সম্পাদকীয়

বিজ্ঞানীর জন্য ভালো বক্তা হওয়া কেন জরুরি

Share
Share

রাত ঠিক বারোটার একটু পর। ঢাকার এক হলঘরে একা বসে তুমি ল্যাপটপের আলোয় একটা স্লাইড ডেক বানাচ্ছ। কাল সকালেই প্রেজেন্টেশন, সুপারভাইজরের সামনে দাঁড়িয়ে বলবে নিজের থিসিস আইডিয়া। মাথার ভেতরে কিন্তু আরেকটা কণ্ঠ কথা বলছে—“আমি যদি ঠিকভাবে বোঝাতে না পারি?” এই ভয়টা নতুন নয়। প্রতি বছর বাংলাদেশের প্রায় পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত হয়—প্রজেক্ট, থিসিস, ক্লাব, কনফারেন্স। কিন্তু গবেষণার ফল বোঝাতে গিয়ে গলা শুকিয়ে যায়, চোখ মেঝেতে আটকে থাকে—এ দৃশ্য আমাদের ক্যাম্পাসে খুব চেনা। আমরা ভাবি জ্ঞান থাকলেই চলবে, কণ্ঠের দরকার নেই। অথচ বাস্তবতা উল্টো; আবিষ্কার তখনই বাঁচে, যখন সেটা শেয়ার করা যায়।

আজকের পৃথিবীতে বিজ্ঞান কেবল ল্যাবে আটকে নেই। বিজ্ঞান এখন পার্লামেন্টে, কোর্টরুমে, টিভি স্টুডিওতে, ইউটিউবের ট্যাবেও। বিশ্বব্যাপী গবেষণার প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থায়ন আসছে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে, যেখানে সিদ্ধান্ত নেয় বিজ্ঞানী নয়—সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ড, মন্ত্রণালয়, ফাউন্ডেশন। আর সেসব কক্ষে যে বিজ্ঞানী নিজের কাজকে মানুষের ভাষায় আনতে পারে, সে-ই শোনানো হয়। ২০২৩ সালে এক বড় আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, পিএইচডি গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যেই ৫৮ শতাংশ নিজের গবেষণার প্রভাব দুই মিনিটে বোঝাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। এই অস্বস্তি থেকে জন্ম নেয় সবচেয়ে নিষ্ঠুর ব্যাপারটি—অচেনা হয়ে যাওয়া।

ধরো, রাজশাহীর এক তরুণ গবেষক ধানের রোগের বিরুদ্ধে নতুন বায়োলজিক্যাল সমাধান বের করল। কাগজে তার ফলাফল দারুণ। কিন্তু সে যদি কৃষি অফিসারের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে না পারে কীভাবে এই সমাধান কৃষকের খরচ কমাবে আর ফলন বাড়াবে, তার আবিষ্কার ধানের মাঠে পৌঁছাবে কীভাবে? ইউনেস্কোর হিসাব বলে, উন্নয়নশীল বিশ্বে উদ্ভাবনের প্রায় ৪০ শতাংশ মাঠে পৌঁছায় না কেবল যোগাযোগের দুর্বলতার কারণে। ভালো বক্তৃতা এখানে অলংকার নয়; এটা সেতু। ল্যাব থেকে গ্রাম, ডেটা থেকে সিদ্ধান্ত, গ্রাফ থেকে জীবনের গল্প—এই সেতু তখনই দাঁড়ায়, যখন কণ্ঠ দৃঢ় হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কথাটা আরো নির্মম। এখানে বিজ্ঞানীরা প্রায়ই আটকে পড়েন দুটো ভাষার ফাঁদে—ইংরেজি না বাংলা, টার্ম না গল্প। আমরা সেমিনারে দাঁড়িয়ে এমন শব্দ বলি, যা একই সঙ্গে শ্রোতাকে ছোট আর বিজ্ঞানকে দূরে ঠেলে দেয়। অথচ ভালো বক্তার কাজ ঠিক উল্টো: জটিলতাকে ভেঙে মানুষ বানানো। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী বৈজ্ঞানিক বক্তাদের দিকে তাকাও—কার্ল সেগান থেকে শুরু করে ফেই-ফেই লি—তাঁরা গবেষণা নিয়ে কথা বলেন মানুষের মতো, যন্ত্রের মতো নয়। কণ্ঠে থাকে মমতা, বাক্যে থাকে পথচিহ্ন।

ভালো বক্তা হওয়া মানে কেবল মাইক্রোফোন ধরা নয়। এটা মানে গল্প খোঁজা। ডেটার ভেতরে মানুষের গল্প, গ্রাফের ভাঁজে নৈতিকতা, ফিগারের ছায়ায় ভবিষ্যৎ। আজকের সামাজিক মাধ্যমে এক মিনিটের ভিডিওই শাসন করে জনমত, আর টিকটকে বিজ্ঞানের ভিডিও দৈনিক প্রায় এক বিলিয়ন ভিউ ছুঁয়েছে—এই সংখ্যার ভেতরে লুকানো প্রশ্নটা বড়: বিজ্ঞান যদি নিজের কণ্ঠ না পায়, কে পাবে? ষড়যন্ত্র-ভিডিও? ভুয়া চিকিৎসা? অলৌকিকতার বিজ্ঞাপন?

