রাত প্রায় বারোটা। গ্রামের স্কুলপড়া সেই ছেলেটা প্রথমবারের মতো শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বসে আছে। সামনে মোটা একখানা বই, পাশে নোটবুক। কিন্তু চোখের সামনে অক্ষরগুলো কেমন যেন ঝাপসা। মাথার ভেতর অন্য এক চাপ। আজ বাসা থেকে মা ফোন করেছে, বলেছে, “তুই সময়মতো খাস তো?” সে উত্তর দিয়েছে, “হ্যাঁ মা।” অথচ সে জানে, সময়টা তার হাতের মুঠো থেকে যেন একটু একটু করে গলে যাচ্ছে। ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট, টিউশনি, হলে ফেরার লম্বা রাস্তা, গবেষণার জন্য পড়া আর মাথার ভেতর লুকিয়ে থাকা বড় স্বপ্ন, সব মিলিয়ে সময়টা যেন তার সবচেয়ে দামী অথচ সবচেয়ে দুর্লভ সম্পদ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এমন এক দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে যায়। দিনের বেশিরভাগ সময় কেটে যায় ‘বাঁচার কাজে’, আর বাকি সময়টুকু থাকে ‘বড় হওয়ার স্বপ্নে’। বাস্তবতা নির্মম। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের তরুণদের এক বড় অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি আয় করার কাজে যুক্ত, কারণ পরিবারের আর্থিক চাপ তাদের পেছন ফিরে তাকানোর সুযোগ দেয় না। UNESCO বলছে, আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য মাথাপিছু ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে কম, আর গবেষণায় বরাদ্দ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক তিন শতাংশের মতো, যেখানে OECD (অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা) দেশগুলোতে এই হার প্রায় দুই থেকে আড়াই শতাংশ। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, এগুলো প্রতিদিন হাজারো তরুণের ক্লান্ত চোখ আর অঘুমী রাতের গল্প।
এই বাস্তবতায় সময় কেবল ঘড়ির কাঁটার হিসাব নয়, সময় হয়ে ওঠে চরিত্রের মাপকাঠি। কেউ সময়ের ওপর দাঁড়িয়ে এগিয়ে যায়, কেউ সময়ের নিচে চাপা পড়ে থেমে যায়। বিজ্ঞানী হতে চাওয়ার প্রথম পরীক্ষাই এখানে। আলবার্ট আইনস্টাইন ছাত্রজীবনে পরীক্ষায় খুব ভালো ছিলেন না, কিন্তু তিনি জানতেন কোন সময়টা প্রশ্ন করার, আর কোন সময়টা নীরবে ভাবার। মেরি কুরি দিনের পর দিন ল্যাবরেটরিতে থেকেছেন, ঘুমের সময় ধার করে নিয়েছেন গবেষণার জন্য। নিউটন তার জীবনের সেরা আবিষ্কারগুলো করেছেন একান্ত নির্জনতায়, যখন পৃথিবী যেন তাকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল। আমাদের দেশের আবদুস সালামও পাকিস্তানের একটি প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে এসে বিশ্ব বিজ্ঞানের মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছিলেন, কারণ তিনি সময়কে শুধুই ব্যস্ততা দিয়ে নয়, দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ভাগ করেছিলেন।
সময়ের সঙ্গে গবেষণার ভারসাম্য আসলে একটা জীবনের ভারসাম্য। ক্লাসে উপস্থিত থাকা মানেই শেখা নয়, আর সারারাত জেগে থাকা মানেই গবেষণা নয়। কখনো কখনো সবচেয়ে ফলপ্রসূ গবেষণা হয় চুপ করে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে, নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলোকে শোনার সময়। বাংলাদেশে অধিকাংশ শিক্ষার্থী শেখে মুখস্থ করতে, সময় থাকে না ভাবতে। অথচ বিজ্ঞান মুখস্থের চেয়েও অনেক বেশি, বিজ্ঞান ধৈর্যের শিল্প। তুমি যদি একটুখানি সময় প্রতিদিন নিজের চিন্তার জন্য বাঁচাতে পারো, যদি ক্লান্তির মাঝেও প্রশ্ন করার শক্তিটুকু ধরে রাখতে পারো, তবে তোমার সময় তোমাকে চালাবে না, বরং তুমি সময়কে চালাবে।
