ল্যাবরেটরিতে কোষ নিয়ে গবেষণা মানেই সাধারণত আমরা কল্পনা করি একটি সমতল পাত্রে রাখা কোষ, মাইক্রোস্কোপের নিচে দেখা হচ্ছে তাদের আচরণ। কিন্তু মানুষের শরীর কি সমতল? বাস্তবে কোষগুলো থাকে ত্রিমাত্রিক বা থ্রি-ডাইমেনশনাল পরিবেশে—চারপাশে অন্য কোষ, আঁশের মতো কাঠামো ও নানা রাসায়নিক সংকেতের ভিড়। এই বাস্তব পরিবেশের কাছাকাছি গিয়ে কোষের আচরণ বোঝাই আধুনিক বায়োমেডিক্যাল গবেষণার বড় চ্যালেঞ্জ। ড. বাশার ইমন এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে গিয়ে একটি নতুন ধরনের যন্ত্র ও পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছেন।
তিনি বলেন, “থ্রি-ডাইমেনশনাল এনভায়রনমেন্টে কোষের বল পরিমাপ করা যায়।” এই কথাটির ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি বড় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি। কোষগুলো কেবল বসে থাকে না; তারা একে অপরকে ঠেলে, টানে এবং চারপাশের কাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপ বা বল (force) কোষের আচরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নরম পরিবেশে কোষ শান্ত থাকে, কিন্তু শক্ত পরিবেশে তারা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
এই বল পরিমাপ করার জন্য ড. ইমন ন্যানো-নিউটন মাত্রার সেন্সর তৈরি করেছেন। ন্যানো-নিউটন মানে খুবই ক্ষুদ্র পরিমাণ বল—যেটা সাধারণ যন্ত্র দিয়ে ধরা সম্ভব নয়। অনেকটা যেমন একটি পিঁপড়ার পা দিয়ে টান দিলে যে অতি সামান্য চাপ পড়ে, সেটাকেও ধরতে পারে এই ধরনের সংবেদনশীল যন্ত্র। তিনি মাইক্রোফ্যাব্রিকেশন নামের একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে পিডিএমএস (PDMS) নামের রাবারের মতো নমনীয় উপাদান দিয়ে এই সেন্সর তৈরি করেন। এই সেন্সরটি স্প্রিংয়ের মতো আচরণ করে—কোষ টানলে বা চাপ দিলে সেটি সামান্য বেঁকে যায়, আর সেই বেঁকে যাওয়ার পরিমাণ থেকে কোষের প্রয়োগ করা বল হিসাব করা যায়।
এই যন্ত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি কোষের জন্য ত্রিমাত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে পারে। আগে বেশির ভাগ গবেষণায় কোষকে দুই মাত্রায় চাষ করা হতো, যা মানুষের শরীরের প্রকৃত পরিবেশকে পুরোপুরি অনুকরণ করে না। থ্রি-ডি পরিবেশে কোষের আচরণ অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হয়। ফলে গবেষণার ফলাফলও বাস্তব জীবনের কাছাকাছি যায়।
এই উদ্ভাবন শুধু ক্যান্সার গবেষণার জন্য নয়। সুস্থ টিস্যু কীভাবে গঠিত হয়, ক্ষত সারানোর সময় কোষগুলো কীভাবে একে অপরের সঙ্গে কাজ করে, এমনকি বৈদ্যুতিক বা চৌম্বক সংকেতের প্রভাবে টিস্যুর আচরণ কীভাবে বদলায়—এসব বিষয় বোঝার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে। অর্থাৎ একটি মৌলিক গবেষণা সরঞ্জাম ভবিষ্যতে নানা ধরনের চিকিৎসা ও জৈবপ্রযুক্তিগত প্রয়োগের পথ খুলে দিতে পারে।
ড. বাশার ইমনের এই কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বড় বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি অনেক সময় ছোট কিন্তু সূক্ষ্ম যন্ত্রের হাত ধরেই আসে। নতুন যন্ত্র মানে নতুন চোখ। আর নতুন চোখে দেখা মানেই প্রকৃতির অজানা দিকগুলো ধীরে ধীরে উন্মোচিত হওয়া।
বাংলাদেশি একজন গবেষকের হাতে এমন একটি প্রযুক্তির জন্ম দেশের তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। এটি দেখায়, সীমিত সুযোগের দেশ থেকে এসেও বৈশ্বিক গবেষণার মূলধারায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব—যদি থাকে কৌতূহল, অধ্যবসায় ও নতুনভাবে ভাবার সাহস।
🔗 পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার পড়ুন:

Leave a comment