বাংলাদেশে কৃষি নিয়ে কথা উঠলেই অনেক সময় একটি আশঙ্কার কথা শোনা যায়—বীজ কোম্পানিগুলো নাকি কৃষকদের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করছে। একবার কোনো কোম্পানির বীজ ব্যবহার করলে কৃষক নাকি প্রতিবছর বাধ্য হয়ে সেই কোম্পানির কাছ থেকেই বীজ কিনতে হয়। এই ভয় শুধু গ্রামেই নয়, শহরের শিক্ষিত মহলেও ছড়িয়ে আছে। কিন্তু উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরীর মতে, বিষয়টি এতটা সরল বা একপাক্ষিক নয়। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “বীজকে কেন্দ্র করে যদি ব্যবসা না হয়, কৃষিতে বিনিয়োগ আসবে না।”
বীজ কি কেবল ‘ব্যবসার পণ্য’?
বীজকে আমরা অনেক সময় শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে ভাবতে চাই। কিন্তু আধুনিক কৃষিতে বীজ মানে গবেষণা, প্রযুক্তি ও দীর্ঘদিনের পরীক্ষার ফল। একটি উন্নত জাতের বীজ তৈরি করতে বিজ্ঞানীদের বছরের পর বছর গবেষণা করতে হয়, মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা চালাতে হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাচাই করতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। ড. আবেদ চৌধুরীর মতে, যদি এই বিনিয়োগের জন্য একটি টেকসই ব্যবসায়িক কাঠামো না থাকে, তাহলে কেউ দীর্ঘমেয়াদে উন্নত বীজ তৈরিতে আগ্রহী হবে না।
তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন দৈনন্দিন জীবনের একটি সাধারণ উদাহরণ দিয়ে। মানুষ যেমন নিজের টুথব্রাশ বা টুথপেস্ট নিজে বানায় না, তেমনি উন্নতমানের বীজ উৎপাদনও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান দ্বারা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কৃষক বীজ কিনবেন, যেমন তিনি সার বা কীটনাশক কেনেন। এতে মৌলিকভাবে কোনো অন্যায় নেই, যদি কৃষকের সামনে বিকল্প থাকে এবং দাম ন্যায্য হয়।
মনোপলি ভীতি: বাস্তব সমস্যা কোথায়?
বীজ ব্যবসা নিয়ে ভয় তৈরি হয় তখনই, যখন কৃষকের সামনে বিকল্প সীমিত হয়ে যায়। কোনো একটি কোম্পানির বীজের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়লে কৃষক সত্যিই ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ড. আবেদ চৌধুরী মনে করেন, সমস্যাটা ব্যবসার ধারণায় নয়, বরং একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের সম্ভাবনায়। যদি নীতিমালার মাধ্যমে কৃষকের অধিকার নিশ্চিত করা যায়, যদি বাজারে একাধিক মানসম্মত বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থাকে, তাহলে কৃষক নিজের প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী বীজ বেছে নিতে পারবেন।
বাংলাদেশে হাইব্রিড বীজ নিয়েও অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। হাইব্রিড বলতে বোঝায় দুটি ভিন্ন জাতের গাছের বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে উন্নত একটি নতুন জাত তৈরি করা। এতে ফলন বেশি হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষক প্রতিবছর নতুন হাইব্রিড বীজ কিনতে বাধ্য হন, কারণ আগের বছরের বীজ থেকে একই মানের ফসল পাওয়া যায় না। ড. আবেদ চৌধুরী এটাকে প্রযুক্তির একটি সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখেন, শোষণ হিসেবে নয়। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কৃষকের কাছে বিকল্প থাকা জরুরি—হাইব্রিডের পাশাপাশি উন্নত মানের সাধারণ জাতের বীজও যেন সহজলভ্য থাকে।
কৃষকের অধিকার ও ন্যায্যতার প্রশ্ন
ড. আবেদ চৌধুরীর দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৃষকের পছন্দের স্বাধীনতা। কৃষক চাইলে নিজের সংরক্ষিত বীজ ব্যবহার করবেন, চাইলে কোম্পানির উন্নত বীজ কিনবেন—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কৃষকের হাতেই থাকা উচিত। কোনো নীতিমালা বা ব্যবসায়িক চুক্তির মাধ্যমে কৃষককে জোর করে নির্দিষ্ট উৎসের বীজ কিনতে বাধ্য করা হলে সেটাই হবে প্রকৃত অন্যায়।
এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, বীজের মান নিয়ন্ত্রণ করা এবং কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করা—এই তিনটি দায়িত্ব সরকারের। ন্যায্য মূল্য ও মানসম্মত বীজ নিশ্চিত না করতে পারলে কৃষি ব্যবস্থার প্রতি কৃষকের আস্থা নষ্ট হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো খাদ্য ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়।
টেকসই কৃষির পথে সমন্বয়ের প্রয়োজন
ড. আবেদ চৌধুরীর মতে, বীজ ব্যবসাকে পুরোপুরি অস্বীকার করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি ব্যবসার নামে কৃষককে শোষণ করাও গ্রহণযোগ্য নয়। টেকসই কৃষির জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক বীজ উন্নয়ন, নৈতিক ব্যবসায়িক কাঠামো এবং শক্তিশালী নীতিনির্ধারণের সমন্বয়। এই তিনটি একসঙ্গে কাজ করলেই কৃষক উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা পাবেন, আর দেশ পাবে স্থিতিশীল খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা।
বাংলাদেশের কৃষিকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে বীজকে ঘিরে চলমান ভুল ধারণা ও অযথা ভয় কাটিয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা জরুরি। বীজ শুধু পণ্য নয়, এটি কৃষির প্রাণ; আবার বিজ্ঞান ও বিনিয়োগ ছাড়া এই প্রাণ টিকেও থাকতে পারে না।
ড. আবেদ চৌধুরীর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment