মানুষের মাথা বড় আজব জিনিস—কখন যে কোন খেয়ালে কী কাণ্ড করে বসে, সে বোঝা মুশকিল। ধরুন, সত্তরের দশকে এক ভদ্রলোক ডেনিস রিচি। বেল ল্যাবের গম্ভীর ঘরে বসে একদিন ভাবলেন, “এই যে কম্পিউটার নামের দানব, এতো কড়া কড়া ভাষা কে বোঝে? আসুন না, একটু সহজ করে দিই।” তাই সি নামের ভাষা বানিয়ে ফেললেন। এমন ভাষা, যেটা না হলে আজকের আধুনিক দুনিয়ার অর্ধেক যন্ত্রই দাঁড়াত না।
রিচির সি এমন শক্তপোক্ত হলো যে তার ছাত্রসদৃশ বিয়ার্নে স্ট্রউস্ট্রুপ মনে করলেন—“গুরুদেবের ভাষাটা তো দারুণ, তবে এর মধ্যে যদি একটু আধুনিকতার রং মাখাই, কিছু বাড়তি চালাকি ঢুকাই, কেমন হয়?” তাই আশির দশকে তিনি সি–এর ঘাড়ে নতুন পালক জুড়ে দিলেন—নাম রাখলেন সি++। অবজেক্ট–ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং–এর তাজা বাতাস এনে সফটওয়্যার জগতকে যেন শীতল বৃষ্টি দিলেন।
এই সময়েই ল্যারি ওয়াল নামের আরেক সাহসী মানুষ ভাবলেন—“টেক্সট ফাইলের ঝামেলা সামলাতে একখান শক্তিশালী ভাষা দরকার।” ১৯৮৭ সালে পার্লের জন্ম। অক্ষরগুচ্ছ ঘাঁটাঘাঁটি করার কাজে পার্ল তখনকার দিনে যেন একেবারে লোহা কেটে মাখন করার মতন সুবিধা।
নব্বইয়ের দশকে যখন সারা দুনিয়া ইন্টারনেটের প্রেমে পড়ছে, সান মাইক্রোসিস্টেমসের জেমস গসলিং এক ঝটকায় জাভা নিয়ে হাজির। “একবার লিখলেই সবখানে চলবে”—এই স্বপ্নবাক্য ছুঁড়ে দিয়ে তিনি প্রোগ্রামারদের ঘুম হারাম করে দিলেন। এদিকে নেটস্কেপের ব্রেন্ডান আইক তো মাত্র দশ দিনে জাভাস্ক্রিপ্ট বানিয়ে ওয়েবকে দিলেন ঝটপট প্রাণ। ভাবুন তো, দশ দিনের ছুটিতে কেউ কেউ কক্সবাজার ঘুরে আসে, আর কেউ ওয়েবের ইতিহাসই পাল্টে দেয়!
রাসমাস লারডর্ফও কম যান না। নিজের ব্যক্তিগত ওয়েবপেজ চালাতে গিয়ে ১৯৯৪ সালে বানালেন পিএইচপি। ছোট্ট প্রয়োজন মেটাতে যে ভাষা তৈরি, তা পরে হয়ে উঠল বিশ্বজুড়ে ডাইনামিক ওয়েবসাইটের দুঁদে সৈনিক।
একই সময়ে গুইডো ভ্যান রাসম বসে বসে একদিন ভাবলেন, “প্রোগ্রামিং মানেই কি সবসময় ঝাঁকঝমক আর কঠিন সিনট্যাক্স? কোডটা যদি কবিতার মত মসৃণ হয়?” ১৯৯১ সালে তার হাতেই জন্ম নিল পাইথন—আজকের এআই আর ডেটা সায়েন্সের প্রাণভোমরা।
১৯৯৫ সালে জাপানি ইউকিহিরো “মাত্জ” মাতসুমোতো বানালেন রুবি—প্রোগ্রামারদের আনন্দের জন্য। তার ভাবনা, “প্রোগ্রামার যদি খুশি না থাকে, কোডও খুশি হবে না।” সত্যিই তাই, রুবির হাত ধরেই রুবি অন রেইলস পরবর্তীতে ওয়েব দুনিয়াকে দিল একেবারে নতুন গতি।
আর মাইক্রোসফটে আন্দের্স হেইলসবের্গ? দুই হাজার সালের দিকে সি শার্প বানিয়ে উইন্ডোজের দুনিয়ায় ঢেলে দিলেন নতুন রঙ। গেমিং থেকে কর্পোরেট সফটওয়্যার—সবখানেই এখন তার সি শার্পের দাপট।
এই সব কোড–কবি মিলেমিশে আজকের প্রযুক্তির বুনিয়াদ গড়ে দিয়েছেন। মোবাইলের অ্যাপ হোক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং থেকে শুরু করে ইন্টারনেটের তন্তু—সবকিছুর গায়ে তাদের হাতের ছাপ। কিছু লাইন কোডে যে দুনিয়া বদলানো যায়, তা তারা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন—আর প্রমাণ করেছেন, সৃজনশীলতা যখন মাথা চাড়া দেয়, তখন ল্যাবের শান্ত দুপুরও এক মহাকাব্যের শুরু হয়ে যায়।

Leave a comment