে থাকতেন, হয়তো গ্যালাপাগোসে গিয়ে পাখি ধরতেন না, আগে তার কম্পিউটারে হাজারটা দ্বীপ বানাতেন। নিউটন আপেল পড়ার আগেই তার মডেল বলে দিত, কোথায় পড়বে।

তুমি যে এই লেখাটা পড়ছ, হয়তো ভাবছ, “এগুলো তো বিশাল ব্যাপার, আমার হাতে কী?” কিন্তু মনে রেখো, আজকের বড় সিমুলেশনের জন্ম হয়েছে ছোট কৌতূহল থেকে। আজ তোমার ফোনে যে গেম খেলছ, সেটাও এক ধরনের সিমুলেশন। খেলতে খেলতে তুমি আগাম জানো, কোন পথে গেলে হার, কোন পথে গেলে জয়। জীবনও ঠিক এমনই এক গেম, যেখানে ভুল করার ফ্রি ট্রায়াল পাওয়া যায় কেবল কল্পনায়।

তুমি যদি সত্যিই বিজ্ঞানী হতে চাও, তাহলে শুধু জগৎকে দেখা না, জগৎকে বানাতে শেখো। নিজের মতো করে একটা শহর বানিয়ে দেখো, একটা নদী চালাও, একটা রোগ ছড়াও, একটা ব্যবসা দাঁড় করাও—ভার্চুয়াল হলেও শেখাটা বাস্তব।

এই দেশের ভবিষ্যৎ কোনো মন্ত্রে বদলাবে না, বদলাবে মডেলে। আমরা যত শিগগির বুঝব, তত কম কষ্ট হবে। আর এই বোঝাটা শুরু হয় তোমার মতো একাকী পাঠকের ভেতর থেকে।

আজ রাতেই তুমি যদি গুগলে লিখে ফেলো, “How to build a simple simulation,” তবে সেটা হবে তোমার ভবিষ্যতের প্রথম কোডলাইন।

আর কল্পনাকে যেদিন তুমি বাস্তবের নিয়মে চালাতে শেখো, সেদিন বুঝবে, বিজ্ঞান মানে কেবল জানা না, বিজ্ঞান মানে আগাম দেখা।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org