এখানেই বক্তৃতা নৈতিকতায় রূপ নেয়। তুমি যখন মঞ্চে কথা বলো, তুমি কেবল নিজের ক্যারিয়ার গড়ো না—তুমি সমাজের সিদ্ধান্তে বিনিয়োগ করো। জলবায়ু নীতি, টিকা-ভীতি, খাদ্য নিরাপত্তা—এইসব লড়াইয়ে জয় আসে কণ্ঠে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্য বিষয়ে ভুল তথ্যের কারণে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ ঝুঁকিতে পড়ে। সেই ঝুঁকি কমানোর একমাত্র কণ্ঠ বিজ্ঞানীর। কিন্তু যদি সেই কণ্ঠ কাঁপে, ফাঁকটা ভরে যায় অন্যরা।

আমরা প্রায়ই বলি, “আমি বিজ্ঞানী, বক্তা নই।” এই বাক্যের ভেতর লুকানো থাকে এক প্রকার আত্মবঞ্চনা। বিজ্ঞানী মানেই তো প্রথম বক্তা—প্রকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করা, কাগজের সামনে দাঁড়িয়ে যুক্তি বলা, মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ আঁকা। তুমি কি ভালো ছাত্র, না নির্মমভাবে কৌতূহলী চিন্তাবিদ—এই প্রশ্নের উত্তর যেমন তোমার ল্যাবে, তেমনি তোমার কণ্ঠে। কে তুমি, সেটা লেখা থাকে তোমার নীরবতায়ও।

তুমি হয়তো ভাবছ, “কণ্ঠ তো জন্মগত।” না—কণ্ঠ গড়ে ওঠে। যেমন ল্যাবে ভুল থেকে শেখো, তেমনি মঞ্চেও শেখা যায়। প্রথম বক্তৃতা কাঁপবে, দ্বিতীয়টা ভাঙবে, তৃতীয়টায় ভেতর থেকে আগুন বেরোবে। পরিসংখ্যান বলে, পাবলিক স্পিকিং প্রশিক্ষণ পাওয়া শিক্ষার্থীদের গবেষণা-ফান্ড পাওয়ার সম্ভাবনা ৩৫ শতাংশ বেশি। এই সংখ্যা যদি কেবল সংখ্যা হতো—তবু কথা ছিল। কিন্তু এটা মানে স্বপ্নের এক-তৃতীয়াংশ দরজা খুলে যাওয়া।

বাংলাদেশে অবাক করার মতো প্রতিভা আছে, যা শোনাতে শেখেনি। আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে যে মা বলে, “ছেলেটা ভালো ছাত্র,” সে বোঝে না—ভালো বক্তা না হলে ভালো ছাত্রও হারিয়ে যায়। আমরা যখন আমাদের কাজ মানুষের ভাষায় আনি, তখনই মা বুঝতে পারে, তার ছেলের ল্যাবের কাগজ মাঠে ফসল হতে পারে। তখন বিজ্ঞানী হয় পরিবারের গর্ব, সমাজের হাতে ধরা বাতি।

তোমার ভয়, তোমার জড়তা—এইগুলো লজ্জার নয়, এগুলো দিকনির্দেশ। এগুলো বলে দিচ্ছে, তোমার ভেতর কিছু আছে যা শুধু কাগজে আটকে থাকতে চায় না। তোমার শব্দেরা বাইরে যেতে চায়। আর যখন তুমি প্রথমবার নিজের কাজে বিশ্বাস করে কথা বলবে, তুমি দেখবে—ঘরে আলো জ্বলে উঠেছে, কেবল শ্রোতার নয়, তোমার নিজের ভেতরেও।

ভালো বক্তা হওয়া মানে আলো জ্বালানোর পেশা বেছে নেওয়া। তুমি সিদ্ধান্ত নাও—খারাপ খবরের ভিড়ে বিজ্ঞান হবে না সবচেয়ে নরম, কিন্তু সবচেয়ে সত্য কণ্ঠ। তোমার কণ্ঠে যেন ভয় নয়, থাকে দায়িত্ব; শোরগোল নয়, থাকে স্বচ্ছতা; অহংকার নয়, থাকে মানবতা। আর একদিন, তুমি যখন মঞ্চ থেকে নামবে, কেউ একজন ঘরে ফিরবে নতুন প্রশ্ন নিয়ে। সেই প্রশ্নই হবে তোমার সবচেয়ে বড় প্রকাশনা।

আজ রাতের মতো তোমার স্লাইড বন্ধ করো না। একটা লাইন যোগ করো—তোমার গবেষণার নাম নয়, তার মানে। কাল তুমি কেবল বলবে না, তুমি গড়বে। ভবিষ্যৎ তোমার শব্দ শুনতে চায়। কথা বলো। দায়িত্ব নিয়ে। নীরবে নয়।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org