এখানে আরেকটি লড়াই চলে, যেটা আমরা কম কথা বলি। সেটা তুলনার লড়াই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন তুমি দেখো তোমার বন্ধুটি বিদেশে স্কলারশিপ পেয়েছে, অন্য কেউ স্টার্টআপ খুলেছে, তখন নিজের সময়কে ব্যর্থ মনে হয়। মনে হয়, আমি পিছিয়ে পড়ছি। OECD-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণদের মানসিক চাপ ও সময় নিয়ে হতাশার অন্যতম কারণ ‘সামাজিক তুলনা’। কিন্তু বিজ্ঞান কখনো দৌড় প্রতিযোগিতা নয়। এখানে কেউ প্রথম হয়, কেউ শেষ হয় না, এখানে সবাই নিজের পথটুকু খুঁজে নেয়। সময়ের ভারসাম্য মানে অন্যের ঘড়ি দেখে নিজের জীবন চালানো নয়, নিজের স্বপ্নের জন্য নিজের সময় তৈরি করা।
বাংলাদেশে প্রযুক্তির বিভাজনও এই সংগ্রামকে জটিল করে তোলে। শহরের কিছু ছাত্র অনলাইন জার্নাল, আন্তর্জাতিক লেকচার, ওপেন কোর্সে ঢুকে পড়ে সহজেই, আর গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী এখনো একটি স্থিতিশীল ইন্টারনেটের চিন্তায় আটকে থাকে। এই অসমতার মধ্যে সময় ব্যবস্থাপনা হয়ে ওঠে আরও কঠিন। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, সীমাবদ্ধতাই কখনো কখনো বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। জগদীশচন্দ্র বসু সামান্য যন্ত্রপাতি দিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় নাম লিখিয়েছিলেন ইতিহাসে, কারণ তিনি জানতেন, সময়টা হতাশার জন্য নয়, উদ্ভাবনের জন্য।
গবেষণায় ভারসাম্য মানে নিজের শরীরের সঙ্গেও বোঝাপড়া। তুমি যদি ভেঙে পড়ো, তোমার গবেষণাও ভেঙে পড়বে। রাত জাগা রোমান্টিক শোনালেও, বিজ্ঞান আসলে দীর্ঘ শ্বাসের খেলা। একটানা দৌড়ে কেউ ম্যারাথন জেতে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, তরুণদের অনিয়মিত ঘুম স্মৃতিশক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয় প্রায় চল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত। এই তথ্য ভয় দেখানোর জন্য নয়, মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে, নিজের যত্ন নেওয়াও গবেষণার অংশ।
বিশ্বের বড় গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে দেখবে, কাজের পাশাপাশি রাখার জায়গা আছে বিশ্রামের, আছে বিনিময়ের, আছে নীরবতার। হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ডে শুধু ল্যাব নেই, আছে হাঁটার পথ, আছে বইমেলা, আছে আড্ডা। কারণ তারা জানে, বিজ্ঞান কেবল পরীক্ষানিরীক্ষা নয়, বিজ্ঞান মানুষেরই আরেক রূপ। আমাদের দেশে হয়তো সেই অবকাঠামো নেই, কিন্তু আমরা অন্তত মানসিক অবকাঠামোটা গড়ে তুলতে পারি, যেখানে সময়কে শাসন করা হয় ভালোবাসা দিয়ে, আতঙ্ক দিয়ে নয়।
রাত শেষে ভোর আসে। সেই ছেলেটা লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে দাঁড়ায় ফজরের আজানের শব্দে। তার চোখে ঘুম, তবু বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি। সে জানে, সব কাজ শেষ হয়নি, সব প্রশ্নের উত্তরও মেলেনি। কিন্তু সে এটাও জানে, সে থামেনি। সে বুঝতে শুরু করেছে সময়ের মানে। সময় মানে শুধু ক্লাস আর কাজ নয়, সময় মানে নিজের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করা। নিজেকে জিজ্ঞেস না করেও সে বুঝে নেয়, সে নিছক ভালো ছাত্র হতে চায় না, সে হতে চায় একগুঁয়ে কৌতূহলী মানুষ।
এই লেখাটা হয়তো তুমি পড়ছো এমন এক রাতে, যখন ভবিষ্যৎ তোমার কাছে ধোঁয়াটে, আর বর্তমান ভারী। কিন্তু মনে রেখো, সময় এক নিষ্ঠুর শিক্ষক বটে, কিন্তু সে কাউকে ঠকায় না। তুমি যদি তাকে শ্রদ্ধা করো, সে একদিন তোমাকে চিনিয়ে দেবে নিজের সত্যিকারের শক্তির সঙ্গে। গবেষণার ভারসাম্য মানে নিখুঁত সময়সূচি নয়, ভারসাম্য মানে ভাঙনের মাঝেও ওঠার শিল্প। হয়তো তুমি সবদিন সফল হবে না, হয়তো অনেক দিনই মনে হবে, তুমি পিছিয়ে যাচ্ছো। কিন্তু বিজ্ঞানীরা আসলে পিছিয়ে যায় না, তারা কেবল নিজেদের পথটুকু একটু বাঁকিয়ে নেয়।
তুমি যেদিন বুঝবে, প্রতিটি ঘন্টা শুধু কাটানোর নয়, গড়ার জন্য, সেদিন থেকে তোমার গবেষণাই তোমার পরিচয় তৈরি করবে। দিনশেষে ডিগ্রি নয়, পদবি নয়, তোমার রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলোই তোমাকে আলাদা করে তুলবে। আর সেই প্রশ্নগুলো জন্ম নেয় কেবল এক জায়গায়, সেই জায়গার নাম সময়।

Leave a comment